Advertisement
  • দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
  • ডিসেম্বর ১৫, ২০২৫

নন্দা দেবীর তুষার আচ্ছাদনে পারমাণবিক ডিটোনেটর, ৬ যুগ পুরনো মার্কিন অভিযান ঘিরে ঘনাচ্ছে আশঙ্কার মেঘ

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
নন্দা দেবীর তুষার আচ্ছাদনে পারমাণবিক ডিটোনেটর, ৬ যুগ পুরনো মার্কিন অভিযান ঘিরে ঘনাচ্ছে আশঙ্কার মেঘ

১৯৬৫ সালের শীতল যুদ্ধের সময়। চিন তখন পারমাণবিক বোমা পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ঠিক সে সময় মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএয়ের একটি অদ্ভুত ও বিপজ্জনক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য, হিমালয়ের বরফদেশে গোপন অভিযান চালানোর উদ্যোগ নেয়। লক্ষ্য ছিল নন্দা দেবীর চূড়ায় একটি পারমাণবিক-চালিত অ্যান্টেনা স্থাপন করে চিনের মিসাইল পরীক্ষা নজরদারি করা। এ কাজের জন্য আমেরিকান ও ভারতীয় আরোহণকারীদের একটি ছোটো দলকে গোপনভাবে প্রস্তুত করা হয়।

তাদের হাতে ছিল একটি ১৩ কেজি ওজনের জেনারেটর, পোশাকি নাম ‘এসএনএপি-১৯সি’, যার মধ্যে ঠাসা ছিল প্লুটোনিয়াম। নাগাসাকিতে বিস্ফোরিত বোমার প্রায় এক-তৃতীয়াংশের সমান পারমাণবিক জ্বালানি। সবই চলছিল পরিকল্পনামাফিক। কিন্তু বাধ সাধে প্রকৃতি। অভিযানের শেষ পর্যায়ে পৌঁছানোর আগে হঠাৎ তুষারঝড় আছড়ে পড়ে দলটির উপর। উচ্চতার ঠাণ্ডা, অক্সিজেনের অভাব, খাওয়া-দাওয়ার সংকট— সব মিলিয়ে আরোহণকারীরা বেশিক্ষণ সেখানে টিকে থাকতে পারেননি। অভিযানের তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে ছিলেন ক্যাপ্টেন এম.এস. কোহলি। তিনি তৎক্ষণাৎ রেডিওতে সংকেত দেন, ‘দ্রুত ক্যাম্পে ফিরে আসুন। পারমানবিক বস্তুটি সুরক্ষিত জায়গায় রেখে আসুন, ওটা নিচে নামাবেন না।’ নির্দেশ পাওয়ামাত্র, বাঁচার তাগিদে সবাইকে নিচে নামতে হয়। বরফের দেশেই ফেলে আসা হয় মার্কিন পারমাণবিক জেনারেটরটিকে।

পরের বছর পুনরায় অভিযান চালানো হয়, কিন্তু বরফ-পাতাল ও হিমস্খলনের কারণে ডিভাইসটির আর খোঁজ পাওয়া যায়নি। ঘটনাটি তখন সরকারীভাবে চেপে রাখা হয়। এমনকি সিআইএ আজও স্বীকার করেনি যে, তারা এমন একটি দুঃসাহসিক অভিযান করেছিল। অনেক পরে, ১৯৭৮ সালে সাংবাদিক হাওয়ার্ড কোহন ‘আউটসাইড’ ম্যাগাজিনে ওই ব্যর্থ অথচ ভবিষ্যতের জন্য আশঙ্কাজনক অভিযানের কিছু অংশ প্রকাশ করেন। মুহূর্তেই দাবানলের মতো খবর ছড়িয়ে পড়ে। হিমালয়ের পাদদেশে থাকা ভারতের সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। ‘সিআইএ আমাদের জল-হাওয়াকে বিষাক্ত করছে’—এমন স্লোগান শোনা গেছিল বিক্ষোভকারীদের মুখে। যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার, গোপনভাবে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। একটি ব্যক্তিগত চিঠিতে তিনি দেশাইকে প্রশংসা করেন, ‘হিমালয়ের ডিভাইস সমস্যা’ পরিচালনার জন্য। তবে দুই দেশের সাধারণ নাগরিকের কাছে বহুদিন পর্যন্ত বিষয়টি গোপনই রাখা হয়। তুষারের প্রবাহমান বিস্মৃতির আড়ালে চাপা পড়ে যায় ঘটনাটি।

অথচ, অভিযানে অংশ নেওয়া মানুষদের স্মৃতিতে সে সময় আজও জীবন্ত। বিশেষ করে শেরপারা, তাঁরাই মূলত জেনারেটর বহন করে নিয়ে গিয়েছিলেন, তাঁরা আজও ভুলতে পারেননি সে কথা। অনেকেই জানিয়েছেন, প্লুটোনিয়ামের উষ্ণতা অনুভব করলেও তখন তার বিপদ বুঝতে পারেননি। তখন তরুণ মার্কিন আরোহণকারী, বর্তমানে আইনজীবি  জিম ম্যাকার্থি অনেক পরে বলেছিলেন,  ‘প্লুটোনিয়ামকে গঙ্গার হিমবাহের পাশে রেখে দেওয়া যায় না। গোটা ভারত সহ এশিয়ার জন্য এটি মারাত্মক বিপজ্জনক।’ ক্যাপ্টেন কোহলিও স্বীকার করেছিলেন, ‘সিআইএ পুরো পরিকল্পনা আমাদের জানায়নি। ওদের পরিকল্পনা ও কর্মপদ্ধতিতে অনেক ভুল ছিল। কিন্তু তখন ওই সিদ্ধান্ত নেওয়া ছাড়া আমাদের সামনে অন্য উপায় ছিল না। আমরা ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিলাম।’

আজও নন্দা দেবীর বরফ সেই জেনারেটরের অজানা ঠিকানা। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিশ্বউষ্ণায়ণ আর প্রকৃতির চরিত্র বদলে, বরফ গলে যাওয়ায় প্লুটোনিয়াম ধীরে ধীরে নদীতে প্রবাহিত হতে পারে। ওই হারানো ডিভাইসটি কেবল ইতিহাসের অংশ নয়, বরং আজও পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড়ো চ্যালেঞ্জ। দ্রুত সেটিকে উদ্ধার করা প্রয়োজন। ৬০ বছর কেটে গেছে, কিন্তু সেই গোপন অভিযান ও পরিণত বিপদের আশঙ্কা আজও ধাওয়া করছে ভারতকে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!