- এই মুহূর্তে দে । শ
- এপ্রিল ২১, ২০২৬
ভোট-হিংসার বলি ! ইসলামপুরে সিপিআইএম কর্মীকে অপহরণ করে খুনের অভিযোগ
বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হচ্ছে রাজ্যের প্রথম দফার ভোট। নির্বাচন কমিশন বারবার দাবি করেছে, ২৬-এর নির্বাচন হবে অবাধ, হিংসাবিহীন, শান্তিপূর্ণ। পুলিশের পাশাপাশি, বিপুল সেনাবাহিনী সদস্য প্রায় প্রতিটি বুথেই সক্রিয়। চলছে টহল, ধরপাকড়। এরই মধ্যে, ভোটের মাত্র ২ দিন আগে উত্তর দিনাজপুরের ইসলামপুরে এক যুবকের রহস্যমৃত্যুকে কেন্দ্র করে ছড়িয়েছে প্রবল চাঞ্চল্য। মৃতের পরিবারের সরাসরি অভিযোগ— সিপিআই(এম) করার ‘অপরাধেই’ খুন করা হয়েছে নূর আজমকে। অভিযোগের তির শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের দিকে। যদিও অভিযোগ অস্বীকার করেছে তৃণমূল নেতৃত্ব।
পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, সোমবার সকাল থেকেই বাড়িতে ছিলেন না নূর আজম। বেলা গড়ালেও তাঁর কোনো খোঁজ মেলেনি। পরিবারের দাবি, দুপুরের দিকে এক তৃণমূল-ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি তাঁকে ডেকে নিয়ে যায়। তারপর থেকেই নিখোঁজ ছিলেন তিনি। সন্ধ্যার পর আচমকাই বাড়ি ফেরেন নূর। কিন্তু তখন তাঁর শারীরিক ও মানসিক অবস্থা ছিল অস্বাভাবিক। পরিবারের সদস্যদের কথায়, ‘বাড়ি ঢুকেই অদ্ভুত আচরণ শুরু করে। কিছু জিজ্ঞাসা করলেও কোনো উত্তর দিচ্ছিল না। অসংলগ্ন কথা বলছিল, আচমকা জিনিসপত্র ভাঙচুর করতে শুরু করে। ও ভীষণ আতঙ্কিত ছিল।’ আতঙ্কিত অবস্থায় কেবল বলতে থাকেন, ‘আমাকে মেরে ফেলবে’।
দ্রুতই তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে। পরিবারের লোকজন একপ্রকার জোর করেই তাঁকে ইসলামপুর মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে নিয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। আকস্মিক এই মৃত্যুর পরেই এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে উত্তেজনা। কী ভাবে তাঁর মৃত্যু হল, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর ধোঁয়াশা। পুলিশ দেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তে পাঠিয়েছে। প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পরই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ স্পষ্ট হবে।
তবে মৃতের পরিবার শুরু থেকেই খুনের অভিযোগ তুলেছে। তাঁদের দাবি, নূর আজম সিপিআই(এম)-এর সক্রিয় কর্মী ছিলেন, যুব ফেডারেশনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। ভোট প্রচারে দলের পতাকা হাতে অংশ নিচ্ছিলেন। সে কারণেই তিনি স্থানীয় তৃণমূল নেতৃত্বের ‘কু-নজরে’ পড়েছিলেন। পরিবারের আরও অভিযোগ, গত কয়েক দিন ধরে তাঁকে হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। ঘটনার দিনও তাঁকে ফোন করে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বলে দাবি তাঁদের। অন্যদিকে, সমস্ত অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। দলের সংখ্যালঘু সেলের জেলা সভাপতি জাভেদ আখতার বলেন, ‘কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকতেই পারে। পুলিশ তদন্ত করে দেখুক। আমরা চাই, প্রকৃত দোষীরা শাস্তি পাক।’
ঘটনার জেরে রাজনৈতিক চাপানউতোর আরও তীব্র হয়েছে। সিপিআই(এম) প্রার্থী সামি খান হাসপাতালে গিয়ে মৃতের পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘নূর আমাদের দলের কর্মী ছিল। মনোনয়ন থেকে প্রচার, সব জায়গাতেই ও সক্রিয় ছিল। কিছু দিন ধরে শুনছিলাম, ওকে মানসিক চাপ দেওয়া হচ্ছে। এ ভাবে ওর মৃত্যু মেনে নেওয়া যায় না। এ মৃত্যু পরিকল্পিত বলেই আমাদের সন্দেহ। পূর্ণাঙ্গ তদন্ত চাই, দোষীদের কঠোর শাস্তি হোক।’ সামি খান আরও বলেন, ‘আমার প্রার্থী হওয়ায় অনেকেরই অসুবিধা হচ্ছে। তৃণমূল কংগ্রেস মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নিচ্ছে। ভোটের ৪৮ ঘণ্টা আগে এই ঘটনা প্রমাণ করে, পশ্চিমবঙ্গ এখনো শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত নয়।’
নূর আজমের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই গুঞ্জরিয়া ও ইসলামপুর এলাকায় সিপিআই(এম) কর্মী-সমর্থকদের ভিড় জমতে শুরু করে। ইসলামপুর মহকুমা হাসপাতাল চত্বরে জড়ো হন বাম কর্মী-সমর্থকেরা। পরিস্থিতি সামাল দিতে মোতায়েন করা হয় পুলিশ বাহিনী। কেন্দ্রীয় বাহিনীর নজরদারিও জোরদার করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন সূত্রে খবর, ইতিমধ্যেই জেলার প্রশাসনিক কর্তাদের কাছে রিপোর্ট তলব করা হয়েছে। জেলা পুলিশ সুপার রাকেশ সিংহ জানিয়েছেন, ‘পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পেলে মামলা দায়ের করে তদন্ত শুরু করা হবে।’ এখনো পর্যন্ত থানায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের হয়নি বলেই জানা গিয়েছে।
উল্লেখ্য, ভোট শুরুর আগমুহূর্তে এ ঘটনায় প্রশ্ন উঠছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে। কমিশনের দাবি, রাজ্যে এখনো পর্যন্ত বড়ো কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু ইসলামপুরের এই রহস্যমৃত্যু সেই দাবিকে নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলল বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ। এখন সকলের নজর ময়নাতদন্তের রিপোর্টের দিকে। সে রিপোর্টই কি নূর আজমের মৃত্যুর রহস্য ভেদ করবে? না কি রাজনৈতিক তরজা আরও জটিল করবে পরিস্থিতিকে, সে উত্তরই খুঁজছে ইসলামপুর।
❤ Support Us






