- প্রচ্ছদ রচনা স | হ | জ | পা | ঠ
- এপ্রিল ২০, ২০২৬
হিমালয়ের ঝুলন্ত হিমবাহে অস্থিতিশীল বরফস্তর, নয়া সমীক্ষায় আসন্ন বিপর্যয়ের ইঙ্গিত
লোকচক্ষুর আড়ালে, হিমালয়ের বুক নিঃশব্দে জমাচ্ছে অশনি-সংকেত। খাড়া পাহাড়ের গায়ে ঝুলে থাকা হিমবাহগুলির বড়ো অংশ ক্রমশ অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে। ফলে, উচ্চ হিমালয়ের বুক থেকে নেমে আসতে পারে বিপর্যয়। আমন আশঙ্কাকে তথ্য-প্রমাণে প্রতিষ্ঠা করল সাম্প্রতিক একটি বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা। উত্তরাখণ্ডের অলকানন্দা অববাহিকায় অন্তত ২১৯টি ঝুলন্ত হিমবাহ চিহ্নিত করেছেন গবেষকরা, যেগুলির অধিকাংশই বর্তমানে অস্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে। উষ্ণতা বৃদ্ধি এবং আবহাওয়ার দ্রুত পরিবর্তনের জেরে হিমবাহের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই ভেঙে পড়বার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে, যে কোনো সময় ভয়াবহ তুষারধস নামতে পারে বিস্তীর্ণ অঞ্চলে।
বেঙ্গালুরুর ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স, আইআইটি ভুবনেশ্বর এবং চণ্ডীগড়ের ডিআরডিও-র যৌথ উদ্যোগে সম্প্রতি এই সমীক্ষা চালানো হয়েছে। দিভেচা সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ-এর নন্দু কৃষ্ণন ও ড. অনিল ভি কুলকার্নী, আইআইটি ভুবনেশ্বরের আশিম সাত্তার এবং ডিআরডিও-র হরেন্দ্র সিং নেগি; এই চার গবেষকের কাজ প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক সমীক্ষিত জার্নাল ‘এনপিজে ন্যাচারাল হ্যাজারডস’-এ। গবেষকদের বক্তব্য, হিমালয়ের উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে গত দুই দশকে যে হারে উষ্ণতা বেড়েছে, তা বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে দ্রুত গলছে হিমবাহ, বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে উপ-হিমবাহ, এবং ক্রমশ অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে পাহাড়ের ঢালে ঝুলে থাকা বরফস্তরগুলি। এই ‘হ্যাংগিং গ্লেসিয়ার’ বা ঝুলন্ত হিমবাহই এখন সবচেয়ে বড়ো উদ্বেগের কারণ।
সমীক্ষায় উঠে এসেছে, অলকানন্দা অববাহিকায় ছড়িয়ে থাকা এই ২১৯টি ঝুলন্ত হিমবাহের মোট আয়তন প্রায় ৭২ বর্গ কিলোমিটার। বরফের পরিমাণ আনুমানিক ২.৩৯ ঘন কিলোমিটার। এর মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হিমবাহই এই মুহূর্তে ‘অত্যন্ত অস্থিতিশীল’, অর্থাৎ যে কোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে। তা থেকেই শুরু হতে পারে ভয়াবহ তুষারধস বা আইস অ্যাভালাঞ্চ। বিশেষজ্ঞদের মতে, ঝুলন্ত হিমবাহের স্বভাবই হল খাড়া ঢালে আটকে থাকা এবং হঠাৎ ভেঙে পড়া। অতীতে এ ধরনের ভাঙন প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই দেখা হতো। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, বর্তমানের ভাঙন ঘটছে জনবসতি, রাস্তা বা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর কাছাকাছি অঞ্চলে।
গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু অলকানন্দা অববাহিকা গঙ্গার এক প্রধান উৎসধারা। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪০০ মিটার থেকে ৭,৮০০ মিটার পর্যন্ত বিস্তৃত এই অঞ্চল একাধারে ভৌগোলিকভাবে ভঙ্গুর এবং মানবিকভাবে ক্রমবর্ধমান চাপে ক্লান্ত। বদ্রীনাথ ও কেদারনাথের মতো তীর্থস্থান, পর্যটনের বিস্তার, নতুন রাস্তা, ট্রেকিং রুট, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প— সব মিলিয়ে এই পার্বত্য অঞ্চল এখন আর নিঃসঙ্গ নয়। বরং মানুষের উপস্থিতি যত বাড়ছে, ততই বাড়ছে ঝুঁকির মাত্রা। ঝুঁকিপূর্ণ এই হিমবাদের মোট বিস্তার প্রায় ৭২ বর্গ কিলোমিটার এবং বরফের পরিমাণ আনুমানিক ২.৩৯ ঘন কিলোমিটার। এগুলি প্রধানত দক্ষিণ-পূর্ব থেকে পশ্চিম এবং উত্তর-উত্তর-পূর্বমুখী, আর উচ্চ অলকানন্দা অববাহিকাতেই রয়েছে মোট ঝুলন্ত বরফের প্রায় ৩০ শতাংশ।
গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০০০ সালে যেখানে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নির্মিত অঞ্চল ছিল মাত্র ৮ হাজার বর্গমিটার, তা ২০৩০ সালের মধ্যে বেড়ে ১ লক্ষ ৫০ হাজার বর্গমিটারেরও বেশি হতে পারে। একই সঙ্গে জনসংখ্যাও কয়েকশো থেকে বেড়ে হাজারের গণ্ডি পেরিয়ে যাবে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র বদ্রীনাথ-মানা এলাকায়। সেখানে পাহাড়ের খাড়া ঢালের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বসতি ও অবকাঠামো। জাতীয় সড়ক ৭-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথও সম্ভাব্য তুষারধসের সম্ভাব্য এলাকার মধ্যে পড়ে। স্যাটেলাইট চিত্র, উচ্চতা মডেল এবং তুষারধস সিমুলেশনের সাহায্যে গবেষকরা অনুমান করেছেন, ভয়াবহ পরিস্থিতিতে বরফধস মানা, বদ্রীনাথ এমনকি হনুমান চট্টির মতো জনবসতিতেও পৌঁছে যেতে পারে। কোথাও কোথাও ধসের স্তূপ ৫০ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে।
তুষারধসের আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো নদীর প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়া। বরফ ও ধ্বংসাবশেষ জমে নদী আটকে গিয়ে অস্থায়ী হ্রদ তৈরি করতে পারে। পরে সে হ্রদ ভেঙে গেলে আকস্মিক বন্যা বা ‘ফ্ল্যাশ ফ্লাড’ তৈরি হবে, যা নিম্ন উপত্যকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ধ্বংসলীলা চালাতে পারে। এ আশঙ্কা নিছক তাত্ত্বিক নয়, অতীতেই তার প্রমাণ মিলেছে। ২০২১ সালের চামোলি বিপর্যয় দেখিয়েছে, কীভাবে একটি হিমবাহ ভেঙে পড়া মুহূর্তের মধ্যে ভয়াবহ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়ে প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত বিপর্যয় ঘটাতে পারে। তারও আগে বিভিন্ন তুষারধস নদী আটকে বন্যা সৃষ্টি করেছে।
তবে গবেষকরা জানিয়েছেন, সব ঝুলন্ত হিমবাহ সমান বিপজ্জনক নয়। কিছু হিমবাহ বড়ো বরফস্তরের উপর ঝুলে থাকে, ফলে তাদের ভাঙনে সরাসরি জনবসতির ক্ষতি কম। কিন্তু যেগুলি সরাসরি নদী উপত্যকা বা বসতির উপর অবস্থান করছে, সেগুলিই সবচেয়ে বিপজ্জনক, সেখানে সামান্য ভাঙনও বড়ো বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। সমীক্ষায় স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে সরকারি স্তরের ঘাটতির কথা। হিমালয়ে ঝুলন্ত হিমবাহ পর্যবেক্ষণের জন্য কার্যত কোনো বৃহৎ পরিসরের ব্যবস্থা নেই। অথচ ইউরোপের আল্পস অঞ্চলে এ ধরনের হিমবাহ নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখা হয় উন্নত রাডার, টাইম-ল্যাপ্স ক্যামেরা এবং আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থার মাধ্যমে।গবেষকদের মতে, হিমালয়ের মতো বিশাল অঞ্চলে সর্বত্র এ ব্যবস্থা গড়ে তোলা কঠিন হলেও, সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিমবাহগুলি চিহ্নিত করে সেখানে লক্ষ্যভিত্তিক নজরদারি চালানো জরুরি।
সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, গোটা ভারতীয় হিমালয়জুড়ে অন্তত ৮৫৮টি ঝুলন্ত হিমবাহ রয়েছে। যমুনা অববাহিকায় ৯৯টি, অলকানন্দায় ২১৯টি, ভাগীরথীতে ২৬১টি এবং কালী অববাহিকায় ২৭৯টি। এদের মধ্যে সঞ্চিত জলের পরিমাণ প্রায় ৩,২৩৬ গিগাটন।বিভিন্ন অববাহিকায় জলসংগ্রহের পরিমাণও বিস্ময়কর— সিন্ধু অববাহিকায় ২,১০৩ ঘন কিলোমিটার, গঙ্গায় ৫৯৬ ঘন কিলোমিটার এবং ব্রহ্মপুত্রে ৮৯৭ ঘন কিলোমিটার। এই বিপুল জলভাণ্ডার যদি হঠাৎ মুক্তি পায়, তার অভিঘাত কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়। ড. অনিল ভি কুলকার্নী জানিয়েছেন, এ ধরনের বিপর্যয়ের ক্ষয়ক্ষতি নির্ভর করে বহু বিষয়ের উপর— হিমবাহের আকার, ভাঙনের সময় এবং সে সময় এলাকায় মানুষের উপস্থিতি। স্থানীয় ভূপ্রকৃতি, এমনকি পারমাফ্রস্টের অবক্ষয়ের মতো বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। তিনি স্বীকার করেছেন, এ বিষয়গুলি নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা ও পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে অবকাঠামো ও জনবলের অভাব কাজের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ, জলসম্পদ মন্ত্রক, ভূবিজ্ঞান মন্ত্রক এবং আইআইএসসি-এর বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি বৈঠকে বসেছেন। সেখানে উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলগুলিকে ‘রেগুলেটেড জোন’ হিসেবে চিহ্নিত করে উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে, হিমালয়ের ‘ক্রায়োস্ফিয়ার’ পরিবর্তনের সামগ্রিক প্রভাব বোঝার জন্য একটি বিস্তৃত ‘ক্রায়োস্ফিয়ার চেঞ্জ ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট রিপোর্ট’ তৈরির কথাও উঠে এসেছে। সব মিলিয়ে, হিমালয়ের বুকের এই নীরব কিন্তু ক্রমবর্ধমান বিপদ যে আর উপেক্ষা করার মতো নয়, তা স্পষ্ট। এখন দেখার, সতর্কবার্তা শোনার পর, সময় থাকতে সরকার কত দ্রুত এবং কতটা কার্যকর ব্যবস্থা নেয়।
❤ Support Us







