Advertisement
  • দে । শ ন | ন্দ | ন | চ | ত্ব | র
  • ডিসেম্বর ২২, ২০২৫

রোয়িং-এ তিনদিনের আন্তর্জাতিক সেমিনার। মলাট উন্মোচন জিও হেরিটেজ: অরুণাচল প্রদেশ’ গ্রন্থের

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
রোয়িং-এ তিনদিনের আন্তর্জাতিক সেমিনার। মলাট উন্মোচন জিও হেরিটেজ: অরুণাচল প্রদেশ’ গ্রন্থের

কোনো সমাজ নিজের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে কী ভাবে দেখে, সেই দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যেই লুকিয়ে থাকে তার আত্মপরিচয়, ক্ষমতার বিন্যাস এবং ভবিষ্যতের দিশা। দীর্ঘদিন ধরে ভারতের মূলনিবাসী সমাজ ও তাদের জ্ঞানব্যবস্থাকে বহিরাগত চোখে দেখা হয়েছে— কখনো লোকাচার হিসেবে, কখনও ‘পিছিয়ে থাকা’ সংস্কৃতির উদাহরণ হিসেবে। সেই একরৈখিক দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে এসে সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে নতুন ভাবে ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন আজ আর কেবল অ্যাকাডেমিক আলোচনার বিষয় নয়, তা একটি সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্বও বটে। অরুণাচল প্রদেশের রোয়িংয়ে অনুষ্ঠিত ৩ দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সেমিনার সে দায়িত্বের কথাই পুনঃউচ্চারণে আলো ছড়াল।

অরুণাচল প্রদেশের লোয়ার দিবাং ভ্যালির রোয়িংয়ে অবস্থিত বিশ্বের প্রাচীন ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও উত্তরাধিকারের গবেষণা প্রতিষ্ঠান বা ‘রিওয়াচ’। ‘সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ব্যাখ্যা: দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন’ শীর্ষক এই সেমিনার শুধু একটি একাডেমিক সমাবেশ ছিল না। এটি ছিল দীর্ঘদিন ধরে বহিরাগত দৃষ্টিতে ব্যাখ্যাত মূলনিবাসী সংস্কৃতির নিজস্ব কন্ঠে, নিজস্ব ভাষায় এবং নিজস্ব বোধে তুলে ধরার এক আন্তরিক প্রয়াস। ঔপনিবেশিক ও আধিপত্যমূলক জ্ঞানচর্চার বাইরে এসে আদিবাসী দৃষ্টিভঙ্গিকে কেন্দ্রে রাখার এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে সময়োচিত। বিস্তৃত ও বহুমাত্রিক আলোচনা সভার সাময়িক সমাপ্তি হলো রোববার। দেশ-বিদেশের গবেষক, শিক্ষাবিদ ও সংস্কৃতিচর্চাকারীদের আলোকছটায় উদ্বেলিত হলো সেমিনার শেষের বইপ্রকাশ অনুষ্ঠানও।

বিবিধ আলোচনায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, আদিবাসী জ্ঞানব্যবস্থা কোনো অতীতচারী স্মৃতিচিহ্ন নয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ কিংবা সামাজিক সংগঠনের মতো সমসাময়িক সমস্যার ক্ষেত্রে এ জ্ঞান আজ সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। প্রাচীন ভারতীয় জ্ঞানধারার প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে আলোচনায় উঠে এসেছে— আধুনিকতার একমাত্র পথ পাশ্চাত্য অনুকরণ নয়, বরং স্থানীয় জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে আধুনিক বিজ্ঞান ও চিন্তার সংলাপ গড়ে তোলাই ভবিষ্যতের পথ। এ উদ্যোগের আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল আন্তঃসাংস্কৃতিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রসঙ্গ। মূলনিবাসী সংস্কৃতি নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক গবেষকদের মধ্যে জ্ঞান বিনিময় এবং যৌথ উদ্যোগের যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে আগামী দিনের গবেষণাকে আরো সমৃদ্ধ করবে। তিন দিনে উপস্থাপিত ৪৬টি গবেষণাপত্র সে বৈচিত্র্য ও গভীরতারই সাক্ষ্য বহন করেছে।

সেমিনারের শেষ দিনে পুনে-ভিত্তিক ‘জ্ঞান প্রবোধিনী’র ট্রাস্টি প্রশান্ত দিবাকর ‘সমসাময়িক সমাজে ভারতীয় জ্ঞানব্যবস্থার প্রাসঙ্গিকতা’ শীর্ষক অধিবেশনে বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন, প্রাচীন ভারতীয় জ্ঞান ও ঐতিহ্য শুধু অতীতের স্মারক নয়, বরং শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং সামাজিক সংগঠনের মতো আধুনিক সমস্যার কার্যকর সমাধানসূত্রও দিতে পারে। তাঁর বক্তব্য ঘিরে উপস্থিত গবেষক ও শিক্ষাবিদদের মধ্যে বিস্তৃত ও প্রাণবন্ত আলোচনা হয়। একই দিনে দিবেশ পণ্ডিত ‘ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর কালচারাল স্টাডিজ’-এর পরিচিতি তুলে ধরেন। তিনি জানান, এই আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানটি আন্তঃসাংস্কৃতিক বোঝাপড়া ও গবেষণাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে কাজ করছে। ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক গবেষকদের মধ্যে আদিবাসী সংস্কৃতি নিয়ে সহযোগিতা ও জ্ঞান বিনিময়ের সম্ভাবনার কথাও উঠে আসে তাঁর আলোচনায়।

তিনদিনের এই অনুষ্ঠানে সভামুখ্য হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অরুণাচলের উপ মুখ্যমন্ত্রী চাওনা মেন এবং ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক যশবন্ত পাঠক । সমাপনী অধিবেশনে অরুণাচল প্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ও রিওয়াচের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক মুকুট মিথির বক্তব্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি যে ভাবে মূলনিবাসী সংস্কৃতি সংরক্ষণে গবেষণা ও নথিভুক্তিকরণের গুরুত্বের কথা বলেছেন, তা বর্তমান ভারতের ‘উন্নয়ন না কি ধ্বংস’- আলোচনার প্রেক্ষাপটে নতুন করে ভাবার দাবি রাখে। উন্নয়ন মানেই যে অতীতকে মুছে ফেলা নয়, বরং অতীতের সঙ্গে সংলাপ রেখেই ভবিষ্যৎ নির্মাণ— এই বোধটাই এমন উদ্যোগের মূল সুর। এ উপলক্ষে প্রকাশিত সোমনাথ শর্মা ও ড. শম্ভু চক্রবর্তীর ‘জিও হেরিটেজ: অরুণাচল প্রদেশ’ গ্রন্থটি উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রকৃতির বহুমাত্রিক চেহারা। পাহাড়, নদী, শিলাস্তর, ভূগর্ভস্থ গঠন, জীবাশ্ম, খনিজের পাঠ, ভূগোল, জনজাতির ইতিহাস এক সূত্রে গেঁথে রাখার এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল। ভূপ্রকৃতি, পরিবেশ ও মূলনিবাসী সংস্কৃতির পারস্পরিক সম্পর্ককে সামনে এনে বইটি মনে করিয়ে দেয়— মানুষ ও প্রকৃতি আলাদা কোনো সত্তা নয়, বরং একই উত্তরাধিকারের অংশ। মুকুট মিথির বক্তব্যে সে কথা বারবার উঠে আসে। অনুষ্ঠানে সম্মানিত করা হয় গ্রন্থের দুই রচয়িতাকেই ।

বইটির প্রকাশক রিওয়াচ, একবছর ধরে গবেষণামূলক এই গ্রন্থের সম্পাদনা এবং নান্দনিকতার কারিগর হিসেবে দায়িত্ব সামলেছে আরম্ভ পাবলিশার্স ।

‘আরসিএমএলএস’ কেন্দ্রের প্রধান ড. মেচেক সাম্পার আওয়ান ৩ দিনের সেমিনারের একটি সমগ্র প্রতিবেদন পেশ করেন। সেখানে আলোচ্য বিষয়, মূল উপলব্ধি এবং ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশ উঠে আসে। রিওয়াচের উদ্যোগে এবং মওলানা আবুল কালাম আজাদ ইনস্টিটিউট অব এশিয়ান স্টাডিজ (কলকাতা), রাজীব গান্ধী বিশ্ববিদ্যালয় (দইমুখ), ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর কালচারাল স্টাডিজ (যুক্তরাষ্ট্র), অরুণাচল প্রদেশ বিশ্ববিদ্যালয় (পাসিঘাট) ও ‘ইন্ডিজেনাস ফেইথ অ্যান্ড কালচারাল সোসাইটি অব অরুণাচল প্রদেশ’-এর সহযোগিতায় এই সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!