- এই মুহূর্তে দে । শ
- এপ্রিল ২৩, ২০২৬
তামিলনাড়ুতে ত্রিমুখী লড়াই, স্ট্যালিন বনাম পলানিস্বামীতে ফ্যাক্টর বিজয়ের দল? সকাল ১১ টা পর্যন্ত রেকর্ড ভোটদান
তামিলনাড়ুর রাজনীতির মাটিতে এবারের ভোট শুধু ক্ষমতার পালাবদলের লড়াই নয়, বরং রাজনৈতিক সমীকরণের বড়োসড়ো রদবদলের ইঙ্গিত। ৫.৭৩ কোটিরও বেশি ভোটার, ৪,০২৩ জন প্রার্থী এবং ২৩৪টি আসন, বিপুল এ আয়োজনে বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই শুরু হয়েছে ভোটগ্রহণ। সকাল ১১ টা পর্যন্ত প্রায় ৩৮ শতাংশ ভোট পড়েছে। আর সেই ভোটে স্পষ্ট, বহুদিনের দ্বিমুখী লড়াই ভেঙে এ বার জমেছে ত্রিমুখী সংঘাত। ডিএমকে এবং এআইএডিএমকে, দুই দ্রাবিড় শক্তির দাপটে অভ্যস্ত এ রাজ্যে এ বার স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে তৃতীয় শক্তির উত্থান, অভিনেতা বিজয়ের তামিলগা ভেট্রি কাঝাগম (টিভিকে)।
সকাল ৭টা থেকে ভোটগ্রহণ শুরু হওয়ার পর থেকেই রাজ্যের নানা প্রান্তে ভোটারদের উৎসাহ ছিল চোখে পড়ার মতো। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, সকাল ১১টা পর্যন্ত মোট ভোট পড়েছে ৩৭.৫৬ শতাংশ। জেলার হিসাবে ছবিটা আরও স্পষ্ট। নামাক্কল এগিয়ে ৪৫.৮৭ শতাংশ ভোট নিয়ে, তার পরে তিরুপ্পুরে ৪২.৪৫ শতাংশ এবং ইরোডে ৪১ শতাংশ। সেলমে ৪০.৫৬ শতাংশ, করুরে ৩৯.৭০, কোয়েম্বাটুরে ৩৮.৬২ শতাংশ। তিরুচিরাপল্লি, ধর্মপুরী, রানিপেট এবং তিরুভারুরে ভোটের হার ৩৭ থেকে ৩৮ শতাংশের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে। তুলনায় কিছুটা পিছিয়ে রাজধানী চেন্নাই, যেখানে সকাল পর্যন্ত ভোট পড়েছে ৩৫.৪৭ শতাংশ।
এদিন, ভোরের আলো ফোটার আগেই বুথের সামনে লাইনে দাঁড়াতে দেখা যায় বহু মানুষকে। প্রথম দিকেই ভোট দিয়ে উদাহরণ স্থাপন করেন মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিন, তাঁর ছেলে, উপমুখ্যমন্ত্রী উদয়নিধি স্ট্যালিন এবং এআইএডিএমকে নেতা এডাপ্পাড়ি কে পলানিস্বামী। চেন্নাইয়ের এসআইইটি কলেজে স্ত্রী দুর্গা স্ট্যালিনকে সঙ্গে নিয়ে ভোট দেন মুখ্যমন্ত্রী। বুথ থেকে বেরিয়ে তাঁর বার্তা—‘তামিল জিতবে।’ দীর্ঘদিন ধরেই তিনি এই নির্বাচনকে ‘তামিলনাড়ু বনাম দিল্লি’ হিসেবে ব্যাখ্যা করে আসছেন, সে প্রেক্ষিতেই তাঁর এই মন্তব্যকে দেখা হচ্ছে। একইসঙ্গে তিনি সকল ভোটারকে গণতান্ত্রিক দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান। রাজনীতির পাশাপাশি এই নির্বাচনে তারকাদের উপস্থিতিও ছিল লক্ষণীয়। রাজিনীকান্ত, কমল হাসান, অজিত কুমার, শরৎকুমার, রাধিকা শরৎকুমার, ধনুষ, শিবকার্তিকেয়ন-সহ একাধিক তারকা সকাল সকালই ভোট দিয়েছেন। একইসঙ্গে ভোট দেন বিজয়, টি টি ভি দিনাকরণ, অনবুমণি রামদাস এবং প্রেমলতা বিজয়কান্তও।
ডিএমকে নেতৃত্বাধীন ‘সেক্যুলার প্রগ্রেসিভ অ্যালায়েন্স’, যার সঙ্গে রয়েছে কংগ্রেস, বাম দল এবং ভিসিকে, তারা ক্ষমতা ধরে রাখার লড়াইয়ে নেমেছে নিজেদের উন্নয়ন এবং কল্যাণমূলক প্রকল্পের সাফল্যকে হাতিয়ার করে। অন্যদিকে এআইএডিএমকে, বিজেপি, পিএমকে এবং অন্যান্য শরিকদের নিয়ে গঠিত এনডিএ জোট জোর দিচ্ছে সরকারবিরোধী মনোভাবকে একত্রিত করার উপর। তবে এই দুই শিবিরের মাঝখানেই উঠে এসেছে টিভিকে। এই নির্বাচনের তাৎপর্য বোঝার জন্য ফিরে দেখতে হয় অতীত। ২০১১ সালের নির্বাচনে রেকর্ড ৭৮.০১ শতাংশ ভোট পড়েছিল, যা এখনও পর্যন্ত সর্বোচ্চ। পরবর্তী নির্বাচনগুলিতে সেই মাত্রা আর ছোঁয়া যায়নি। ২০১৬ সালে ভোট পড়ে ৭৪.৮১ শতাংশ, ২০২১-এ তা আরও কমে ৭৩.৬৩ শতাংশে নেমে আসে। অথচ স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে, ১৯৫২ সালে ভোটের হার ছিল মাত্র ৫২.১ শতাংশ। ১৯৬৭ সালে প্রথমবার ৭৫ শতাংশের গণ্ডি পেরিয়ে দ্রাবিড় রাজনীতির উত্থান ঘটে। সেই ঐতিহাসিক ধারার মধ্যে দাঁড়িয়ে এ বার প্রায় ১৪.৬ লক্ষ নতুন ভোটারের অংশগ্রহণ কি নতুন রেকর্ড গড়তে পারে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
মাঠপর্যায়ে গিয়ে দেখা যাচ্ছে, তিরুচির মতো কেন্দ্রগুলিতে এই ত্রিমুখী লড়াই সবচেয়ে স্পষ্ট। দীর্ঘদিনের ডিএমকে ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই অঞ্চলে বিজয়ের প্রার্থিতা নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। যুব ও মহিলা ভোটারদের মধ্যে টিভিকে-র আকর্ষণ বাড়লেও সংগঠনের অভাব নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। ডিএমকে প্রার্থী ইনিগো ইরুদয়ারাজ তাঁর শক্তিশালী বুথভিত্তিক সংগঠনের উপর ভরসা রাখছেন, বিশেষ করে সংখ্যালঘু ভোটারদের মধ্যে। আর এই পরিস্থিতিতে ভোট বিভাজনের সম্ভাবনা দেখছে এআইএডিএমকে, যা তাদের জন্য বাড়তি সুবিধা এনে দিতে পারে। তবে, এবারের তামিলভূমের নির্বাচনে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক এসেছে জোট রাজনীতির ভিতরে। ছোটো দলগুলি বডড়ো দলের প্রতীকে লড়ছে, তামিলনাড়ুতে এ প্রবণতা নতুন নয়, কিন্তু ক্রমশ তা বাধ্যতামূলক হয়ে উঠছে বলে অভিযোগ। ২০২৬ সালের নির্বাচনে ১৫টি ছোটো দল ২৪টি আসনে বড়ো দলের প্রতীক ব্যবহার করছে। এতে জয়ের সম্ভাবনা বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদে তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয় ক্ষুণ্ণ হচ্ছে, এমনই মত অনেকের।
ডিএমকে নেতৃত্ব অবশ্য যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী। দলের শীর্ষ নেতা এ রাজা দাবি করেছেন, এই ভোটের হারই প্রমাণ করছে মানুষের মধ্যে ‘দ্রাবিড় মডেল’-এর প্রতি আস্থা রয়েছে এবং তাঁদের জোট ২০০-র বেশি আসন পাবে। একই সুর শোনা গিয়েছে উদয়নিধি স্ট্যালিনের গলাতেও, যিনি ভোট দিয়ে বেরিয়ে জয়ের ব্যাপারে নিজের দৃঢ় বিশ্বাসের কথা জানিয়েছেন। তবে সব ছবি এতটা মসৃণ নয়। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ভোটকেন্দ্রগুলিতে এখনও অবকাঠামোগত সমস্যার অভিযোগ উঠছে, বিশেষ করে প্রতিবন্ধী ভোটারদের ক্ষেত্রে। র্যাম্পের অভাব, হ্যান্ডরেল না থাকা, সংকীর্ণ করিডর, অপ্রতুল শৌচালয়— এসব কারণে অনেক ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে ভোটদান সম্ভব হচ্ছে না। যদিও নির্বাচন কর্তৃপক্ষ আগেই ‘অ্যাসিউরড মিনিমাম ফ্যাসিলিটিজ’-এর দাবি করেছিল, বাস্তবে তার প্রয়োগ সর্বত্র সমান নয়।
অন্যদিকে, পুদুক্কোট্টাই জেলার ভেঙ্গাইভায়াল গ্রামে দেখা গেল সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। গ্রামবাসীরা কালো পতাকা তুলে ভোট বয়কট করেছেন। তাঁদের অভিযোগ, কোনও রাজনৈতিক দলই তাঁদের সমস্যার কথা শোনেনি বা প্রচারে আসেনি। ফলে তারা এই নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে নিজেদের সরিয়ে রেখেছেন এবং ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়েছেন। সব মিলিয়ে, তামিলনাড়ুর ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন এক যুগান্তকারী মোড়ে দাঁড়িয়ে। বহু বছরের দ্বিমুখী রাজনৈতিক লড়াই এ বার স্পষ্টভাবে ত্রিমুখী সংঘর্ষে পরিণত হয়েছে। ডিএমকে তাদের শাসনকালের সাফল্যের উপর নির্ভর করছে, এআইএডিএমকে ভরসা রাখছে বিরোধী ভোটের সংহতির উপর, আর টিভিকে চেষ্টা করছে নতুন প্রজন্মের সমর্থনকে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত করতে। হয়তো এই নতুন দল সরাসরি ক্ষমতায় আসবে না, কিন্তু তাদের উপস্থিতি যে নির্বাচনের ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা নেবে, সে বিষয়ে আর কোনও সংশয় নেই।
❤ Support Us






