Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • আগস্ট ৬, ২০২৫

ধারা ৩৭০ বাতিলের ৬ বছর: কাশ্মীরে প্রতিবাদের মাঝে বিজেপির বিজয়োল্লাস ! ‘রাজ্যমর্যাদা’ ফেরাতে লড়াইয়ের ডাক ওমর-মেহবুবার

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
ধারা ৩৭০ বাতিলের ৬ বছর: কাশ্মীরে প্রতিবাদের মাঝে বিজেপির বিজয়োল্লাস ! ‘রাজ্যমর্যাদা’ ফেরাতে লড়াইয়ের ডাক ওমর-মেহবুবার

২০১৯ সালের ৫ আগস্ট, জম্মু-কাশ্মীরের ইতিহাসে সবচেয়ে বিতর্কিত, স্মরণীয় দিন। ওইদিন, সংসদের দুটি কক্ষেই এক বিশেষ প্রস্তাব পাস করে। ধারা ৩৭০ ও ৩৫এ বাতিল করে, এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তে জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা তুলে নিয়ে রাজ্যটিকে দুই কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভাগ করা হয়—জম্মু-কাশ্মীর ও লাদাখ। সংবিধানের বিশেষ ধারায়, জম্মু-কাশ্মীরকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল। যার ফলে সে রাজ্যের আইন ও সংবিধান, ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের থেকে কিছুটা আলাদা, স্বায়ত্বভাবের ছিল। পাশাপাশি, ধারা ৩৫এ-এর মাধ্যমে রাজ্যের নাগরিকদের নাগরিকত্ব, জমি অধিকার ও সরকারি চাকরিতে স্থানীয়দের অগ্রাধিকার নিশ্চিত করা হয়েছিল, সেটিও বাতিল করা হয়। বিজেপি এবং কেন্দ্র সরকারের দাবি, ধারা ৩৭০ বাতিল ছিল ‘জাতীয় ঐক্যের’ একটি নৈর্ব্যক্তিক দাবি পূরণের ঘটনা। ফলে রাজ্যের নিজস্ব আইন প্রণয়ন ও বিচারব্যবস্থার উপর কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ বেড়ে যায়। বিজেপি দাবি করে, এই ধারা বাতিলের ফলে জম্মু ও কাশ্মীরের অধিবাসীরা ভারতবর্ষের সমান নাগরিক অধিকার পেলেন, দীর্ঘদিনের বিভাজন ও বিচ্ছিন্নতার হাত থেকে মুক্তি পেলেন। তবে, বিশেষ ধারাগুলির অবলুপ্তির ৬ বর্ষে পা দিয়েও, এর রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে বিতর্ক এখনো থামেনি ভু-স্বর্গে।

সে সময় বিজেপি-বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি যেমন—জাতীয় কনফারেন্স, পিডিপি, কংগ্রেস, ধারা বাতিলের তীব্র প্রতিবাদ জানায়। তারা বলেছিলেন, জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ সাংবিধানিক অধিকার, গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। রাস্তায় নামেন কাশ্মীরি আমজনতা। উপত্যকায় ৬ মাসের জন্য অনির্দিষ্টকালীন কারফিউ আরোপ করা হয়, যার ফলে যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়। ওমর আবদুল্লাহ, মেহবুবা মুফতি, ফারুক আবদুল্লাহ সহ প্রায় ৪,০০০ জন রাজনৈতিক নেতাকে সে সময় গৃহবন্দি অথবা জেলবন্দি করা হয়েছিল। এ বছর, ৫ আগস্ট দুই মেরুতে ভাগ হওয়া এক ভূ-খণ্ডের ছবি দেখা দিল। ৩৭০ ও ৩৫এ ধারা বাতিলের পঞ্চবর্ষপুর্তিতে একদিকে, ভারতীয় জনতা পার্টি দিনটিকে জাতীয় ঐক্য ও সাংবিধানিক সংহতির বিজয় বলে দাবি করে তেরঙ্গা যাত্রা, দেশপ্রেমমূলক সঙ্গীত ও অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে আনন্দ উদযাপন করল। অন্যদিকে, বিরোধী দলগুলি দিনটিকে ‘কালো দিন’ আখ্যা দিয়ে রাজ্য মর্যাদা ফিরিয়ে আনার দাবিতে সরব হল। মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লা খোলা চিঠি দিয়ে রাষ্ট্রের কাছে জবাবদিহি দাবি করলেন, মনে করিয়ে দিলেন ‘মোদী কা ওয়াদা’ এখনো অপূর্ণ। শ্রীনগরের নওয়া-ই-সুবহ, লালচক থেকে শুরু করে জম্মু ও তার পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতে সকাল থেকে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদের বিক্ষিপ্ত ঢেউ দেখা যায়। পিডিপি, জাতীয় কনফারেন্স, কংগ্রেসসহ বিভিন্ন দল স্লোগান তুলেছে— ‘৩৭০ ফিরিয়ে দাও’,’ কাশ্মীরের গণতন্ত্র বাঁচাও, রাজ্য মর্যাদা ফেরাও।’ ন্যাশনাল কনফারেন্স নেতা ফারুক আবদুল্লা বলেছেন, ‘গণতন্ত্রকে চাপা পড়িয়ে এই বিশেষ মর্যাদা কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। তা এখনো মানুষ মেনে নেননি। আমরা সাংবিধানিক পথেই রাজ্য মর্যাদা ফিরে পাব।’ পিডিপি নেত্রী মেহবুবা মুফতি সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছেন, ‘৫ অগস্ট ছিল কাশ্মীরের জন্য কালো দিন। এখানকার মানুষের অধিকার ও মর্যাদা ধ্বংস করা হয়েছে।’

এদিকে, অন্যদিকে জম্মু-কাশ্মীরে বিজেপির উদ্যোগে সকাল থেকেই বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উৎসব ও প্রধানমন্ত্রী-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ছবি নিয়ে মিছিল চলেছে। রাজ্য বিজেপির সভাপতি সাত শর্মা আখনূরের জনসভায় দাবি করেছেন, এই দিনটি কেবল সংবিধানিক ঐক্যের প্রতীক নয়, এটি ‘অবহেলিত ও বঞ্চিত মানুষের অধিকার ও মর্যাদার পুনরুদ্ধারের দিন।’ তাঁর মতে, ‘৩৭০ ধারা বাতিলের পর থেকে উপত্যকায় শান্তি ফিরে এসেছে। সন্ত্রাসবাদ ও হিংসা কমেছে, উন্নয়ন এগিয়েছে গ্রাম থেকে শহরে। নতুন স্কুল খুলেছে, রাস্তা তৈরি হয়েছে, এবং নাগরিকরা নিরাপদে চলাফেরা করছে।’ কিন্তু জয়ধ্বনির আড়ালে কাশ্মীরের রাজনৈতিক বাস্তবতা যে আরো জটিল এবং বহুমাত্রিক, তা স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী ও ন্যাশনাল কনফারেন্স নেতা ওমর আবদুল্লাহ। কেন্দ্র জম্মু-কাশ্মীরকে ‘অস্থায়ীভাবে’ কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে রূপান্তরিত করেছিল, সে অস্থায়িত্ব আজ ৬ বছরে দাঁড়িয়ে স্থায়ী হয়ে উঠছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। গত ২৯ জুলাই ওমর একটি ৩ পাতার চিঠি পাঠিয়েছেন ৪২টি রাজনৈতিক দলের সভাপতির কাছে, যার মধ্যে রয়েছেন কংগ্রেস প্রধান মল্লিকার্জুন খাড়গে-সহ পার্লামেন্টে দৃশ্যমান বিরোধী দলনেতারাও। আবদুল্লাহ-র দাবি, রাজ্যের মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়া কোনো দয়াপ্রসূত সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি একটি প্রয়োজনীয় সংশোধন। তাঁর দাবি, একটি সাংবিধানিক ভুলকে স্বীকার করে তাকে সংশোধন করার সময় এসে গেছে। চিঠিতে তিনি সাফ জানিয়েছেন, একটি পূর্ণ রাজ্যকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে নামিয়ে আনা সংবিধানের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর পরিপন্থী এবং তা যদি গ্রহণযোগ্যতা পায়, তবে ভবিষ্যতে ভারতের যে কোনো রাজ্য এই ভাগ্যে পড়তে পারে।

২০১৯ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বারবার বলেছিলেন, ‘কাশ্মীরকে অস্থায়ীভাবে কেন্দ্রশাসিত করা হয়েছে, রাজ্যত্ব ফিরিয়ে দেওয়া হবে।’ এই প্রতিশ্রুতি স্মরণ করিয়ে ওমর বলেছেন, ‘একটি প্রতিশ্রুতির মেয়াদ ৬ বছর পর্যন্ত গড়িয়ে যেতে পারে না। ‘শীঘ্রই’ বা ‘যত তাড়াতাড়ি সম্ভব’—এই শব্দবন্ধগুলোকে নির্দিষ্ট সময়সীমাহীন করে রাখলে তা আলিবাবার গুপ্তধনের মতই অলীক হয়ে দাঁড়ায়।’ তিনি লেখেন, এই দীর্ঘস্থায়ী কেন্দ্রশাসন ‘অস্থায়ী নয়, বরং একটি রাজনৈতিক ঢাল—যার আড়ালে লুকিয়ে আছে অসহিষ্ণুতা এবং সাংবিধানিক বিচ্যুতি।’ নির্বাচনের মাধ্যমে কাশ্মীরবাসী যে গণতন্ত্রে আস্থা রেখেছেন, তার স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁদের পূর্ণ রাজনৈতিক অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া উচিত ছিল। বিধানসভার প্রথম অধিবেশনেই সর্বসম্মতভাবে রাজ্যত্ব ফিরিয়ে দেওয়ার পক্ষে প্রস্তাব পাশ হয়েছিল। সেই প্রস্তাব হাতে ধরেই ওমর প্রধানমন্ত্রীর কাছে গিয়েছিলেন। তিনি আশ্বাসও পেয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবে সেই আশ্বাস কার্যকর হয়নি। ওমরের এই চিঠির নেপথ্যে রাজনীতির চেয়েও গভীরতর একটি বার্তা রয়েছে—কাশ্মীরকে বাদ দিয়ে ভারতের রাজনীতি এগিয়ে যেতে পারে না। এই সেই উপত্যকা, যা বহু দশক ধরে জাতীয় সংবেদনশীলতার কেন্দ্রে রয়েছে, তার সঙ্গে পুনরায় আত্মিক সংযোগ স্থাপন করার জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক মর্যাদা ও সমান অধিকার। ওমর তা-ই লিখেছেন, ‘এই মুহূর্তে জাতীয় ঐক্যের এক অসাধারণ সুযোগ সামনে এসেছে। ভোটদানে রেকর্ড অংশগ্রহণ, এবং পাহালগামের সন্ত্রাসবাদের ঘটনার প্রতিবাদে সর্বজনীন প্রতিক্রিয়া—এ দুটি ঘটনা আমাদের দেখিয়েছে কাশ্মীরবাসী ভারতের গণতন্ত্রে বিশ্বাস রাখেন। কিন্তু তাঁদের প্রতি যদি রাষ্ট্রের কোনও প্রতিক্রিয়া না আসে, তবে তা হবে এক ঐতিহাসিক ব্যর্থতা।’ ওমর তাঁর চিঠির অন্তিমে উদ্ধৃত করেছেন উর্দু কবি মুজাফ্‌ফর রযমির সেই অমোঘ চরণ— ‘লমহোঁ নে খাতা কি থি, সাদিয়োঁ নে সজা পায়ি’ অর্থাৎ, এক মুহূর্তের ভুলের জন্য প্রজন্মের পর প্রজন্মকে মূল্য চোকাতে হয়।

উল্লেখ্য, ১৯৫০ সালে ভারতের সংবিধানের অধীনে জম্মু-কাশ্মীর পেয়েছিল বিশেষ মর্যাদা। ১৯৫৪ সালে ৩৫এ ধারা যোগ হয়, যা জমি ও চাকরিতে স্থানীয়দের স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করত। মোদি সরকার এই দুই ধারাই বাতিল করে রাজ্যকে ভেঙে দুই কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করেছে। ২০২৩ সালে সুপ্রিম কোর্ট এই রদবদলকে সাংবিধানিক বলে, রাজ্য মর্যাদা ‘যত দ্রুত সম্ভব’ ফেরানোর নির্দেশ দেয়। কিন্তু রাজনৈতিক বিভাজন, স্বায়ত্তশাসনের দাবী ও উন্নয়নকে কেন্দ্র করে সংঘাত এখনো অব্যাহত। কয়েকটি রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সংগঠন এ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে দীর্ঘ মামলা লড়ছেন। তাঁদের যুক্তি, ধারা বাতিল এককভাবে এবং অরাজক প্রক্রিয়ায় করা হয়েছে, যা সংবিধানের মূলনীতি লঙ্ঘন করে। বিভিন্ন গণমাধ্যম ও গবেষণা অনুযায়ী, জম্মু অঞ্চলের অনেকেই ধারা বাতিলের ফলে উন্নয়ন এবং নিরাপত্তায় আশাবাদী, কিন্তু কাশ্মীর উপত্যকার তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বড়ো অংশ এখনো রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক অধিকার ফিরে পাওয়ার দাবি জানাচ্ছে। পাকিস্তান, চিনসহ কিছু দেশ ধারা ৩৭০ বাতিলকে সমালোচনা করেছে, যদিও ভারত বলছে এটি অভ্যন্তরীণ বিষয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন বিষয়টিকে একটি ‘অভ্যন্তরীণ ভারতীয় বিষয়’ বলে বিবেচনা করেছে। এদিকে, কেন্দ্র সরকার বলছে, গত ছয় বছরে ৯২ হাজারের বেশি উন্নয়ন প্রকল্প চালু হয়েছে। ২০১৯-২০২৫ সালের মধ্যে জম্মু-কাশ্মীরের জিডিপি বার্ষিক গড় বৃদ্ধির হার ৬.২ শতাংশ হয়েছে, যা ২০১০-এর দশকের গড় ৩-৪ শতাংশ থেকে দ্বিগুণ।পর্যটন প্রবৃদ্ধি বিপুল, সন্ত্রাসবাদ কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বেকারত্ব কমেছে, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ খাতে উন্নতি হয়েছে। কিন্তু বিরোধী রাজনৈতিক নেতারা বলছেন, ‘স্বায়ত্তশাসন না পেলে এই উন্নয়ন অর্ধেকের বেশি অপ্রয়োজনীয়।’ বিরোধী পক্ষ মনে করে, রাজ্য মর্যাদা ছাড়া কাশ্মীরের জনগণ স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাবে না। এ, সীমিত স্বায়ত্তশাসন ও উপ-রাজ্যপালের ব্যাপক ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকায় রাজনৈতিক আস্থা এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। যুবকদের বেকারত্ব এখনো ভয়াবহ মাত্রায়, প্রায় ১৭ শতাংশ, কেন্দ্রীয় অনুদানের উপর নির্ভরশীলতা রয়েছে প্রায় ৭০ শতাংশ। শিল্প ও কৃষিখাত এখনো দেশের অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় অনেক পিছিয়ে, আর্থিক স্বায়ত্তও সীমিত। সম্প্রতি, ওমর আবদুল্লা সংসদে রাজ্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য বিল আনার দাবি জানিয়ে বলেছেন, ‘এটি ন্যায়ের পথে প্রথম পদক্ষেপ হবে। রাজ্যের গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে আনাই এখন সময়ের দাবি।’ ৩৭০ ধারা অবলুপ্তির ৫ বছর পার করে, পুনরায় ভূ-স্বর্গের সাংবিধানিক ক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিতে সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক চাপ ক্রমাগত বাড়ছে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!