- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- মে ৩০, ২০২৬
কন্যাশ্রী-রূপশ্রী সত্ত্বেও বাল্যবিবাহে দেশের শীর্ষে বাংলা, উদ্বেগ বাড়াল কেন্দ্রীয় রিপোর্ট
বিগত সরকারের আমলে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে কন্যাশ্রী, রূপশ্রী, সবুজসাথী, স্কুলে মেয়েদের ধরে রাখার নানান প্রকল্প, সচেতনতা শিবির— সব মিলিয়ে শিশুবিবাহ রোধে পশ্চিমবঙ্গের সাফল্যের ছবি বারবার তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে দাঁড়িয়েও বাল্যবিবাহের অভিশাপ থেকে মুক্ত হতে পারল না বাংলা। কেন্দ্রীয় সরকারের স্যাম্পল রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম (এসআরএস)-এর সর্বশেষ রিপোর্ট বলছে, ১৮ বছরের কম বয়সি মেয়েদের বিয়ের হারে দেশের মধ্যে শীর্ষে পশ্চিমবঙ্গ। শুধু গ্রামাঞ্চল নয়, শহরাঞ্চলেও শিশুবিবাহের নিরিখে জাতীয় তালিকার শীর্ষে পশ্চিমবঙ্গ।
ভারতের রেজিস্ট্রার জেনারেলের প্রকাশিত ‘স্যাম্পল রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম (এসআরএস) স্ট্যাটিস্টিক্যাল রিপোর্ট ২০২৪’-এর তথ্য সামনে আসতেই নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। রিপোর্ট বলছে, মেয়েদের উচ্চশিক্ষা, স্বনির্ভরতা এবং দেরিতে বিয়ের পক্ষে দীর্ঘদিন ধরে সচেতনতা প্রচার চালানো হলেও পূর্ব ও মধ্য ভারতের বিস্তীর্ণ অংশে এখনো বাল্যবিবাহ সমাজবাস্তবতার অংশ হয়ে রয়েছে। আর সে তালিকার প্রথমেই রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালে দেশে যাঁদের বিয়ে হয়েছে, তাঁদের মধ্যে ২.১ শতাংশ মেয়ের বয়স ছিল ১৮ বছরের কম। আরও ২৪.৫ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৮ থেকে ২০ বছরের মধ্যে। অর্থাৎ দেশের প্রতি চার জন মহিলার মধ্যে এক জনেরও বেশি ২১ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন। অন্য দিকে, ৭৩.৫ শতাংশ মহিলা ২১ বছর বা তার বেশি বয়সে বিয়ে করেছেন। বর্তমানে ভারতে মেয়েদের গড় বিবাহকালীন বয়স ২৩.১ বছর। জাতীয় ছবির আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে উদ্বেগের পরিসংখ্যান। রাজ্যভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, ১৮ বছরের আগেই বিয়ে হওয়া মেয়েদের হার সবচেয়ে বেশি পশ্চিমবঙ্গে— ৬.৩ শতাংশ। দ্বিতীয় স্থানে ঝাড়খণ্ড, ৪.৯ শতাংশ। তৃতীয় স্থানে ছত্তিশগঢ়, ২.৯ শতাংশ। বিপরীতে দিল্লিতে এই হার শূন্য। কেরালায় মাত্র ০.০৪ শতাংশ। হরিয়ানা ও হিমাচল প্রদেশেও শিশুবিবাহের হার এক শতাংশের নীচে। তেলেঙ্গানায় ১.৮ শতাংশ, অন্ধ্রপ্রদেশে ১.৭ শতাংশ এবং উত্তরপ্রদেশে ১.৬ শতাংশ।
সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয়, পশ্চিমবঙ্গে এ সমস্যা শুধু গ্রামবাংলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গ্রামীণ অঞ্চলে শিশুবিবাহের হার ৫.৯ শতাংশ, যা দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ। খুব কাছেই রয়েছে ঝাড়খণ্ড, ৫.৮ শতাংশ। কিন্তু শহুরে চিত্র আরও উদ্বেগজনক। দেশের শহরাঞ্চলে যেখানে শিশুবিবাহের গড় হার ১.১ শতাংশ, সেখানে পশ্চিমবঙ্গে সে হার ৭.৬ শতাংশ। অর্থাৎ জাতীয় গড়ের প্রায় ৭ গুণ। শহরাঞ্চলের নিরিখেও দেশের মধ্যে প্রথম বাংলা। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, এ পরিসংখ্যান কেবল আইন প্রয়োগের ব্যর্থতার ছবিই তুলে ধরছে না, বরং সমাজের গভীরে গেঁথে থাকা মানসিকতারও প্রতিফলনও স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে। যে বয়সে মেয়েদের উচ্চশিক্ষা, দক্ষতা অর্জন কিংবা কর্মজীবনের প্রস্তুতি নেওয়ার কথা, সে বয়সেই বহু ক্ষেত্রে তাঁদের বিয়ের পিঁড়িতে বসিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আইনের বিধিনিষেধ মেনে অনেক পরিবার হয়তো ১৮ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করছে, কিন্তু তার পরেই দ্রুত বিয়ের ব্যবস্থা করছে।
এসআরএস রিপোর্টে এই প্রবণতারও স্পষ্ট প্রতিফলন রয়েছে। ১৮ থেকে ২০ বছর বয়সি নারীদের বিয়ের হারেও দেশের মধ্যে শীর্ষে পশ্চিমবঙ্গ। এই বয়সসীমায় বিয়ে হয়েছে ৪৪.৯ শতাংশ মহিলার। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর অর্থ হলো, বহু পরিবারের কাছে সামাজিক লক্ষ্য আর শিশুবিবাহ নয় ঠিকই, কিন্তু ‘যত দ্রুত সম্ভব বিয়ে’ দেওয়ার সংস্কৃতি এখনো অটুট। ফলে উচ্চশিক্ষা বা কর্মসংস্থানের জন্য মেয়েদের হাতে অতিরিক্ত সময় তৈরি হচ্ছে না। এ চিত্র অবশ্য একেবারে নতুন নয়। ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভে (এনএফএইচএস-৫)-এর তথ্যও একই উদ্বেগের কথা জানিয়েছিল। ২০১৯ থেকে ২০২১ সালের সমীক্ষা অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সি মহিলাদের ৪১.৬ শতাংশের বিয়ে হয়েছিল ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই। অর্থাৎ প্রতি দশ জনে প্রায় চার জন।
গত তৃণমূল সরকারের আমলে রাজ্যে কন্যাশ্রী ও রূপশ্রীর মতো প্রকল্পের সাফল্যের কথা বারবার তুলে ধরা হয়েছিল। ২০১৩ সালে চালু হওয়া কন্যাশ্রী প্রকল্পের মাধ্যমে নিম্নআয়ের পরিবারের স্কুলপড়ুয়া অবিবাহিত মেয়েদের আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। বর্তমানে প্রায় ৮৯ লক্ষ মেয়ে এই প্রকল্পের আওতায়। ১৮ বছর পেরিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে গেলে মেলে ২৫ হাজার টাকার এককালীন অনুদান। পরে চালু হয় রূপশ্রী প্রকল্প, যেখানে প্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের বিয়ের জন্য আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, এত প্রকল্প, এত আর্থিক প্রণোদনা এবং এত সচেতনতা সত্ত্বেও কেন শিশুবিবাহের হার কমছে না?
মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা বলছে, সমস্যার শিকড় অনেক গভীরে। দক্ষিণ দিনাজপুরের বুনিয়াদপুর এলাকার এক আশা কর্মীর অভিজ্ঞতা সে বাস্তবতাই তুলে ধরেছে। সম্প্রতি সেখানে এক কিশোরী মায়ের চিকিৎসার সময় জানা যায়, তাঁর বিয়ে হয়েছিল মাত্র ১২ বছর বয়সে। স্বামীর বয়স ছিল ১৬। বর্তমানে তিনি রক্তাল্পতা-সহ একাধিক শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন। চিকিৎসকদের মতে, অল্প বয়সে মাতৃত্বের ফলে এমন জটিলতা অস্বাভাবিক নয়। বীরভূমে ২০২৫ গত বছরের এপ্রিল থেকে জুন; মাত্র তিন মাসে— ৩,৪৪৩ জন নাবালিকা প্রসবের জন্য সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভর্তি হয়েছিলেন। একই সময়ে প্রশাসন ১৯০টি শিশুবিবাহ রুখতে পেরেছে বলে দাবি করেছে। দক্ষিণ দিনাজপুরে এক বছরে ৭,০০০টি শিশুবিবাহ এবং ৪,০৯৫ জন কিশোরী মায়ের তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে। পশ্চিম মেদিনীপুরে এক বছরে ১০,৭৫৫ জন নাবালিকার গর্ভধারণের ঘটনা সামনে এসেছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বাল্যবিবাহের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত রয়েছে স্কুলছুটের হার বৃদ্ধি, নারীদের কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগ। ফলে অল্প বয়সে গর্ভধারণ, মাতৃমৃত্যুর ঝুঁকি, অপুষ্টি, রক্তাল্পতা বাড়ছে । ফলে এ কেবল সামাজিক সমস্যা নয়, একই সঙ্গে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনীতিরও সমস্যা। কেন্দ্রীয় রিপোর্ট প্রকাশের পর রাজনৈতিক তরজাও শুরু হয়েছে। বিজেপি নেতা দিলীপ ঘোষের অভিযোগ, ‘যে রাজ্যে কন্যাশ্রী-রূপশ্রীর মতো প্রকল্প নিয়ে এত প্রচার হয়েছিল, সে রাজ্যই আজ শিশুবিবাহে দেশের শীর্ষে। এটি অত্যন্ত লজ্জার।’ তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, এ বাংলাতেই রাজা রামমোহন রায় ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মতো সমাজসংস্কারকরা নারীশিক্ষা ও বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিলেন। অথচ এখনও বহু এলাকায় ১২ থেকে ১৪ বছর বয়সে মেয়েদের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে বলে তাঁর দাবি। এমনকি জোর করে বিয়ে দেওয়ার আশঙ্কায় অনেক কিশোরী থানায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। প্রশাসনের আরও সক্রিয় ভূমিকার দাবি জানিয়েছেন বিজেপি নেতা।
উল্লেখ্য, শিশুবিবাহ রোধে দেশে কঠোর আইন রয়েছে। কিন্তু আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রেই ঘাটতির অভিযোগ উঠছে বারবার। সমাজকর্মীদের দাবি, অধিকাংশ ক্ষেত্রে পুলিশ লিখিত অভিযোগ ছাড়া হস্তক্ষেপ করতে চায় না। আবার স্থানীয় স্তরে সামাজিক প্রতিরোধও কম নয়। কন্যাসন্তানের শিক্ষা ও সুরক্ষার লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় সরকার ২০১৫ সালে ‘বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও’ কর্মসূচি চালু করেছিল। ওই কর্মসূচি এবং রাজ্য সরকারগুলোর নিজস্ব প্রকল্পগুলির কার্যকারিতা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। কারণ, সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি পেলেও সামাজিক বাস্তব যে বদলায়নি, তার ইঙ্গিত মিলছে কেন্দ্রীয় রিপোর্টেই। আরও একটি তথ্য বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, বিপুল সংখ্যক মেয়েরা আদৌ উচ্চশিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন বা কর্মজীবনের সুযোগ পাচ্ছেন কি না!
❤ Support Us





