- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- এপ্রিল ২২, ২০২৬
‘এনআইএ আইন’ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রীয় পরিকাঠামোর প্রশ্নে সুপ্রিম নোটিস, কেন্দ্রকে জবাবদিহির নির্দেশ
কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থার ক্ষমতা বনাম রাজ্যের সাংবিধানিক অধিকার— পুরনো বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করল সুপ্রিম কোর্ট। ২০০৮ সালের ‘ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি আইন’-কে চ্যালেঞ্জ করে দায়ের হওয়া এক জনস্বার্থ মামলায় কেন্দ্র সরকার, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক, এনআইএ-সহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলির কাছে নোটিস জারি করেছে শীর্ষ আদালত। আদালতের পর্যবেক্ষণ, উত্থাপিত প্রশ্নগুলি ‘সমগ্র দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’, ফলে বিষয়টির গভীর বিচার প্রয়োজন।
বিচারপতি বিক্রম নাথ ও সন্দীপ মেহতার বেঞ্চ মঙ্গলবার মামলাটি শুনে কেন্দ্রকে চার সপ্তাহের মধ্যে হলফনামা জমা দেওয়ার নির্দেশ দেয়। সেই সঙ্গে আবেদনকারীকে আরও ২ সপ্তাহ সময় দেওয়া হয়েছে পাল্টা জবাব দাখিলের জন্য। মামলাটি পরবর্তী শুনানির জন্য তালিকাভুক্ত হয়েছে আগামী ১৪ জুলাই। এই আইনি লড়াইয়ের সূচনা কেরলার এক আইনজীবী, মোহাম্মদ মুবারক আলির আবেদনে। তিনি নিজেও এনআইএ-র একটি মামলার অভিযুক্ত, যেখানে ‘পপুলার ফ্রন্ট অফ ইন্ডিয়া’-এর তথাকথিত বেআইনি কার্যকলাপের তদন্ত চলছে। আবেদনকারীর অভিযোগ, এনআইএ তাঁর এবং অন্যদের বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারা ও বেআইনি কার্যকলাপ প্রতিরোধ আইন–এর বিধান প্রয়োগ করেছে, যা আইনসঙ্গত নয় এবং ক্ষমতার অপব্যবহার।
ঘটনার সূত্র ২০২২ সালের এপ্রিল মাস। কেরলার বিজেপি নেতা শ্রীনিবাসনের হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নেমে এনআইএ মামলা রুজু করে। অভিযোগ, ওই খুনটি ঘটেছিল আগের দিন পিএফআই সদস্য সুবায়ের হত্যার প্রতিশোধ হিসেবে। ওই মামলায় ভারতীয় দণ্ডবিধির ১২০বি (ষড়যন্ত্র), ১৫৩এ (সম্প্রীতি নষ্টের চেষ্টা) সহ একাধিক ধারা, ইউএপিএ-র ১৩, ১৮, ১৮এ, ১৮বি, ২০ ও ২৩ নম্বর ধারা, এবং অস্ত্র আইনের ২৫(১)(এ) ধারা প্রয়োগ করা হয়। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের নির্দেশেই এনআইএ এ মামলা গ্রহণ করে। অন্যদিকে, একই হত্যাকাণ্ড নিয়ে কেরলা পুলিশের পক্ষ থেকেও একটি পৃথক মামলা দায়ের হয়েছিল। রাজ্য পুলিশের তদন্তে ২০২২ সালের জুলাই মাসে ৪৩ জন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে চার্জশিট পেশ করা হয়। পরে, চার্জশিটে আরও কয়েকজনের নাম যুক্ত হয়। কিন্তু মামলার প্রাথমিক বিচারপর্ব চলাকালীন কেন্দ্রীয় সরকার ‘এনআইএ আইন’-এর ৬(৫) ও ৮ নম্বর ধারার ক্ষমতা প্রয়োগ করে তদন্তভার নিজেদের হাতে তুলে নেয়। পরবর্তীতে ২০২৩ সালে এনআইএ তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে এবং কেরলা হাইকোর্ট মামলাটি এনআইএ আদালতে স্থানান্তরিত করে।
এতেই আবেদনকারীর আপত্তি। তাঁর প্রশ্ন, রাজ্য পুলিশের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও চার্জশিট থাকা সত্ত্বেও এনআইএ-র হস্তক্ষেপ রাজ্যের তদন্ত প্রক্রিয়াকে কার্যত নিষ্প্রভ করে দিয়েছে। তাঁর দাবি, রাজ্য পুলিশের রিপোর্টে কোনো ‘তফসিলভুক্ত অপরাধ’-এর উল্লেখ ছিল না, অথচ এনআইএ সেই যুক্তিতেই মামলাটি নিজেদের আওতায় নিয়ে আসে ২ পৃথক মামলাকে একত্রিত করে। আবেদনকারীর মূল যুক্তি সাংবিধানিক কাঠামো ঘিরে। তাঁর বক্তব্য, সংবিধানের সপ্তম তফসিলের রাজ্য তালিকার ২ নম্বর প্রবেশিকায় ‘পুলিশ’ বিষয়টি স্পষ্টভাবে রাজ্যের এক্তিয়ারভুক্ত। ফলে সংসদের এ বিষয়ে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা নেই। ‘এনআইএ আইন’ সীমা লঙ্ঘন করেছে এবং কেন্দ্রীয় সংস্থাকে এমন ক্ষমতা দিয়েছে, যা কার্যত একটি ‘জাতীয় পুলিশ বাহিনী’র সমতুল্য। তিনি দাবি করেন, সংবিধান প্রণেতাদের উদ্দেশ্য কখনওই ছিল না যে, কেন্দ্র সরাসরি রাজ্যের পুলিশি কাজে হস্তক্ষেপ করবে।
আবেদনকারীর পক্ষের আইনজীবী সিদ্ধার্থ দাভে এদিন শীর্ষ আদালতে সওয়াল করতে গিয়ে এই বিষয়টিই জোর দিয়ে তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য, ‘কেন্দ্রীয় কোনো সংস্থারই প্রকৃত অর্থে ‘পুলিশ’ ক্ষমতা নেই। একমাত্র নারকোটিক্স কন্ট্রোল ব্যুরো কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম, সেটিও সুপ্রিম কোর্টের ‘তোফান সিংহ’ মামলার রায়ের নিরিখে। কিন্তু ‘এনআইএ আইন’ সংস্থাটিকে পূর্ণ পুলিশি ক্ষমতা দিয়েছে, যা সাংবিধানিক সীমার বাইরে।’ তিনি এনআইএ আইনের ৩ নম্বর ধারা (সংস্থার গঠন) এবং ৬(৫) নম্বর ধারার উল্লেখ করে বলেন, ধারাগুলি কেন্দ্রকে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তদন্তের নির্দেশ দেওয়ার সুযোগ দেয়, যার ফলে রাজ্যের তদন্তের অধিকার সম্পূর্ণভাবে খর্ব হয়। আইনজীবী আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তুলনা টানেন অর্থ পাচার প্রতিরোধ আইন–এর সঙ্গে। তাঁর বক্তব্য, এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট–কেও কখনও ‘পুলিশ’ হিসেবে গণ্য করা হয় না। সেখানে সংসদ এমনভাবে আইন প্রণয়ন করেছে যাতে তদন্তের ক্ষমতা থাকলেও ‘পুলিশি’ মর্যাদা না দেওয়া হয়। কিন্তু ‘এনআইএ আইন’-এর ক্ষেত্রে এ সীমাবদ্ধতা নেই।
শুনানির সময় বেঞ্চও একাধিক তীক্ষ্ণ প্রশ্ন তোলে। আদালতের প্রশ্ন, ‘পুলিশ স্টেশন হিসেবে ঘোষিত না হয়েও এনআইএ কীভাবে এফআইআর দায়ের করে?’ একই সঙ্গে কেন্দ্রের আইনজীবীকে নির্দেশ দেওয়া হয়, এনআইএ-র স্বতঃপ্রণোদিতভাবে এফআইআর নথিভুক্ত করার ক্ষমতা নিয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে। আবেদনপত্রে এনআইএ আইনের একাধিক ধারাকে ‘স্বেচ্ছাচারী’ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশেষত, ৬ থেকে ১০ নম্বর ধারার বিরুদ্ধে অভিযোগ, এগুলি কোনো নির্দিষ্ট নীতিমালা বা নির্দেশিকা ছাড়াই অসীম ক্ষমতা প্রদান করে, যা সংবিধানের ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদের সমতার অধিকারের পরিপন্থী। একই সঙ্গে ২০ ও ২১ নম্বর অনুচ্ছেদে সুরক্ষিত ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকারের লঙ্ঘনের অভিযোগও তোলা হয়েছে। ‘পিথ অ্যান্ড সাবস্ট্যান্স’ নীতির আলোকে আবেদনকারী দাবি করেছেন, এ আইন আসলে ক্ষমতার অপব্যবহার — যেখানে আড়ালে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধন করা হচ্ছে। শীর্ষ আদালতে ‘এনআইএ আইন বাতিল’ করবার আবেদন জানিয়েছেন মামলাকারী ব্যক্তি। যদি একান্তই তা না করা যায়, বিকল্প হিসেবে তিনি আদালতের কাছে আবেদন করেছেন, আইনটি যদি বহাল রাখা হয়, তবে অন্তত ৬(৫) এবং সংশ্লিষ্ট ধারাগুলির প্রয়োগে স্পষ্ট নিয়ম ও নির্দেশিকা প্রণয়ন করতে কেন্দ্রকে নির্দেশ দেওয়া হোক।
প্রসঙ্গত, ২০০৮ সালের মুম্বই জঙ্গি হামলার পর দেশজুড়ে সন্ত্রাসবিরোধী তদন্তকে কেন্দ্রীভূত ও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে ‘এনআইএ আইন’ প্রণয়ন করা হয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আইনের পরিধি বৃদ্ধি এবং প্রয়োগের ধরন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহলে। ২০২০ সালে ছত্তিশগড় সরকারও এ আইনের সাংবিধানিক বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে মামলা দায়ের করেছিল। পাশাপাশি ২০১৯ সালের সংশোধনীর বিরুদ্ধেও একাধিক আবেদন এখনও বিচারাধীন। ফলে, সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ কেন্দ্র–রাজ্য সম্পর্কের সূক্ষ্ম ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিল। আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, এ মামলার রায় শুধু এনআইএ আইনের ভবিষ্যৎই নির্ধারণ করবে না, বরং ভারতের ফেডারেল কাঠামোয় কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলির ক্ষমতার সীমারেখাও স্পষ্ট করে দিতে পারে।
❤ Support Us







