Advertisement
  • দে । শ
  • মে ৩০, ২০২৬

মরুভূমির বুকে ‘পারমাণবিক নগরী’! পরমাণু অস্ত্রভাণ্ডার সুরক্ষায় নজিরবিহীন প্রস্তুতি চিনের, উপগ্রহচিত্রে ধরা পড়ল ছবি

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
মরুভূমির বুকে ‘পারমাণবিক নগরী’! পরমাণু অস্ত্রভাণ্ডার সুরক্ষায় নজিরবিহীন প্রস্তুতি চিনের, উপগ্রহচিত্রে ধরা পড়ল ছবি

বিস্তীর্ণ জনমানবশূন্য মরুভূমি। যত দূর চোখ যায়, বালির সমুদ্র। আর সেই ধু-ধু মরুভূমির বুক চিরে ভেসে উঠেছে এক অদ্ভুত জ্যামিতিক নকশা। উপর থেকে দেখলে অনেকটা বিশালাকার অষ্টভুজের মতো। চারপাশে ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য কংক্রিটের প্ল্যাটফর্ম, বাঙ্কার, সড়কপথ, রেললাইন এবং সামরিক স্থাপনা। প্রথম দর্শনে বিষয়টি কোনও স্থাপত্য প্রকল্প বলে মনে হলেও,  সাম্প্রতিক উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণ করে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের একাংশ বলছেন, এগুলি নিছক সামরিক ঘাঁটি নয়, পারমাণবিক প্রতিরোধ ক্ষমতাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ। আর সে কারণেই চিনের নতুন সামরিক পরিকাঠামো ঘিরে বিশ্বজুড়ে শুরু হয়েছে জোর চর্চা।

উপগ্রহচিত্রে দেখা গিয়েছে, শিনজিয়াংয়ের হামি অঞ্চলের পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র সাইলো ক্ষেত্রের আশপাশে গত কয়েক বছরে নজিরবিহীন হারে সামরিক নির্মাণকাজ হয়েছে। অন্তত ৮০টিরও বেশি কংক্রিটের উৎক্ষেপণ কেন্দ্র বা লঞ্চ প্যাড গড়ে উঠেছে সেখানে। পাশাপাশি নির্মিত হয়েছে একাধিক সুরক্ষিত বাঙ্কার, বিমানঘাঁটি, অস্ত্রভাণ্ডার, রেল সংযোগ এবং সামরিক যোগাযোগ অবকাঠামো। তবে সবচেয়ে বেশি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে মরুভূমির মধ্যে গড়ে ওঠা বিশাল অষ্টভুজাকৃতি সামরিক কমপ্লেক্সগুলি। গত ৬ বছরে পূর্ব শিনজিয়াংয়ে এমন অন্তত ২টি বৃহৎ স্থাপনা নির্মিত হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। এর একটি হামি সাইলো ক্ষেত্র থেকে প্রায় ১৪০ কিলোমিটার দূরে এবং অন্যটি প্রায় ২৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। আরও একটি অনুরূপ স্থাপনার সন্ধান মিলেছে ঐতিহাসিক লোপ নুর পারমাণবিক পরীক্ষাকেন্দ্রের কাছে। যদিও বিশেষজ্ঞদের একাংশের ধারণা, সেটি সম্ভবত প্রশিক্ষণ ও মহড়ার কাজে ব্যবহৃত হয়।

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এই অষ্টভুজাকৃতি স্থাপনাগুলি শুধুমাত্র ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের জন্য তৈরি হয়নি। এগুলি একটি পূর্ণাঙ্গ সামরিক নেটওয়ার্কের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করতে পারে। এখানে কমান্ড-অ্যান্ড-কন্ট্রোল সেন্টার, স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার বা প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধ পরিচালনার অবকাঠামো, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং সুরক্ষিত অস্ত্রভাণ্ডার থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। উপগ্রহচিত্রে ধরা পড়েছে বিশাল টাওয়ার, স্যাটেলাইট ডিশ, ভূগর্ভস্থ বাঙ্কার এবং যোগাযোগ পরিকাঠামোও। বিশেষজ্ঞদের মতে, চিনের এ প্রকল্পের আসল উদ্দেশ্য ‘সেকেন্ড স্ট্রাইক ক্যাপাবিলিটি’ বা দ্বিতীয় প্রত্যাঘাতের ক্ষমতা রক্ষা করা। অর্থাৎ, যদি কোনো প্রতিপক্ষ প্রথমে পারমাণবিক হামলা চালায় এবং চিনের একাংশের অস্ত্রভাণ্ডার ধ্বংস করে দেয়, তবুও যাতে বেজিং পাল্টা ভয়াবহ আঘাত হানতে পারে, সে সক্ষমতা নিশ্চিত করাই এই নির্মাণকাজের অন্যতম লক্ষ্য।

চিনের হাতে ইতিমধ্যেই ডিএফ-৪১-সহ এমন একাধিক আন্তর্মহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, যেগুলি আমেরিকার যে কোনো শহরে পৌঁছতে সক্ষম। ফলে সেই ক্ষেপণাস্ত্রগুলিকে নিরাপদ রাখা এবং শত্রুর প্রথম হামলার পরেও সেগুলিকে কার্যকর অবস্থায় রাখার জন্য একটি বহুস্তরীয় প্রতিরক্ষা বলয় গড়ে তুলতে চাইছে বেজিং। নতুন নির্মিত লঞ্চ প্যাডগুলি মোবাইল ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ যান, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিংবা অন্যান্য কৌশলগত সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েনের কাজে ব্যবহার করা হতে পারে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

হাওয়াই-ভিত্তিক প্যাসিফিক ফোরাম থিঙ্ক ট্যাঙ্কের নিরাপত্তা বিশ্লেষক আলেকজান্ডার নিলের মতে, মরুভূমির হাজার হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই নির্মাণকাজ চিনের কৌশলগত প্রতিরোধ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে এক বিশাল পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করছে। তাঁর বক্তব্য, এত বড়ো পরিসরে, এত বিস্তৃত অঞ্চলে এবং এত বহুমাত্রিক সামরিক পরিকাঠামো একসঙ্গে গড়ে তোলার ঘটনা অত্যন্ত বিরল। আরও তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছেন বিশ্বের অন্যতম পরিচিত পারমাণবিক অস্ত্র বিশ্লেষক হ্যান্স ক্রিস্টেনসেন। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন পরমাণু শক্তিধর দেশের অস্ত্রভাণ্ডার নিয়ে গবেষণা করা এই বিশেষজ্ঞের জানান, ‘এ ধরনের কিছু আমি আগে কখনো দেখিনি। এ এক অসাধারণ প্রচেষ্টা।’

উপগ্রহচিত্রে দেখা গিয়েছে, অষ্টভুজাকৃতি কমপ্লেক্সগুলির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিস্তৃত সড়ক ও রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা। একাধিক বিমানঘাঁটি, জ্বালানি সংরক্ষণ কেন্দ্র এবং ভূগর্ভস্থ সুরক্ষিত বাঙ্কারও তৈরি হয়েছে। কিছু এলাকায় সামরিক যান চলাচলের স্পষ্ট চিহ্ন দেখা গিয়েছে। গত এপ্রিল এবং মে মাসে উত্তরাঞ্চলের একটি অক্টাগন কমপ্লেক্স ঘিরে সামরিক মহড়ারও প্রমাণ মিলেছে। সেখানে বৃহৎ তাঁবু, সামরিক যান এবং সম্ভাব্য বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার উপস্থিতি ধরা পড়েছে উপগ্রহচিত্রে। যদিও এখনো স্পষ্ট নয় যে, এই নতুন উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলিতে ঠিক কী ধরনের অস্ত্র মোতায়েন করা হবে। চলমান ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, মোবাইল লঞ্চার না কি উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, এ বিষয়ে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি বেজিং।

উল্লেখ্য, চিন দীর্ঘদিন ধরেই ‘নো ফার্স্ট ইউজ’ বা ‘আগে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার না করার’ নীতির কথা বলে আসছে। তাদের দাবি, কোনো দেশ আগে পারমাণবিক হামলা না চালালে চিনও কখনো সে পথে হাঁটবে না। কিন্তু একই সময়ে দেশটির দ্রুত পারমাণবিক আধুনিকীকরণ কর্মসূচি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। সম্প্রতি মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের এক মূল্যায়নে দাবি করা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় এক হাজার পারমাণবিক ওয়ারহেডের মালিক হতে পারে চিন। পাশাপাশি নিজেদের আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থাও দ্রুত শক্তিশালী করছে তারা। পেন্টাগনের দাবি, চিনের ‘হুওইয়ান-১’ উপগ্রহ নেটওয়ার্ক উৎক্ষেপণের মাত্র ৯০ সেকেন্ডের মধ্যেই আন্তর্মহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করতে সক্ষম এবং কয়েক মিনিটের মধ্যেই সতর্কবার্তা পাঠাতে পারে।

চিনের নয়া পরিকাঠামো নির্মাণের সময়টিও তাৎপর্যপূর্ণ। তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে চিন ও আমেরিকার মধ্যে ক্রমবর্ধমান টানাপড়েন, দক্ষিণ চিন সাগরে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সামরিক অবস্থান শক্ত করার লড়াইয়ের মধ্যেই সামনে এসেছে এই উপগ্রহচিত্র। সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংও সতর্ক করে বলেছেন, তাইওয়ান প্রশ্নে দু–দেশের মতপার্থক্য ভুলভাবে পরিচালিত হলে তা বিপজ্জনক পরিস্থিতির জন্ম দিতে পারে। কূটনৈতিক মহলের একাংশের মতে, মরুভূমির মধ্যে গড়ে ওঠা এই অষ্টভুজাকৃতি সামরিক নগরী ভবিষ্যতের সম্ভাব্য সংঘাতের কথা মাথায় রেখে চিনের পারমাণবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী, ছড়ানো এবং টেকসই করে তোলার বৃহত্তর পরিকল্পনার প্রতিফলন।

আর সে কারণেই শিনজিয়াংয়ের নির্জন বালুকাভূমিতে গড়ে ওঠা এই রহস্যময় ‘অক্টাগন নেটওয়ার্ক’ এখন বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম আলোচিত সামরিক প্রকল্প। যদিও এই নির্মাণকাজ নিয়ে এ পর্যন্ত কোনও মন্তব্য করেনি চিনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রক। নীরব রয়েছে পেন্টাগনও। তবে বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, মরুভূমির বুকের অষ্টভুজগুলি ইতিমধ্যেই স্পষ্ট করে দিয়েছে, আগামী দশকের কৌশলগত শক্তির ভারসাম্যের লড়াইয়ে নিজেদের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করতেই এগোচ্ছে ড্রাগনের দেশ।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!