- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- এপ্রিল ১৬, ২০২৬
‘বঙ্গভঙ্গের চক্রান্ত করছে বিজেপি’ : নারী সংরক্ষণ বিলের সঙ্গে, আসন পুনর্বিন্যাস জোড়া নিয়ে বিষ্ফোরক মন্তব্য মুখ্যমন্ত্রীর
বৃহস্পতিবার, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গলায় শোনা গেল তীব্র রাজনৈতিক অভিযোগের সুর। নারী সংরক্ষণ আইন সংশোধন এবং আসন পুনর্বিন্যাস (ডিলিমিটেশন) সংক্রান্ত কেন্দ্রের প্রস্তাবিত বিলগুলিকে ঘিরে তিনি সরাসরি ‘বঙ্গভঙ্গের চক্রান্ত’-এর ইঙ্গিত দিলেন। তাঁর দাবি, এই দুই বিষয়কে একসঙ্গে জুড়ে দেওয়ার নেপথ্যে রয়েছে সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক উদ্দেশ্য। যার মধ্যে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া এবং ‘এনআরসি’ কার্যকর করার সম্ভাবনাও লুকিয়ে রয়েছে।
কোচবিহার জেলার ঘোকসাডাঙার ছোটশিমূলগুড়ি গ্রাউন্ডে নির্বাচনী জনসভা থেকে এই ইস্যুতে প্রথমবার বিস্তারিতভাবে মুখ খোলেন তৃণমূল নেত্রী। রাজনৈতিক মহলে যখন ‘নারী শক্তি বন্দন অধিনিয়ম’ নিয়ে তুমুল চাপানউতোর চলছে, ঠিক সে সময়েই মমতার মন্তব্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘এখন বলছে বিল আনছে। মহিলাদের কত অসম্মান বলুন তো! ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণ— আমরা মনপ্রাণ দিয়ে সমর্থন করেছি। সংসদে অনেক লড়াই করেছি। আমাদের দলও লড়েছে। কিন্তু এতদিন ধরে পড়ে থাকা এই বিলের সঙ্গে হঠাৎ করে জনবিন্যাস কেন জুড়ছ? একসঙ্গে কেন? বাংলাকে ভাগ করার চক্রান্ত করছো?’ তাঁর অভিযোগ, নারী সংরক্ষণকে সামনে রেখে আসলে বৃহত্তর রাজনৈতিক চক্রান্ত কার্যকর করার চেষ্টা চলছে।
মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে আসে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ আশঙ্কা। তাঁর দাবি, প্রস্তাবিত বিলগুলিকে একত্রে আনার মাধ্যমে ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে বহু মানুষের নাম বাদ দেওয়া হতে পারে এবং তারই আড়ালে ‘এনআরসি’ চালুর পথ সুগম করা হতে পারে। ‘এটা শুধু বিল নয়, এর মধ্যে অনেক বড়ো ষড়যন্ত্র লুকিয়ে আছে’—এমনই ইঙ্গিত দেন তিনি। উল্লেখ্য, ২০২৩ সালে সংসদে পাশ হয়েছিল ‘নারী শক্তি বন্দন অধিনিয়ম’। সে সময় বিরোধী দলগুলিও বিলটির পক্ষে সমর্থন জানায়। ওই আইনে উল্লেখ ছিল, লোকসভা এবং বিধানসভায় মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ আসন সংরক্ষিত থাকবে। তবে ওই সংরক্ষণ কার্যকর হবে জনগণনার পর আসন পুনর্বিন্যাসের ভিত্তিতে। অর্থাৎ, আগে ‘ডিলিমিটেশন’, তারপর সংরক্ষণ, এরকম ধাপেই এগোনোর কথা ছিল।
কিন্তু বর্তমানে কেন্দ্রের অবস্থান নিয়ে উঠছে প্রশ্ন। বিরোধীদের অভিযোগ, মোদি সরকার আর নতুন জনগণনার জন্য অপেক্ষা করতে চাইছে না। ২০১১ সালের জনগণনার ভিত্তিতেই আসন পুনর্বিন্যাস করে তার উপর ভিত্তি করে নারী সংরক্ষণ কার্যকর করার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। এই প্রস্তাবেই আপত্তি জানিয়ে সরব হয়েছে বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’। সংসদীয় অঙ্কও এই বিতর্কে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। লোকসভায় কোনও বিল পাশ করাতে উপস্থিত সাংসদদের দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন প্রয়োজন। ৫৪৩ জন সদস্য উপস্থিত থাকলে অন্তত ৩৬২টি ভোট দরকার। বর্তমানে এনডিএ-র হাতে রয়েছে ২৯৩ জন সাংসদ, অন্যদিকে ‘ইন্ডিয়া’ জোটের শক্তি প্রায় ২৩০ থেকে ২৪০। ফলে সংখ্যার নিরিখে বিল পাশ করানো সহজ নয় বলেই মনে করা হচ্ছে। যদিও ভোটাভুটির দিন সাংসদদের অনুপস্থিতি সমীকরণ বদলে দিতে পারে।
এই পরিস্থিতিতেই বিশেষ অধিবেশন ডেকে নারী সংরক্ষণ সংশোধনী বিলের পাশাপাশি ডিলিমিটেশন বিল এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল সংক্রান্ত সংশোধনী বিলও লোকসভায় পেশ করেছে কেন্দ্র। বিলগুলি পাশ হলে দেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে বড়োসড়ো পরিবর্তন আসতে পারে বলেই মত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের। লোকসভার আসন সংখ্যা ৫৪৩ থেকে বাড়িয়ে প্রায় ৮৫০ করার প্রস্তাব রয়েছে। একই সঙ্গে রাজ্যসভা এবং বিভিন্ন রাজ্যের বিধানসভার আসন সংখ্যাও বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু ঠিক কী সূত্রে বাড়বে এই আসন সংখ্যা, তা নিয়েই মূল বিতর্ক। সরকারের একাংশের মতে, ২০১১ সালের জনগণনার ভিত্তিতে আসন পুনর্বিন্যাস করা হতে পারে। সেই ক্ষেত্রে উত্তর ভারতের তুলনায় দক্ষিণ এবং পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলি বঞ্চিত হতে পারে— এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিরোধীরা। কারণ, ১৯৭১ সালের পর জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার উত্তর ভারতে তুলনামূলক বেশি, দক্ষিণ ও পূর্ব ভারতে কম। ফলে নতুন হিসাব অনুযায়ী আসন বণ্টনে ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে।
অন্য একটি সূত্র অবশ্য জানাচ্ছে, এ জটিলতায় না গিয়ে বর্তমান আসন সংখ্যার উপর প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি করা হতে পারে। সেই হিসাবেই লোকসভার আসন সংখ্যা বাড়িয়ে প্রায় ৮৫০ করা হতে পারে, যার মধ্যে প্রায় ৩৫টি আসন থাকবে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলির জন্য এবং বাকি ৮১৫টি রাজ্যগুলির মধ্যে বণ্টিত হবে। এই প্রেক্ষাপটে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে রাজ্যে লোকসভার আসন সংখ্যা ৪২। তা প্রায় ৫০ শতাংশ বাড়লে দাঁড়াতে পারে ৬২ বা ৬৩-এ। একই সঙ্গে রাজ্য বিধানসভার আসন সংখ্যাও বাড়ানো হতে পারে। এখন যেখানে ২৯৪টি আসন রয়েছে, তা বেড়ে প্রায় ৪৪১-এ পৌঁছতে পারে। অর্থাৎ, ১৪৭টি নতুন আসন যুক্ত হতে পারে। পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ২০২৯ সালের মধ্যেই নতুন আসন বিন্যাস কার্যকর করার লক্ষ্য কেন্দ্রের। সেই হিসেবে ২০২৬ সালের নির্বাচনই হতে পারে ২৯৪ আসনের শেষ বিধানসভা নির্বাচন। ২০৩১ সালের নির্বাচনে সম্পূর্ণ নতুন আসন বিন্যাস কার্যকর হতে পারে।
এই সামগ্রিক প্রেক্ষাপটেই নারী সংরক্ষণ বিলের সঙ্গে ডিলিমিটেশনকে যুক্ত করার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর দাবি, এটি কেবল প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়, বরং এর মধ্যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সুস্পষ্ট। ‘এটা আসলে রাজ্য ভাগের চক্রান্ত, ভোটারদের নাম কাটা এবং এনআরসি করার পরিকল্পনা’—এমন অভিযোগ তুলে তিনি ভোটের মুখে কেন্দ্রকে চাপে রাখতে চেয়েছেন বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল। বাংলার ২৯৪ আসনে বিধানসভা নির্বাচনের ভোটগ্রহণ হবে দুই দফায়— ২৩ এবং ২৯ এপ্রিল। ফল ঘোষণা ৪ মে। তার আগে নারী সংরক্ষণ ও আসন পুনর্বিন্যাস ইস্যু ঘিরে শাসক-বিরোধী সংঘাত যে আরও তীব্র হবে, তা স্পষ্ট।
❤ Support Us






