Advertisement
  • দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
  • জানুয়ারি ১, ২০২৬

নয়া বছরে গণতন্ত্রের অগ্নিপরীক্ষা ! বিধানসভা নির্বাচন থেকে ‘এক দেশ এক ভোট’, জনগণনা, কী কী থাকবে ২০২৬ এর রাজনৈতিক রোজনামচায় ?

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
নয়া বছরে গণতন্ত্রের অগ্নিপরীক্ষা  ! বিধানসভা নির্বাচন থেকে ‘এক দেশ এক ভোট’, জনগণনা, কী কী থাকবে ২০২৬ এর রাজনৈতিক রোজনামচায় ?

ইতিহাস সাক্ষী, দেশ-দুনিয়ার স্রোতের মতো বহমান সময়কালে বিশেষ করে ভারতীয় রাজনীতির বিস্তৃত ভূমিক্ষেত্রে কিছু বছর বদ্ধ,সংকূচিত হয়ে থাকে, কিছু বছর আবার প্রবল ঘটনাবহুল, আবার অকস্মাৎ কিছু বছর ইতিহাসের দিশা বদলে দেয়। ২০২৬ সাল তৃতীয় শ্রেণিরই অন্তর্ভুক্ত হতে চলেছে, এমন আভাস নতুন বছর সঙ্গে করে বয়ে নিয়ে এসেছে। ২০২৬ বছরটি শুধু একের পর এক নির্বাচনের সময়সূচিতে বাঁধা নয়, বরং বিতর্কিত সংবিধান সংশোধনী প্রস্তাব, দীর্ঘ প্রতীক্ষিত জাতিগত পরিসংখ্যান-সহ জনগণনা, ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন, ক্ষমতার কাঠামো, প্রতিনিধিত্বের ধারণা এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার গভীরে থাকা প্রশ্নগুলি ঘিরে মুখর হয়ে থাকবে বলেই মনে করা হচ্ছে।

২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে প্রত্যাশার তুলনায় কম ফলাফলের পর, ক্ষমতাসীন বিজেপি কিছুটা ধাক্কা খেয়েছিল, তা কাটিয়ে উঠে দলটি ফের ‘অপ্রতিরোধ্য’ জয়ের ছন্দে ফিরেছে। ঝাড়খণ্ড ছাড়া দিল্লি, হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র ও বিহারে বিধানসভা জয়, শাসক শিবিরকে নতুন আত্মবিশ্বাস দিয়েছে। জম্মু ও কাশ্মীরের নির্বাচনে সরকার গঠন করতে না পারলেও জম্মু অঞ্চলে বিজেপির শক্ত ভিত স্পষ্ট হয়েছে। ২০২৬-এর প্রথমার্ধে বিজেপির নতুন সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নিতে চলেছেন নিতিন নবীন। পূর্ব ও দক্ষিণ ভারতে দল বিস্তারের চাপ থাকবে তাঁর কাঁধে। একই সঙ্গে এপ্রিল–জুনে ৫৯টি রাজ্যসভা আসনে নির্বাচন, যেখানে এনডিএ কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে। অন্য দিকে, বিরোধীদের জন্য ২০২৬ কার্যত অস্তিত্বের লড়াই। রাজনৈতিক গতি ফেরাতে না পারলে ভবিষ্যতের লড়াই আরো কঠিন হয়ে উঠবে, এ কথা বিরোধী শিবিরও ভাল করেই জানে।

বছরের শুরুতেই রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়াবে মহারাষ্ট্র। ১৫ জানুয়ারি বৃহৎ-মুম্বাই পুরসভা (বিএমসি) সহ রাজ্যের ২৮টি পুরনিগমের নির্বাচন। দেশের সবচেয়ে ধনী পুরসভা বিএমসি-র দখল শুধু প্রশাসনিক ক্ষমতার প্রশ্ন নয়, রাজনৈতিক প্রতীকের দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিবসেনা বিভক্তির পর এ নির্বাচন কার্যত শাসক ও বিরোধী শিবিরের শক্তি যাচাইয়ের প্রথম বড়ো মঞ্চ। এর পরেই বছরের প্রথমার্ধে একের পর এক বিধানসভা নির্বাচন—পশ্চিমবঙ্গ, অসম, তামিলনাড়ু, কেরালা ও পুদুচেরি। প্রত্যেকটি রাজ্যেই লড়াই আলাদা, কিন্তু রাজনৈতিক গুরুত্ব সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

২০২৬-এর সবচেয়ে নজরকাড়া লড়াইগুলির একটি হবে পশ্চিমবঙ্গ। টানা ৩ বার ক্ষমতায় থাকা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসকে সরাতে মরিয়া বিজেপি ফের আক্রমণাত্মক কৌশলে নামছে। রাজ্যে ঘনঘন আসছেন নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহ-র মতো বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বরা। বুধবারই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বঙ্গ বিজয়ের লক্ষ্য স্থির করে দিয়েছেন। অবৈধ-অনুপ্রবেশ, নাগরিকত্ব, দুর্নীতি লড়াইয়ের ময়দানে বিজেপির প্রধান হাতিয়ার। তবে তৃণমূলের তৃণমূল স্তরের সংগঠন, একাধিক জনমুখী সরকারি প্রকল্প, নাগরিক নিরাপত্তার আশ্বাস, অসাম্প্রদায়িক শক্তি হিসাবে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তায় গেরুয়া শিবিরের ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকার গঠনের প্রচেষ্টা কতখানি বাস্তবের মুখ দেখবে তা নিশ্চিত নয়। অতীতে দেখা গেছে, রাজ্যের রাজনৈতিক মেরুকরণ বিজেপির পক্ষে গেলেও তা স্বয়ংক্রিয় জয়ে রূপান্তরিত হয় না। তৃণমূল এখনো প্রায় ৩০ শতাংশ সংখ্যলঘু ভোটব্যাঙ্ক ধরে রেখেছে। অন্যদিকে, ২০২১ সালে শূন্যে নামা বামফ্রন্ট ও কংগ্রেসের সামনে চ্যালেঞ্জ শুধু ভোট বাড়ানো নয়, দলের রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা ফিরিয়ে আনা।

দ্রাবিড়ভূমের রাজনীতির শক্ত ঘাঁটি তামিলনাড়ুতে লড়াই ঐতিহ্যগত ভাবে ডিএমকে বনাম এআইএডিএমকে। কল্যাণমুখী প্রকল্পের জোরে মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিনের ডিএমকে আত্মবিশ্বাসী। তবে দুর্বল ও বিভক্ত এআইএডিএমকের পাশাপাশি নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছেন জনপ্রিয় অভিনেতা বিজয়। তাঁর দল ভোট কাটবে কি না, বিরোধী শিবিরে নতুন সমীকরণ তৈরি করবেন, না কি শেষ মুহূর্তে কোনো সমঝোতা হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর দেবে এপ্রিলের নির্বাচন। কেরালায় আবার ভিন্ন ছবি। সাম্প্রতিক স্থানীয় নির্বাচনের ফল বলছে, এই মুহুর্তে পিনরাই বিজয়নের বামফ্রন্ট কিছুটা চাপে আছে। অন্যদিকে, কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউডিএফ চাঙ্গা। বামেদের হার মানে প্রায় ৫ দশকের মধ্যে দেশে কোনো ‘কমিউনিস্ট’ মুখ্যমন্ত্রী না থাকা। বিজেপিও এখানে ধীরে ধীরে আসন বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামছে। এদিকে, অসমে এক দশক পর ফের ক্ষমতায় ফেরার স্বপ্ন দেখছে কংগ্রেস। কিন্তু বিজেপি–এজিপি–ইউপিপিএল জোট শক্ত ভিতের উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে বলেই মত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের। কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন জোট বিস্তৃত হলেও এআইইউডিএফকে বাইরে রাখায় সংখ্যালঘু ভোট ভাগ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ তো গেল নির্বাচনী সমীকরণ আর ভোটবাক্সের অঙ্ক। ২০২৬ সাল জাতীয়স্তরে সামাজিক, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিষয় নিয়েও তোলপাড় হবার সম্ভাবনা প্রবল। সংসদের অন্দরে অন্যতম বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে ‘এক দেশ এক নির্বাচন’। লোকসভা ও বিধানসভা ভোট একসঙ্গে করার প্রস্তাব বাস্তবায়িত করতে সংবিধান সংশোধনী দরকার, যার জন্য বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই বিজেপির হাতে। ফলে দরকষাকষি, সংঘাত ও রাজনৈতিক উত্তাপ অনিবার্য। এর পাশাপাশি গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত মন্ত্রীদের অপসারণ সংক্রান্ত সংশোধনী বিলও বিতর্ক বাড়াতে পারে। পাশাপাশি ‘এসআইআর’ ও বিধানসভা নির্বাচনে অবৈধ-অনুপ্রবেশ, মহিলাদের সামাজিক নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব বিষয়েও সরগরম হতে পারে রাজধানী। রয়েছে দূষণ, সরকারী সহযোগীতায় পুঁজিবাদী শক্তির হাতে দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংসের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দিল্লি-সহ দেশের একাধিক শহরে বায়ু-দূষণের মাত্রা সীমা ছাড়িয়েছে, আরাবল্লী, নিকোবার, হাসদেও ঘিরে ইতিমধ্যেই জনমানসে তীব্র ক্ষোভ ও কেন্দ্র সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ঘনীভূত হয়েছে। রয়েছে, নতুন বছরের মার্চ মাসের মধ্যে ‘মাওবাদী’ নির্মূলের লক্ষ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ-র পূর্বের ঘোষণার বাস্তবায়নের অগ্নিপরীক্ষা। ছত্তিশগড় ও সংলগ্ন এলাকায় ইতিমধ্যেই জোরদার অভিযান চলছে।

২০২৬ সালে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বোধহয় জাতিগত পরিসংখ্যান-সহ জণগণনা। ১৬ বছর পর শুরু হতে দেশের জনসংখ্যা পরিমাপের কর্মযজ্ঞ। প্রসঙ্গত, এটিই হবে ভারতের প্রথম ডিজিটাল জনগণনা এবং জাতিভিত্তিক গণনা। এর ফলাফল শুধু নীতি নির্ধারণ নয়, ভবিষ্যৎ-নির্ধারণ ও প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নেও গভীর প্রভাব ফেলবে। উত্তর–দক্ষিণ বিভাজন ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ার আশঙ্কা স্পষ্ট। একই সঙ্গে চলছে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর)। বিহার ও পশ্চিমবঙ্গের লক্ষ লক্ষ নাম বাদ পড়েছে। শাসক শিবিরের দাবি, এতে ভুয়ো ও অবৈধ ভোট বন্ধ হবে; বিরোধীদের আশঙ্কা, এতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য লুকিয়ে আছে। সব মিলিয়ে ২০২৬ সাল শুধু নির্বাচনের বছর নয়—এ বছর ঠিক করবে আগামী দশকের দেশের সামগ্রিক দিশা। গণনা, নির্বাচন ও আইন প্রণয়ন আর মানুষের প্রতিক্রিয়া; এমন স্তম্ভগুলোর উপর দাঁড়িয়েই ভারতের গণতন্ত্র নতুন পরীক্ষার মুখে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!