- এই মুহূর্তে দে । শ
- অক্টোবর ২২, ২০২৫
টেট বাধ্যতামূলক, সুপ্রিম নির্দেশে ৯০ হাজার প্রাথমিক শিক্ষকের চাকরি সঙ্কটে, রিভিউ পিটিশনের পথে রাজ্য। হাইকোর্টে চলছে পৃথক মামলা
টেট পাশ না করলে চাকরি থাকবে না— সুপ্রিম কোর্টের রায় কার্যকর হলে চাকরি হারাতে পারেন এ রাজ্যের প্রায় ৯০ হাজার প্রাথমিক ও উচ্চ প্রাথমিক শিক্ষক-শিক্ষিকা। এ আশঙ্কায় রাজ্য এখন দুটি রাস্তায় হাঁটছে। এক দিকে, উৎসবের মরসুম কাটতেই শীর্ষ আদালতে রায়ের পুনর্বিবেচনার আর্জি জানানো হবে খবর। অন্য দিকে, হাইকোর্টের ‘সবুজ সংকেত’ রাজ্য জুড়ে ফের টেট পরীক্ষার প্রস্তুতিও শুরু করে দিয়েছে শিক্ষা দফতর। তবে চলতি মামলাগুলো একত্রিত করে বৃহত্তর বেঞ্চে শুনানির প্রস্তুতিও নিচ্ছে উচ্চআদালত।
গত মাসেই সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত এবং বিচারপতি অগাস্টিন জর্জ মাসিহের ডিভিশন বেঞ্চ জানিয়ে দেয়, দেশের সমস্ত প্রাথমিক ও উচ্চ প্রাথমিক স্তরের শিক্ষককে টেট পাশ করতেই হবে। যাঁরা এখনো পর্যন্ত সে শর্ত পূরণ করতে পারেননি, তাঁদের আগামী দু-বছরের মধ্যেই টেট পাশ করতেই হবে। অন্যথায়, চাকরি ছাড়তে হবে, অথবা বাধ্যতামূলক অবসরের জন্য আবেদন জানাতে হবে। তবে যাঁদের চাকরি জীবনে আর ৫ বছরেরও কম সময় বাকি রয়েছে, তাঁদের এ নিয়মের বাইরে রাখা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পরে রাজ্য শিক্ষা দফতর রাজ্যের সমস্ত স্কুলে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের টেট সংক্রান্ত তথ্য চেয়ে পাঠিয়েছিল। সে তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি সমীক্ষা রিপোর্টে জানা গিয়েছে, প্রথম শ্রেণি থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ান, এমন প্রায় ৯০ হাজার শিক্ষক এখনও পর্যন্ত টেট উত্তীর্ণ নন।
নবান্ন সূত্রে খবর, শীর্ষ আদালতে রায় পুনর্বিবেচনার জন্য রাজ্য যে আর্জি জানাতে চলেছে, সে প্রক্রিয়ার সঙ্গে সমান্তরালভাবে টেট পরীক্ষার আয়োজনের দিকেও এগোচ্ছে স্কুল শিক্ষা দফতর। কারণ, আদালত যদি রায় বদলায় না, সেক্ষেত্রে আর সময় পাওয়া যাবে না। তাই শিক্ষক তালিকা ও পরীক্ষার প্রস্তুতি— দুই দিকেই নজর দিচ্ছে তৃণমূল সরকার। ভাইফোঁটার পরেই রাজ্য রিভিউ পিটিশন দাখিল করতে পারে বলে সূত্রের খবর। শিক্ষা দফতরের এক পদস্থ কর্তা বলেছেন, ‘পরিস্থিতি দ্রুত বদলাচ্ছে। আদালতের রায়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এগোতে গেলে আমাদের সব ধরনের প্রস্তুতি রাখতেই হবে। তাই তথ্য সংগ্রহ থেকে শুরু করে সম্ভাব্য পরীক্ষার আয়োজন, সব কাজই আমরা শুরু করে দিয়েছি।’ প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদের চেয়ারম্যান গৌতম পাল জানিয়েছেন, ‘শিক্ষকদের সংক্রান্ত যে কোনো মামলা আদালতে উঠলে শিক্ষা দফতরের কাছে নথিপত্র চাওয়া হবে। তাই আগে থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজনে পরীক্ষা নিতে হলেও যাতে পিছিয়ে না পড়ি, সে ব্যবস্থা করে রাখছি।’
এদিকে, এত দিন ধরে যাঁরা শিক্ষকতা করছেন, তাঁদের হঠাৎ করে চাকরি চলে যাওয়ার সম্ভাবনায় শিক্ষকমহলে ব্যাপক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে । কেউ কেউ আদালতের উপর ভরসা রাখলেও, এক বড়ো অংশ দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন। বঙ্গীয় শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতির সাধারণ সম্পাদক স্বপন মণ্ডলের বলেছেন, ‘২০১০ সালের শিক্ষার অধিকার আইন ও এনসিটিই-র গেজেট নোটিফিকেশন স্পষ্ট করে বলেছে, ২০১০-এর আগে নিযুক্ত শিক্ষক-শিক্ষিকাদের ক্ষেত্রে টেট বাধ্যতামূলক নয়। সে যুক্তিতেই আমরা আশা করছি, সুপ্রিম কোর্টের রায় পুনর্বিবেচনার রাজ্যের আবেদন খারিজ হবে না।’ তবে তিনি এটাও স্বীকার করেছেন যে, যদি আদালত টেট পরীক্ষার নির্দেশ বহাল রাখে, তা হলে অনেকেই ফের টেট পরীক্ষায় বসতে বাধ্য হবেন। শুধু রাজ্য সরকার নয়, একাধিক শিক্ষকও শীর্ষ আদালতে রায়ের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। তৃণমূল ঘনিষ্ঠ শিক্ষক নেতা অশোক রুদ্র, সিদ্ধার্থ রায়, কৃষ্ণেন্দু বিষয়েরা ইতিমধ্যেই রায়ের পুনর্বিবেচনার জন্য আবেদন জানিয়েছেন।তাঁরা প্রশ্ন তুলছেন, ২০১০ সালের ২৩ আগস্টের পর এনসিটিই টেট বাধ্যতামূলক করেছে। অথচ সুপ্রিম কোর্ট ২০১০ সালের আগের নিয়োগের ক্ষেত্রেও এই নিয়ম কার্যকর বলে জানিয়েছে। কীভাবে নতুন নিয়মকে রেট্রোস্পেকটিভ করে তোলা যায়? এই যুক্তিতে রায় পুনর্বিবেচনার আর্জি জানিয়েছেন শিক্ষকরা।
পুরো বিষয়টির সঙ্গে এখন আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রশ্ন যুক্ত হয়েছে— টেট এবং শিক্ষা অধিকার আইন সংখ্যালঘু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কতটা প্রযোজ্য হবে ? এই সংক্রান্ত একটি মামলা ইতিমধ্যেই সুপ্রিম কোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চে পাঠানো হয়েছে। সম্প্রতি সেখানে একটি নতুন জনস্বার্থ মামলা যুক্ত হওয়ায় বিষয়টি আরো জটিল হয়ে উঠেছে। ২০১২ সালের সাংবিধানিক সংশোধনের পর সংখ্যালঘু প্রতিষ্ঠানগুলিকে আরটিই আইনের বাইরে রাখা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান রায় সে ব্যতিক্রমকেও প্রশ্নের মুখে ফেলছে। এ বিষয়ে চূড়ান্ত রায় আসা পর্যন্ত পুরো দেশের শিক্ষক নিয়োগ পদ্ধতিই ঝুলে রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল। সুপ্রিম, রায়ের বিরুদ্ধে সরব হয়েছে ওয়েস্ট বেঙ্গল প্রাইমারি ট্রেইনড টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন । এনসিটিই-এর চেয়ারম্যান পঙ্কজ অরোরাকে একটি বিস্তারিত চিঠি পাঠিয়ে শিক্ষক সংগঠনটি জানিয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের রায়ের ফলে সারা দেশে প্রায় ৪০ লক্ষ শিক্ষক এবং পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ৩ লক্ষ শিক্ষক-শিক্ষিকা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত। চিঠিতে অভিযোগ, ‘রায় ঘোষণার পর থেকে রাজ্যের বহু শিক্ষক চরম মানসিক চাপে ভুগছেন। কেউ কেউ আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন, কেউ আবার আকস্মিক হৃদরোগে প্রাণ হারিয়েছেন। অনেকে মানসিক ভারসাম্য হারাচ্ছেন। ’সংগঠনের দাবি, এনসিটিই এবং কেন্দ্র সরকারকে অবিলম্বে এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে হবে। না হলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হতে পারে।’ সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক অশোক রুদ্র বলেছেন, ‘আমাদের একটাই লক্ষ্য— শিক্ষকরা যেন সম্মানজনকভাবে তাঁদের পেশা চালিয়ে যেতে পারেন। এভাবে অনিশ্চয়তার মধ্যে তাঁদের ফেলে দেওয়া অন্যায়।’
❤ Support Us






