- প্রচ্ছদ রচনা
- এপ্রিল ২২, ২০২৬
জাতিসংঘের উন্নয়ন প্রকল্পের আশঙ্কা, পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের আঘাতে ভারতে বাড়তে পারে দারিদ্র্য
পশ্চিম এশিয়ায় ক্রমশ জটিল হয়ে ওঠা সামরিক সংঘাতের প্রভাব, সরাসরি ভারতের অর্থনীতিতে আঘাত হানতে পারে তার স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলছে রাষ্ট্রসঙ্ঘের উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি)-র বিশদ প্রতিবেদনে। তাতে বলা হয়েছে, যুদ্ধের পরোক্ষ কবলে পড়ে ভারতে দারিদ্র্যের হার ২৩.৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৪.২ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। সংখ্যার বিচারে, প্রায় ২৫ লক্ষ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের অতলে তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন। ফলে, দেশে মোট দরিদ্রসীমার নীচে থাকা মানুষের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াতে পারে আনুমানিক ৩৫৪ মিলিয়ন, যা আগে ছিল প্রায় ৩৫১.৫ মিলিয়ন।
‘মিলিটারি এস্কালেশন ইন দ্য মিডল ইস্ট: হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট ইমপ্যাক্টস অ্যাক্রস এশিয়া অ্যান্ড দ্য প্যাসিফিক’ শীর্ষক প্রতিবেদনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, সংঘাতের অভিঘাত বহুমাত্রিক। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, পরিবহণ খরচ বেড়ে যাওয়া, কাঁচামালের সরবরাহে ব্যাঘাত, উৎপাদন খরচের ঊর্ধ্বগতির সরাসরি প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার উপর। ফলে খাদ্য নিরাপত্তা প্রশ্নের মুখে পড়বে, চাপে পড়বে সরকারি ব্যয় কাঠামো, দুর্বল হবে জীবিকা। ফলে, খাদ্য নিরাপত্তা কমছে, সরকারি বাজেটের উপর চাপ বাড়ছে, জীবিকার ভিত দুর্বল হয়ে পড়ছে। শুধু ভারত নয়, গোটা এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলই এই অভিঘাতে কাঁপছে, সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতির অঙ্ক ধরা হয়েছে প্রায় ২৯৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
এই সম্ভাব্য দারিদ্র বৃদ্ধির আশঙ্কার মধ্যে ফের সামনে এসেছে দারিদ্র্য মাপার পদ্ধতি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক একদিকে, বিশ্বব্যাংকের পরিসংখ্যানকে উল্লেখ করে ‘আচ্ছে দিন’-এর খোয়াব দেখানো কেন্দ্র সরকার দাবি করছে, দেশে চরম দারিদ্রসীমার নীচে থাকা মানুষ, অর্থাৎ যাদের আয় ৩ ডলার প্রতিদিন, সে সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ৫.৩ শতাংশে। অন্য দিকে, নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশের মানদণ্ডে, অর্থাৎ দৈনিক ৪.২০ ডলার আয়ের ভিত্তিতে, এখনো ভারতের প্রায় ২৩.৯ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করছেন। অর্থাৎ, প্রায় ৩৪ কোটিরও বেশি মানুষ এমন এক প্রান্তিক অবস্থায় রয়েছেন, যেখানে মূল্যবৃদ্ধি, স্বাস্থ্য সংক্রান্ত ব্যয়, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা বা জলবায়ুজনিত বিপর্যয়, যে কোনো কারণেই তাঁদের অবস্থান আরও নড়বড়ে হয়ে উঠতে পারে। দুই পরিসংখ্যানের ফারাকই তুলে ধরছে ভারতের অর্থনৈতিক বাস্তবতার দ্বৈত চিত্র, একদিকে চরম দারিদ্র্য হ্রাসের সাফল্য, অন্যদিকে বিশাল জনগোষ্ঠীর অনিশ্চিত অবস্থান।
এমন পরিস্থিতিতে কেন্দ্রের অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। সংসদে বারংবার দারিদ্র্যসীমা পুনর্নির্ধারণ, বর্তমান মূল্যস্তরের সঙ্গে তার সামঞ্জস্য এবং আয়ের ভিত্তিতে দারিদ্র্য নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হলেও, সরকারের তরফে স্পষ্ট কোনো জবাব মেলেনি। বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বহুমাত্রিক দারিদ্র্য সূচক–এর উল্লেখ করে বিষয়টি পাশ কাটানো হয়েছে বলে অভিযোগ। অথচ ‘অক্সফোর্ড পোভার্টি অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ’ স্পষ্ট জানিয়েছে, এমপিআই গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা আয়ের ভিত্তিতে দারিদ্র্যের বিকল্প নয়। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বাসস্থান বা মৌলিক পরিষেবার অভাব নির্ণয়ে এ সূচক কার্যকর হলেও, মানুষের হাতে প্রকৃতপক্ষে কত টাকা রয়েছে, অর্থাৎ তারা দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম কি না সে প্রশ্নের উত্তর এ দিয়ে পাওয়া যায় না।
পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের প্রেক্ষিতে ভারতের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। দেশের মোট অপরিশোধিত তেলের আমদানির ৯০ শতাংশেরও বেশি আসে বিদেশ থেকে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ পশ্চিম এশিয়া নির্ভর। শুধু তাই নয়, এলপিজি-র প্রায় ৯০ শতাংশ এবং সার আমদানির প্রায় ৪৫ শতাংশও ওই অঞ্চল থেকেই আসে। ফলে জ্বালানির দামের ওঠানামা সরাসরি প্রভাব ফেলছে কৃষি থেকে শিল্প সব ক্ষেত্রেই। বাণিজ্য ক্ষেত্রেও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা প্রবল। ভারতের মোট রফতানির প্রায় ১৪ শতাংশ এবং আমদানির ২০ শতাংশেরও বেশি পশ্চিম এশিয়ার সঙ্গে যুক্ত। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে পরিবহণ খরচ বৃদ্ধি, বীমা ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং সরবরাহে দেরি, সব মিলিয়ে বাণিজ্যিক সম্পর্কেও ধাক্কা লাগতে পারে। প্রায় ৪৮ বিলিয়ন ডলারের বাসমতী চাল, চা, রত্ন ও গয়না, পোশাকশিল্প বিপর্যস্ত হতে পারে।
খাদ্য নিরাপত্তা নিয়েও বাড়ছে উদ্বেগ। প্রতিবেদনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সংকট আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে, কারণ উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক মন্দার ফলে ‘রেমিট্যান্স’ কমে গেলে তার সরাসরি প্রভাব ফেলবে গ্রামীণ ও নিম্নবিত্ত পরিবারের আয় ও ক্রয়ক্ষমতার উপর। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৯.৩৭ মিলিয়ন ভারতীয় ওই অঞ্চলে কর্মরত, যাঁদের পাঠানো অর্থ দেশের মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ৪০ শতাংশ। এ আয়ের উৎসে টান পড়লে দেশের অর্থনৈতিক ভারসাম্যেও তার প্রভাব পড়বে। পাশাপাশি, খরিফ মরসুমের আগে সার সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটলে কৃষি উৎপাদনে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। যদিও বর্তমানে ইউরিয়ার মজুত কিছুটা স্বস্তি দিচ্ছে, দীর্ঘমেয়াদে পরিস্থিতি অনিশ্চিত।
শুধু অর্থনীতি নয়, কর্মসংস্থান ক্ষেত্রেও বিপদের ইঙ্গিত স্পষ্ট। বিশেষ করে ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প নির্ভর ক্ষেত্রগুলিতে— যেমন আতিথেয়তা, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, নির্মাণ সামগ্রী, ইস্পাত শিল্প, রত্ন ও হীরা শিল্পে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, কাঁচামালের অভাব ও রপ্তানি বাতিলের ফলে কাজের সুযোগ কমে যেতে পারে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক শ্রমশক্তির উপর। কাজের সময় কমে যাওয়া, চাকরি হারানো, ব্যবসার ধারাবাহিকতায় বিঘ্ন, মিলিয়ে গভীর শ্রমবাজার সংকটের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। স্বাস্থ্য ক্ষেত্রেও চাপ বাড়ছে। হরমুজ প্রণালীর আশেপাশে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় চিকিৎসা সরঞ্জামের কাঁচামালের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা। ইতিমধ্যেই ওষুধের পাইকারি দাম ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বেড়েছে।
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এখন একাধিক সূচকের সমন্বয়ে দারিদ্র্য নির্ধারণের চেষ্টা চলছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলি যেমন আয়ের ভিত্তিতে আপেক্ষিক দারিদ্র্য ও সামাজিক বঞ্চনার সূচক একসঙ্গে ব্যবহার করে, তেমনই ভুটান ও ভিয়েতনামের মতো দেশও বহুমাত্রিক ও আর্থিক উভয় সূচকই সমান্তরাল ভাবে প্রকাশ করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতকেও এ পথে হাঁটতে হবে। একটি বিশেষ ‘ড্যাশবোর্ড পদ্ধতি’ গ্রহণ করে, যেখানে দারিদ্র্যের বিভিন্ন মাত্রা একসঙ্গে প্রতিফলিত হবে। তাই, এই মুহূর্তে ভারতে দারিদ্র্যের হার ৫ শতাংশ না ২৪ শতাংশ, এ বিতর্ক আর নিছক পরিসংখ্যানের অঙ্ক নয়। এটিই নির্ধারণ করবে কে সরকারি সহায়তা পাবেন, কার কীভাবে সামাজিক সুরক্ষা গড়ে উঠবে আর সর্বোপরি দেশের উন্নয়নের আসল ছবিটা কী। ২০৪৭ সালের ‘বিকশিত ভারত’-এর লক্ষ্যে পৌঁছতে গেলে, শুধুমাত্র চরম দারিদ্র্য হ্রাসের সাফল্যে সন্তুষ্ট থাকলে চলবে না, বরং অর্থনৈতিক নিরাপত্তার বিস্তৃত সংজ্ঞা নির্ধারণ করাই এখন সময়ের দাবি। এ প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালে প্রস্তাবিত ‘ন্যাশনাল হাউসহোল্ড ইনকাম সার্ভে’ একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় আনতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। দেশের প্রথম সর্বভারতীয় আয়ভিত্তিক সমীক্ষা হিসেবে এটি দারিদ্র্য নির্ধারণের নতুন ভিত্তি তৈরি করতে পারে, যা বহুমাত্রিক সূচকের সঙ্গে মিলিয়ে, আরও বাস্তবসম্মত ও স্বচ্ছ চিত্র তুলে ধরতে পারে।
❤ Support Us








