Advertisement
  • দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
  • জুন ১০, ২০২৬

নবান্নে মন্ত্রিসভার দফতর বণ্টন চূড়ান্ত: অর্থে স্বপন, স্বাস্থ্যে শারদ্বত, তালিকায় বহু চমক

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
নবান্নে মন্ত্রিসভার দফতর বণ্টন চূড়ান্ত: অর্থে স্বপন, স্বাস্থ্যে শারদ্বত, তালিকায় বহু চমক

দীর্ঘ জল্পনা, দফায় দফায় বৈঠক এবং রাজনৈতিক মহলের নানা জল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে চূড়ান্ত হয়েছে রাজ্যের নবগঠিত বিজেপি সরকারের মন্ত্রিসভার দফতর বণ্টন । নবান্ন সূত্রের খবর, শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত চলা ম্যারাথন বৈঠকের পর বিভিন্ন মন্ত্রীর দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে । বুধবার নবান্ন থেকে এ-সংক্রান্ত সরকারি বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে ।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর স্বরাষ্ট্র দফতর নিজের হাতেই রাখছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী । রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, পুলিশ প্রশাসন, গোয়েন্দা তৎপরতা এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের নিয়ন্ত্রণ তাঁর হাতেই থাকবে । শুধু স্বরাষ্ট্র নয়, আইন ও বিচার, বিদ্যুৎ এবং ভূমি ও ভূমিরাজস্ব দফতরের দায়িত্বও তাঁর কাছেই থাকছে বলে সূত্রের দাবি । নতুন সরকারের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ও নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এই ৪টি দফতরকে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে । বিজেপির দাবি, নতুন সরকারের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ সুসংহত রাখতেই এমন দফতর বণ্টনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী ।

প্রথম দিকে জোর জল্পনা ছিল অর্থ দফতরও মুখ্যমন্ত্রীর হাতেই থাকতে পারে । কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে সম্ভাবনায় ইতি টেনে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে বিজেপির প্রবীণ নেতা, প্রাবন্ধিক ও প্রাক্তন সাংসদ স্বপন দাশগুপ্তকে । দলের একাংশের মতে, অর্থনীতি, নীতি নির্ধারণ এবং কেন্দ্রীয় প্রশাসনের সঙ্গে দীর্ঘদিনের যোগাযোগের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতেই তাঁকে এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে । রাজ্যের আর্থিক পুনর্গঠন, বিনিয়োগ আকর্ষণ, রাজস্ব বৃদ্ধি এবং কেন্দ্র-রাজ্য আর্থিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে স্বপনের ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে বলে মনে করছে প্রশাসনিক মহল ।

অন্য দিকে শিল্প ও বাণিজ্য দফতরের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে বর্ষীয়ান রাজনীতিক তথা মানিকতলার বিধায়ক তাপস রায়কে । সাম্প্রতিক নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর থেকেই তাঁর মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাওয়ার জল্পনা ছিল । শেষ পর্যন্ত সে জল্পনাই সত্যি হলো । শিল্পের পাশাপাশি অচিরাচরিত শক্তি বা নবীকরণযোগ্য শক্তি সংক্রান্ত দায়িত্বও তাঁর হাতে যেতে পারে বলে সূত্রের খবর । রাজনৈতিক মহলের মতে, দীর্ঘ প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন তাপসকে সামনে রেখে শিল্পায়নের ক্ষেত্রে এক নতুন বার্তা দিতে চাইছে সরকার ।

তবে দফতর বণ্টনের তালিকায় সবচেয়ে বেশি আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে শিক্ষা বিভাগ । দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষা দফতর এককভাবে পরিচালিত হলেও নতুন সরকার সে কাঠামোয় পরিবর্তন আনছে । সিদ্ধান্ত হয়েছে, শিক্ষা বিভাগকে আবার একাধিক ভাগে ভাগ করা হবে । উচ্চশিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে সিউড়ির বিধায়ক জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়কে । অন্য দিকে স্কুলশিক্ষা দফতরের দায়িত্ব পাচ্ছেন বিজেপির উত্তরবঙ্গের নেতা তথা প্রাক্তন রাজ্য সাধারণ সম্পাদক দীপক বর্মন । বিজেপি এবং আরএসএসের শীর্ষ নেতৃত্বের একাংশের মতে, গত কয়েক দশকে রাজ্যের শিক্ষাক্ষেত্রে যে আদর্শগত ও প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে উঠেছে, সেখানে মৌলিক পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে ।

প্রসঙ্গত, একসময় শোনা যাচ্ছিল উচ্চশিক্ষা দফতর স্বপন দাশগুপ্তের হাতে যেতে পারে । এমনকি শিলিগুড়ির বিধায়ক শঙ্কর ঘোষ এবং খড়দহের বিধায়ক কল্যাণ চক্রবর্তীর সঙ্গে শিক্ষা দফতরের কর্তাদের বৈঠক নিয়েও জল্পনা তৈরি হয়েছিল । কিন্তু শেষ পর্যন্ত শিক্ষা বিভাগের দায়িত্ব জগন্নাথ ও দীপকের হাতেই তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে । জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় ও দীপক বর্মণ—দু’জনেই আরএসএসের স্বয়ংসেবক হিসেবে পরিচিত । ফলে শিক্ষা সংস্কারের ক্ষেত্রে তাঁদের উপর বিশেষ আস্থা রেখেছে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব।

রাজ্যের স্বাস্থ্য দফতরের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে পেশায় চিকিৎসক ডা. শারদ্বত মুখোপাধ্যায়কে । বুধবার নিউ টাউনে মুখ্যমন্ত্রী নিজেই তাঁর নাম ঘোষণা করেন । করোনা-পরবর্তী সময়ে স্বাস্থ্য পরিষেবা পুনর্গঠন, চিকিৎসা পরিকাঠামোর উন্নয়ন এবং সরকারি হাসপাতালগুলির আধুনিকীকরণের মতো গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ তাঁর সামনে রয়েছে ।

পরিবহণ ও শ্রম— এই দুই গুরুত্বপূর্ণ গণমুখী দফতরের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে নোয়াপাড়ার বিধায়ক এবং বারাকপুরের প্রাক্তন সাংসদ অর্জুন সিংকে । শিল্পাঞ্চল, শ্রমিক রাজনীতি এবং সংগঠনের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক থাকার কারণেই তাঁকে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে । বিজেপির আদি এবং হেভিওয়েট নেতা হিসেবে পরিচিত ময়ূরেশ্বরের বিধায়ক দুধকুমার মণ্ডলের হাতে যাচ্ছে কৃষি দফতরের দায়িত্ব । কৃষি উৎপাদন, কৃষক কল্যাণ এবং গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়ন সংক্রান্ত বিষয়গুলিতে তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে হবে । উত্তরবঙ্গকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে শিলিগুড়ির বিধায়ক শঙ্কর ঘোষকে পর্যটন দফতরের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে । উত্তরবঙ্গের পর্যটন শিল্পকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনার সঙ্গেই এ সিদ্ধান্তের যোগ রয়েছে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। মনোজ ওরাওঁ পাচ্ছেন বন ও পরিবেশ দফতরের দায়িত্ব ।

নতুন মন্ত্রিসভায় ক্রীড়া ও যুবকল্যাণ দফতরের দায়িত্ব পাচ্ছেন বিজেপি যুব মোর্চার রাজ্য সভাপতি ইন্দ্রনীল খাঁ । প্রথম দিকে এই দফতর নিশীথ প্রামাণিকের হাতে যেতে পারে বলে আলোচনা থাকলেও পরে সিদ্ধান্ত বদল হয়েছে বলে সূত্রের খবর । পাশাপাশি ক্রেতা সুরক্ষা দফতরের দায়িত্বও ইন্দ্রনীলের হাতে যেতে পারে । তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে পূর্ণিমা চক্রবর্তীকে। নারী ও শিশু কল্যাণ দফতরের দায়িত্ব পাচ্ছেন মালতি রাভা রায় ।

৯ মে ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উপস্থিতিতে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন শুভেন্দু অধিকারী । তাঁর সঙ্গে মন্ত্রিত্বের শপথ নেন দিলীপ ঘোষ, অগ্নিমিত্রা পাল, অশোক কীর্তনিয়া, ক্ষুদিরাম টুডু এবং নিশীথ প্রামাণিক । পরে ১ জুন লোক ভবনে আরও ৩৫ জন বিধায়ক মন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন । সে থেকেই মন্ত্রিসভার দফতর বণ্টন নিয়ে জল্পনা শুরু হয়েছিল । দিলীপ ঘোষ পান পঞ্চায়েত, কৃষি বিপণন এবং প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন দফতর। অগ্নিমিত্রা পাল পাচ্ছেন পুর ও নগরোন্নয়ন এবং নারী, শিশু ও সমাজকল্যাণ দফতর। খাদ্য ও সরবরাহ দফতরের দায়িত্ব যায় অশোক কীর্তনিয়ার হাতে । আদিবাসী উন্নয়ন দফতরের দায়িত্ব পান ক্ষুদিরাম টুডু ।

বিজেপি সূত্রের দাবি, রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য, কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব, বিজেপির সাংগঠনিক দায়িত্বপ্রাপ্ত পর্যবেক্ষক সুনীল বনসল এবং আরএসএসের সঙ্গে সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা অরুণ কুমারের মতামত নেওয়ার পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে । শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সঙ্গে আলোচনা করেই দফতর বণ্টনের তালিকায় সিলমোহর দেওয়া হয়েছে বলে দলীয় সূত্রের দাবি ।

১ জুন লোকভবনে শপথ নেওয়া মন্ত্রিসভার বাকি ৩৫ সদস্যের দফতর বণ্টন নিয়েও গত কয়েকদিন ধরে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের মধ্যে বিস্তর আলোচনা চলে । রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য, দলের রাজ্য পর্যবেক্ষক সুনীল বনসল এবং বিজেপি-আরএসএস সমন্বয়ের গুরুত্বপূর্ণ মুখ অরুণ কুমারের মতামত নেওয়া হয় । সেই সমস্ত আলোচনা ও পরামর্শের ভিত্তিতে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে সমন্বয় করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!