- এই মুহূর্তে দে । শ
- জুন ১০, ২০২৬
নেহরুর রেকর্ড ভেঙে, দেশের দীর্ঘতম প্রধানমন্ত্রীর কুরসিতে মোদি । অভিনন্দন-বার্তা বিশ্বনেতাদের, কটাক্ষ কংগ্রেসের
স্বাধীন ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন মাইলফলক। টানা ৪,৩৯৯ দিন প্রধানমন্ত্রীর পদে থেকে দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর রেকর্ড ভেঙে, বুধবার ভারতের দীর্ঘতম মেয়াদি নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী আসনে বলীয়ান নরেন্দ্র মোদি। ১৯৫২ সালের প্রথম সাধারণ নির্বাচনের পরে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নেহরু টানা ৪,৩৯৮ দিন দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সে রেকর্ড এক দিন পেরিয়ে গেল মোদির।
কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে এ অর্জনকে শুধু একটি ব্যক্তিগত রাজনৈতিক সাফল্য নয়, বরং বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রে জনগণের ধারাবাহিক আস্থার প্রতিফলন হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। সরকারের বক্তব্য, ১৪০ কোটিরও বেশি মানুষের দেশ, যেখানে ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্ম ও ভৌগোলিক বৈচিত্র্য অভূতপূর্ব, সে দেশের শাসনভার একটানা ১২ বছর ধরে দায়িত্ব সামলানো এক অভূতপূর্ব ঘটনা। যখন বিশ্বের বহু দেশে সরকার পরিবর্তন, রাজনৈতিক অস্থিরতা আর নীতিগত অনিশ্চয়তা দেখা গিয়েছে, তখন ভারতে নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা বজায় থেকেছে। পরপর ৩টি জাতীয় নির্বাচনে জনগণের সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় ফিরে আসার ঘটনাকে সে কারণেই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে পদ্মশিবির।
২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে কেন্দ্রের ক্ষমতায় আসে বিজেপি নেতৃত্বাধীন ‘এনডিএ’। নির্বাচনে বিপুল জয় পাবার পর, ২৬ মে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন নরেন্দ্র মোদি। ২০১৯ সালে আরও বিপুল জনাদেশ নিয়ে দ্বিতীয় বার ক্ষমতায় ফিরে আসেন তিনি। ওই বছরের ৩০ মে শুরু হয় তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদ। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর ৯ জুন তৃতীয় বারের জন্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন নরেন্দ্র মোদি। সেই ধারাবাহিকতার ফলেই বুধবার তিনি ৪,৩৯৯ দিনের মাইলফলকে পৌঁছলেন।
বিজেপির দাবি, মোদির নেতৃত্বাধীন দীর্ঘ এ সময়ে দেশের অর্থনীতি, পরিকাঠামো, প্রযুক্তি এবং সামাজিক কল্যাণের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটেছে। ২৫ কোটি দেশবাসী দারিদ্র্যের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে এসেছেন। একই সঙ্গে দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে ডিজিটাল পরিকাঠামো। আধার, ডিজিটাল পেমেন্ট, সরাসরি সুবিধা হস্তান্তর ব্যবস্থা, গ্রামীণ ও শহুরে পরিকাঠামো উন্নয়ন, একাধিক কল্যাণমূলক প্রকল্প এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে সরকারি পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে ভারত বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল বৃহৎ অর্থনীতির মর্যাদা ধরে রেখেছে। বিশ্বের একাধিক প্রধান অর্থনীতির সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে দেশ। আন্তর্জাতিক মঞ্চে উন্নয়ন, প্রযুক্তি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর স্বার্থরক্ষার প্রশ্নে ভারতের ভূমিকা আরও জোরালো হয়েছে বলেও দাবি পদ্ম-নেতাদের। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সমীক্ষায় প্রধানমন্ত্রী মোদিকে বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় গণতান্ত্রিক নেতা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি তিনি ৩০টিরও বেশি দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মানে ভূষিত হয়েছেন।
নরেন্দ্র মোদির রাজনৈতিক জীবনের আর একটি দিকও এ দিন বিশেষ ভাবে তুলে ধরা হয়েছে শাসক শিবিরের তরফে। রাজনৈতিক বংশপরম্পরার বাইরে, সাধারণ সামাজিক ও অর্থনৈতিক পটভূমি থেকে উঠে এসে দেশের সর্বোচ্চ নির্বাচিত পদে পৌঁছনোর ঘটনাকে ভারতীয় গণতন্ত্রের শক্তির প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। বিজেপি নেতাদের মতে, ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সামাজিক গতিশীলতা এবং সুযোগের পরিসরই মোদীর উত্থানের অন্যতম ভিত্তি। বুধবার, ঐতিহাসিক দিনটিকে ঘিরে রাজধানী দিল্লিতে জাতীয় গণতান্ত্রিক জোটের একটি বিশেষ বৈঠকের আয়োজন করা হয়। সরকার গঠনের ১২ বছর পূর্তি এবং প্রধানমন্ত্রী মোদির নতুন রেকর্ড; এই দুই উপলক্ষকে সামনে রেখে আয়োজিত বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন এনডিএ-র শরিক দলগুলির নেতারা ও বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব।
ভারত মণ্ডপমে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে এনডিএ-শাসিত ২২টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মুখ্যমন্ত্রী ও উপমুখ্যমন্ত্রীরা যোগ দেন। সূত্রের খবর, প্রায় ৩৫টি শরিক দলের প্রতিনিধিত্বকারী ৭৫ জনেরও বেশি শীর্ষ নেতা, যার মধ্যে মুখ্যমন্ত্রী, উপমুখ্যমন্ত্রী, দলীয় সভাপতি এবং গুরুত্বপূর্ণ সংগঠকরা ছিলেন, ওই বৈঠকে অংশ নেন। বিজেপি সভাপতি নীতিন নবীনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন রাজনাথ সিং, অমিত শাহ, নীতিন গডকরি, জে পি নাড্ডা, শিবরাজ সিং চৌহানের মতো কেন্দ্রীয় নেতারা। সূত্রের খবর, বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানিয়ে বিশেষ প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। শরিক দলগুলির নেতাদের উদ্দেশে মোদি ভাষণও দিতে পারেন বলে জানা গিয়েছে।
বুধবার কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভাও প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানিয়ে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে। মন্ত্রিসভার সদস্যরা তাঁকে দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানান। এ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী নিজেও সামাজিক মাধ্যমে একটি বার্তা প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি লেখেন, ‘জনসেবা হলো সুশাসনের সবচেয়ে বড়ো পরীক্ষা। যে ব্যক্তি বিনয়, নিষ্ঠা আর কর্তব্যবোধ নিয়ে নিরন্তর কাজ করে চলেন, তিনিই জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারেন।’ মোদির এই অর্জনকে ঘিরে শাসক জোটের নেতাদের শুভেচ্ছাবার্তার ঢল নেমেছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেন, মোদীর নেতৃত্বে গত ১২ বছর ভারতের আত্মমর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ এবং ঔপনিবেশিক মানসিকতার অবসানের সময় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী শুধু বিভিন্ন প্রকল্প বা কর্মসূচি দেননি, তিনি দেশকে একটি সুস্পষ্ট লক্ষ্য, বৃহত্তর দৃষ্টিভঙ্গি আর আত্মবিশ্বাসে ভরপুর জাতীয় সংকল্পও উপহার দিয়েছেন। প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং প্রধানমন্ত্রীকে ‘অবিরাম কর্মযোগী’ আখ্যা দিয়ে বলেন, ‘নেশন ফার্স্ট’ নীতিতে পরিচালিত তাঁর শাসনকাল দেশের অগ্রগতি, মানুষের কল্যাণ এবং জাতীয় স্বার্থরক্ষার প্রতি অবিচল দায়বদ্ধতার প্রতীক। প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ মোদি শাসনকালকে দেশের জন্য এক ‘যুগান্তকারী পর্ব’ বলে বর্ণনা করেছেন। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান, মনসুখ মাণ্ডব্য, দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তাও প্রধানমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।
দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও প্রধানমন্ত্রী মোদির এ সাফল্য আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম বলেছেন, ভারতের উন্নয়ন, সমৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক মর্যাদা বৃদ্ধিতে মোদির অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভারত ও মালয়েশিয়ার দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আগামী দিনে আরও গভীর হবে। অস্ট্রেলিয়ার প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন অভিনন্দন জানিয়ে বলেছেন, নরেন্দ্র মোদি ভারতের অর্থনীতি, বিশ্বের দরবারে ভারতের অবস্থান আমূল বদলে দিয়েছেন। নাইজেরিয়ার রাষ্ট্রপতি বোলা আহমেদ টিনুবুর মতে, পরপর ৩টি নির্বাচনে জনগণের সমর্থনই প্রমাণ করে ভারতের মানুষ মোদির নেতৃত্বের উপর কতটা আস্থা রেখেছেন।
কেনিয়ার রাষ্ট্রপতি উইলিয়াম রুটো বলেন, সাধারণ পটভূমি থেকে উঠে এসে দেশের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পদে পৌঁছনোর এ যাত্রা অধ্যবসায়, জনসেবা আর নেতৃত্বের এক অনন্য উদাহরণ। মালদ্বীপের রাষ্ট্রপতি ইব্রাহিম মহম্মদ সোলিহ, শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রপতি অনুরা কুমারা দিসানায়েকে, পাপুয়া নিউ গিনির প্রধানমন্ত্রী জেমস মারাপে, ত্রিনিদাদ ও টোবাগোর প্রধানমন্ত্রী কমলা প্রসাদ-বিসেসারও প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। আমেরিকার রাজনৈতিক মহল থেকেও এসেছে শুভেচ্ছা। টেক্সাসের রিপাবলিকান সিনেটর জন কর্নিন, টেনেসির রিপাবলিকান সিনেটর বিল হ্যাগার্টিও প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানিয়েছেন।
তবে এ উদ্যাপনের আবহেই তীব্র রাজনৈতিক বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে। কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা জয়রাম রমেশ প্রধানমন্ত্রী মোদির নতুন রেকর্ডকে ‘স্বঘোষিত’ এবং ‘সন্দেহজনক’ মাইলফলক বলে কটাক্ষ করেছেন। তাঁর অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী দেশের অগ্রগতির মাইলফলক নন, বরং দেশের অগ্রগতির পথে বাধা হয়ে উঠেছেন। জয়রাম দাবি করেছেন, মোদি জমানায় গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলির উপর চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে, দেশের রাজনৈতিক পরিসরে একাধিক উদ্বেগজনক প্রবণতা দেখা গিয়েছে। একই সঙ্গে তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, জওহরলাল নেহেরু যখন স্বাধীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন, সর্দার বল্লভভাই পাটেল, বাবাসাহেব আম্বেদকর, ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ, সি রাজাগোপালাচারী এবং মৌলানা আবুল কালাম আজাদের মতো নেতাদের সঙ্গে নিয়েই দেশের ভিত্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তাঁর বক্তব্য, শুধুমাত্র দিনের হিসাব দিয়ে সে ঐতিহাসিক অবদানকে বিচার করা যায় না।
❤ Support Us






