Advertisement
  • দে । শ
  • জুলাই ১০, ২০২৩

সংবিধান রচনার অজানা আখ্যান

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
সংবিধান রচনার অজানা আখ্যান

ভারতীয় সংবিধানের রূপকার হিসেবে সাধারণত ড. আম্বেদকরের নামই সাধারণত সবার প্রথমে আসে। আর তা যে আসবে তাতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। তবে, একথা হয়তো খুব কম জনই জানেন যে গ্রন্থের ওপর ভিত্তি করে গোটা দেশের রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, তা ছাপার অক্ষরে লেখা হয়নি। বলা বাহুল্য, এক্ষেত্রে কোনো যন্ত্রের ব্যবহারই হয়নি। পুরো কাজটাই সম্পন্ন হয় হাতে। নিজের অতুলনীয় ইটালিক স্টাইলে ক্যালিগ্রাফি করেছিলেন যে ব্যক্তিত্ব তাঁর নাম আজকের দিনে হয়তো খুব একটা আলোচনার পরিসরে উঠে আসে না। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে স্থান পেয়েছেন প্রেম বিহারী নারায়ণ রায়জাদা নামে দিল্লি নিবাসী এক বাসিন্দা।

১৯০১ সালের ১৭ই ডিসেম্বর দিল্লীর এক নামকরা হস্তাক্ষর গবেষকের পরিবারে জন্মানো প্রেম বিহারী ছিলেন ওই সময়ের একজন নামজাদা ক্যালিগ্রাফি রাইটার। অল্প বয়সেই নিজের পিতা-মাতাকে হারান। পরে, তাঁর দাদু রাম প্রসাদ সাক্সেনা ও কাকা চতুর বিহারী নারায়ণ সাক্সেনার তাঁর দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। উল্লেখ্য দাদুও রাম প্রসাদ একজন হস্তলিপিবিদ ছিলেন, সেই সঙ্গে  পার্শী ও ইংরেজি ভাষায়  ব্যুৎপত্তি অর্জন করেছিলেন। তিনি  উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের পার্শী ভাষা শেখাতেন।

দাদুর স্নেহে শৈশবেই হস্তলিপিবিদ্যায় হাতেখড়ি হয় প্রেম বিহারীর। স্নাতক হন দিল্লীর সেন্ট স্টিফেন কলেজ থেকে। পরে যে শৈশবে যে শিক্ষা নিজের পূর্বজের থেকে পেয়েছিলেন সেই শিল্পকলা নিয়েই চর্চা শুরু করেন। ক্রমশ সুন্দর হস্তাক্ষরের জন্য খ্যাতনামা হয়ে ওঠেন। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রীর কানেও পৌছায় তাঁর এই অসাধারণ প্রতিভার কথা। সে সময় সংবিধান রচনার কাজ সবে শেষ হয়েছে, এখন তা ছাপাখানায় যাওয়ার জন্য প্রস্তুত। কিন্তু দেশের শাসনব্যবস্থার ভিত্তি স্বরূপ যে দলিল তা সাধারণ আর পাচতা বইয়ের মতো জনসমক্ষে আসবে, তা কখনোই মনঃপূত ছিল না পন্ডিতজির। তিনি চেয়েছিলেন ইটালিক অক্ষরে ক্যালিগ্রাফি করে হাতে লেখা হোক সংবিধান। প্রেম বিহারী তাঁর কাছে আসার পর নেহেরুজী তাঁকে তাঁর বহু আকাঙ্খিত পদ্ধতিতে সংবিধান লিখতে বলেন ও এজন্য কেমন পারিশ্রমিক তিনি আশা করেন তা জানতে চান।

নেহেরুজীকে অবাক করে দিয়ে প্রেম বিহারী জানালেন, ‘এক পয়সাও লাগবে না। ভগবানের দয়ায় আমার কাছে যা আছে তা নিয়ে আমি খুশি।’ তবে দেশের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রায় আব্দারের ঢং-এ বলে বসেন, যে নতুন সংবিধানের প্রত্যেক পৃষ্ঠার শেষে তাঁর নিজের ও তাঁর পিতামহের নাম যেন তাঁকে লেখার জন্য অনুমতি দেওয়া হয়। অম্লান বদনে তাঁর এই অনুরোধ মেনে নিয়েছিলেন মতিলাল পুত্র।

শুধু তাই নয়, সংবিধান লেখার জন্য একটা ঘর দেওয়া পেয়েছিলেন  প্রেম বিহারী। যেখানে বসে প্রেমজী পুরো সংবিধানটির পান্ডুলিপিটা লিখেছিলেন।  তবে কাজ  শুরু করার আগে, তিনি নেহেরু চেয়েছিলেন তিনি যেন একবার শান্তিনিকেতনে গিয়ে নন্দলাল বসুর সঙ্গে দেখা করেন।  তাঁর সেই ইচ্ছাকে সম্মান জানান তিনি।  ২৯শে নভেম্বর,  ১৯৪৯ সালে গণপরিষদের সভাপতি  বাবু  রাজেন্দ্র প্রসাদের সঙ্গে কবিগুরুর স্মৃতিধন্য  বোলপুরে আসেন।  বিখ্যাত চিত্রশিল্পীর সঙ্গে আলোচনা করেন  কীভাবে ও পাতার কতটা অংশ নিয়ে  তিনি  লিখবেন, স্থির হয়,  পাতার বাকি ফাঁকা অংশে  অলংকরণ করবেন নন্দলাল বসু।

নন্দলাল  ও শান্তিনিকেতনের তাঁর কয়েকজন ছাত্র-ছাত্রী  শূন্যস্থান গুলোতে  অনবদ্য চিত্রশৈলীতে ভরিয়ে তুলেছিলেন। মহেঞ্জদরোর সিলমোহর, রামায়ণ, মহাভারত, গৌতম বুদ্ধের জীবন, সম্রাট অশোকের বৌদ্ধধর্ম প্রচার, বিক্রমাদিত্যের সভা, সম্রাট আকবর ও মুঘল সাম্রাজ্য, মহারানী লক্ষীবাঈ, টিপু সুলতান, গান্ধীজির আন্দোলন, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বোসের ও আজাদ হিন্দ ফৌজের লড়াই, ভারতের পাহাড়, সমুদ্র ও মরুভূমির সৌন্দর্যের রূপচিত্র সবই তাঁদের অঙ্কন  অনুপম অলংকরণে ফুটে উঠেছে। সব মিলে এ যেন ভারতের ইতিহাস ও ভূগোলের চিত্রায়িত  রূপ। তাঁরা সংবিধানের বিষয়বস্তু ও অনুচ্ছেদ অনুযায়ী খুবই সুচিন্তিতভাবে চিত্রগুলি চিত্রায়ণ করেছিলেন।

ভারতের সংবিধান লিখতে   প্রেম বিহারীর দরকার হয়েছিল ৪৩২টা পেন হোল্ডার।  আর  ইংল্যান্ড ও চেকোস্লোভাকিয়া থেকে নিয়ে আসা  ৩০৩ নম্বরের নিব- এক্ষেত্রে ব্যবহার করেছিলেন তিনি।  দীর্ঘ ছয় মাস ধরে সমগ্র সংবিধানের পাণ্ডুলিপিটি লিখেছিলেন। সংবিধানটি লিখতে ২৫১ পাতা পার্চমেন্ট কাগজ ব্যবহার করতে হয়েছিল।  শেষ পর্যন্ত বিপুল এ গ্রন্থের ওজন গিয়ে দাঁড়ায় ৩ কিলো ৭৫০ গ্রাম-এ।  দৈর্ঘ্যে ২২ ইঞ্চি আর প্রস্থে ১৬ ইঞ্চি।

পৃথিবীতে গুণী মানুষরা মরেন না,  অতুলনীয় সৃষ্টি তাদের বহুদিন পর্যন্ত  বাঁচিয়ে  ১৬ই ফেব্রুয়ারী, ১৯৬৬ সালে প্রেম বিহারীর মৃত্যু হতে পারে। তবে তাঁর লেখা সংবিধান আজো ভারতীয় রাষ্ট্রব্যবস্থার পথ  নির্দেশিকা। মূল বইটি  এখন  দিল্লীর সংসদ ভবনের গ্রন্থাগারে স্বযত্নে সংরক্ষিত। দেরাদুনের সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার  পরে বেশ কয়েকটি  পুস্তক ছাপার হরফে প্রকাশিত করেছিল।  তবে, মূল বইটির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অনেক শ্রম,মেধা  ও বাগ্মীতার সামূহিক ইতিহাস।  আগ্রহীরা চাইলে  তা দেখে আসতেই পারেন।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!