- বি। দে । শ
- মে ৩০, ২০২৬
সংসদ থেকে সর্বোচ্চ শিখরে! এভারেস্ট জয় করে ইতিহাস গড়লেন নেপালের সাংসদ মিংমা শেরপা
নেপালের সংসদ থেকে সরাসরি বিশ্বের সর্বোচ্চ শিখরে। রাজনীতি ও পর্বতারোহণ— দু–টি ভিন্নমেরুর জগৎকে এক সুতোয় গেঁথে দিলেন নেপালের সাংসদ মিংমা ডেভিড শেরপা। মাউন্ট এভারেস্টের শিখরে পৌঁছে নতুন নজির গড়লেন তিনি। বিশ্বের ছাদেওড়ালেন নেপালের ফেডারেল পার্লামেন্টের লোগো-সংবলিত পতাকা। নেপাল ও হিমালয়ের সম্পর্কের প্রতীকী বার্তা পৌঁছে দিলেন আন্তর্জাতিক মহলে।
নেপালের রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি)-র সাংসদ মিংমা গ্যাবু শেরপা, যিনি পর্বতারোহণ মহলে ‘মিংমা ডেভিড’ নামেই অধিক পরিচিত, তাঁর এ অভিযানের নাম দিয়েছিলেন— ‘সদান দেখি সামিট সম্মা’, অর্থাৎ ‘সংসদ থেকে শিখর পর্যন্ত’। অভিযানের নবম দিনেই সাফল্যের সঙ্গে সাগরমাথা জয় করেন তিনি। একই দিন সন্ধ্যার মধ্যেই বেস ক্যাম্পে ফিরে আসেন, যা অভিজ্ঞ পর্বতারোহীদের কাছেও বিস্ময়ের বিষয়। এভারেস্ট ক্রনিকল-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেরপা জানান, আগের দিন প্রবল ঝোড়ো হাওয়ার কারণে প্রায় ৮,৫০০ মিটার উচ্চতা থেকে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন। কিন্তু দ্বিতীয় প্রচেষ্টায় আবহাওয়া অনুকূলে আসতেই ভোরে শিখরে পৌঁছে যান। শিখরে দীর্ঘক্ষণ অবস্থান না করে দ্রুত নেমে আসেন। সকাল ৫টা ৪০ মিনিটে শিখরে ওঠার পর দুপুর ১টার আগেই বেস ক্যাম্পে পৌঁছে যান তিনি। অর্থাৎ তাঁর অবতরণের জন্য সময় লেগেছে ৭ ঘণ্টারও কম। চলতি মরসুমে এ ধরনের দ্রুত প্রত্যাবর্তন বিরল বলেই মনে করছেন অভিযাত্রী মহল।
তবে এ সাফল্যকে ব্যক্তিগত রেকর্ডের খাতায় সীমাবদ্ধ রাখতে চাননি শেরপা। তাঁর মতে, ‘এই অভিযানের মাধ্যমে আমি জলবায়ু পরিবর্তনের বিপদ, হিমালয়ের গুরুত্ব এবং নেপালের অর্থনীতিতে পর্যটনের কেন্দ্রীয় ভূমিকাকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে চেয়েছি।’ পর্বতারোহণের পাশাপাশি শ্রমজীবী বাহকদের জীবনযাত্রার উন্নয়নের বিষয়েও সরব তিনি। এভারেস্ট থেকে ফিরে সরাসরি লোবুচেতে একটি নতুন ‘পোর্টার হাউস’-এর উদ্বোধনে যাওয়ার কথা ছিল তাঁর। ৫,০৩০ মিটার উচ্চতায় নির্মিত ওই আশ্রয়কেন্দ্রটি প্রায় একশো নেপালি বাহকের থাকার ব্যবস্থা করবে। নিমসদাই ফাউন্ডেশনের সহায়তায় তৈরি ওই প্রকল্পকে নেপালের পর্বত-পর্যটন শিল্পে এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। যদিও খারাপ আবহাওয়ার কারণে হেলিকপ্টার উড়তে না পারায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পৌঁছতে পারেননি তিনি।
মিংমার সাফল্যের পিছনে রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। ২০০৭ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় ছাত্রাবস্থায় কাঠমান্ডুতে আটকে পড়ে জীবিকার তাগিদে বাহকের কাজ শুরু করেছিলেন তিনি। দু–বছর পরে মানাসলু বেস ক্যাম্পে রান্নাঘরের সহকারী হিসেবে কাজ করার সময়ই স্বপ্ন দেখেন একদিন নিজেই পর্বতারোহী হবেন। সে স্বপ্নই পরবর্তীকালে তাঁকে বিশ্বের অন্যতম সেরা উচ্চতর পর্বতারোহীর আসনে বসিয়েছে। মাত্র ৩৭ বছর বয়সে তিনি ইতিমধ্যেই বিশ্বের ১৪টি আট-হাজারি শৃঙ্গ জয় সম্পূর্ণ করেছেন। দীর্ঘদিন বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ আরোহী হিসেবে এ কৃতিত্বের রেকর্ডও ছিল তাঁর দখলে। এখনো পর্যন্ত ৩৫ বার আট-হাজারের বেশি উচ্চতার শৃঙ্গে আরোহণ করেছেন তিনি। তার মধ্যে রয়েছে এভারেস্টে ৯ বার এবং কে-টু-তে ৬ বার সাফল্য।
২০২১ সালের ১৬ জানুয়ারি নেপালের যে দশ সদস্যের দল প্রথম বার শীতকালে কে-টু জয় করে ইতিহাস গড়েছিল, মিংমা ছিলেন ওই অভিযানের অন্যতম সদস্য। ২০১৯ সালের বহুচর্চিত ‘প্রজেক্ট পসিবল’ অভিযানে তিনি এক বছরে ৯ বার উচ্চতম শৃঙ্গ জয় করে আন্তর্জাতিক মহলেও বিশেষ পরিচিতি পান। পর্বতারোহণে সাফল্যের পাশাপাশি সাম্প্রতিক বছরগুলিতে রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। গত সাধারণ নির্বাচনে জনজাতি আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরে নেপাল মাউন্টেনিয়ারিং অ্যাসোসিয়েশনের প্রথম সহ-সভাপতির দায়িত্বও সামলেছেন। বিখ্যাত পর্বতারোহী নির্মল ‘নিমসদাই’ পুরজার সঙ্গে যৌথভাবে ‘এলিট এক্সপেড’ সংস্থার প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম তিনি।
সংসদের শিখর জয়ের খবর প্রকাশ হতেই শুভেচ্ছার বন্যা বয়ে যায় সামাজিক মাধ্যমে। মার্কিন কিংবদন্তি পর্বতারোহী কনরাড অ্যাঙ্কার ইনস্টাগ্রামে লেখেন, ‘সর্বদা অবিচল, সর্বদা দৃঢ়, চিরকাল বিনয়ী।’ নেপালের সংসদীয় ইতিহাসে সম্ভবত এই প্রথম কোনো সাংসদ বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গে সংসদের পতাকা উত্তোলন করলেন। সে অর্থে মিংমা ডেভিড শেরপার এভারেস্ট অভিযান শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের কাহিনি নয়, বরং হিমালয়, গণতন্ত্র, জাতীয় পরিচয় আর নেপালের আত্মমর্যাদার প্রতীকী অভিযাত্রা হয়ে রইল।
❤ Support Us








