Advertisement
  • বি। দে । শ
  • জুলাই ২৮, ২০২৬

ইসলামাবাদ-বিরোধী আন্দোলনের মাঝে পাক-অধিকৃত কাশ্মীরে রক্তাক্ত ভোট! সেনার গুলিতে নিহত ২০, জখম বহু  

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
ইসলামাবাদ-বিরোধী আন্দোলনের মাঝে পাক-অধিকৃত কাশ্মীরে রক্তাক্ত ভোট! সেনার গুলিতে নিহত ২০, জখম বহু  

পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরে (পিওকে) আইনসভা নির্বাচন ঘিরে অশান্তি ক্রমশ বিস্ফোরক আকার নিচ্ছে। এক দিকে ভোট বয়কটকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভকারীদের উপর পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে অন্তত ২০ জন নিহত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে, অন্যদিকে প্রথম দফার ভোটের ফল প্রকাশের পরেই ভোট কারচুপির অভিযোগ তুলেছে পাকিস্তানের ক্ষমতাসীন জোটের অন্যতম শরিক দল ‘পাকিস্তান পিপলস পার্টি’ (পিপিপি)। ফলে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানের প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা এবং পিওকে-র রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

বিক্ষোভকারী সংগঠন ‘জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটি’ (জেএএসি)-র অভিযোগ, গত ২৪ ঘণ্টায় রাওয়ালাকোটের ড্রেক এইথ এলাকায় পাকিস্তানি সেনা ও নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে অন্তত ২০ জন নিহত এবং ৫০ জনেরও বেশি আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে সংগঠনের দাবি। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন জেএএসি-র কোর কমিটির সদস্য ও মুখপাত্র উমর নাজির কাশ্মীরির ভাই উসমান নাজিরও। তবে হতাহতের সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন দাবি করেছে পিওকে প্রশাসন। বিবিসি উর্দুর প্রতিবেদন অনুযায়ী, পিওকে-র পুলিশ প্রধান ক্যাপ্টেন (অব.) লিয়াকত আলি মালিক জানিয়েছেন, সরকারি বা বেসরকারি কোনো হাসপাতালেই এত সংখ্যক মৃতদেহ আনা হয়নি। তাই ‘জেএএসি’-র দাবি প্রশাসনের পক্ষে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তাঁর দাবি, সংঘর্ষে দুই পুলিশকর্মী আহত হয়েছেন এবং তাঁদের রাওয়ালপিন্ডির কম্বাইন্ড মিলিটারি হাসপাতালে চিকিৎসা চলছে।

অন্যদিকে, ‘জেএএসি’-র বক্তব্য, নিরাপত্তা বাহিনী কোনোরকম উসকানি ছাড়াই শান্তিপূর্ণ মিছিলে গুলি চালায়। সংগঠনের কোর কমিটির সদস্য আবিদ শাহিনের দাবি, রাওয়ালাকোট থেকে মুজাফফরাবাদের উদ্দেশে শান্তিপূর্ণ পদযাত্রা চলাকালীন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নির্বিচারে গুলি চালায়। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, আন্দোলন কোনো অবস্থাতেই থামবে না এবং মিছিল মুজাফফরাবাদ পৌঁছবেই। সংগঠনের সরকারি বিবৃতিতে প্রথমে ১৪ জনের মৃত্যুর দাবি করা হলেও পরে ‘জেএএসি’ তাদের এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেলে জানায়, নিহতের সংখ্যা অন্তত ২০ এবং তাঁদের মধ্যে ১৯ জনের পরিচয়ও শনাক্ত করা হয়েছে। সংগঠনের আরও দাবি, নিহতদের দেহ ড্রেক এলাকার একটি অস্থায়ী চিকিৎসা শিবিরে রাখা হয়েছে। যদিও বিবিসি উর্দু জানিয়েছে, এই দাবিগুলির কোনওটিই স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

স্থানীয় সূত্র এবং একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, রাওয়ালাকোটের বিভিন্ন এলাকায় রাস্তায় মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখা গিয়েছে। কয়েকটি ভিডিওতেও সে দৃশ্য ধরা পড়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। পিওকে-র সমাজমাধ্যমের পরিচিত মুখরা অভিযোগ করেছেন, রাওয়ালাকোট মৃতদেহে ভরে গিয়েছে। আহতের সংখ্যা এত বেশি যে মৃতদেহ বহন করতে করতে মানুষের কাঁধ ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আমাদের পাশে দাঁড়াক। ‘জেএএসি’-র অভিযোগ, নির্বাচন বয়কটের ডাক দেওয়ার পর থেকেই পাকিস্তান প্রশাসন ব্যাপক দমননীতি শুরু করে। ভোটের দিন পাকিস্তানি সেনা, রেঞ্জার্স এবং নিরাপত্তা বাহিনী জোর করে সাধারণ মানুষকে বাড়ি থেকে তুলে এনে ভোটকেন্দ্রে নিয়ে গিয়ে ভোট দিতে বাধ্য করেছে বলেও সংগঠনের অভিযোগ। এ ঘটনার প্রতিবাদে সোমবার রাওয়ালাকোটে বিশাল বিক্ষোভ শুরু হয়। সেই বিক্ষোভেই নিরাপত্তা বাহিনী গুলি চালায় বলে দাবি আন্দোলনকারীদের।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের একাধিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, নির্বাচনের বিরোধিতা করা বিক্ষোভকারীদের উপর গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়েছিল ইসলামাবাদ। পাশাপাশি ১৪ হাজারেরও বেশি নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন, একাধিক জায়গায় স্নাইপার বসানো, দীর্ঘপাল্লার কাঁদানে গ্যাসের ব্যবহার, ইন্টারনেট ও মোবাইল পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া এবং বহু এলাকায় বিদ্যুৎ ও জল সরবরাহ বিচ্ছিন্ন করার অভিযোগও উঠেছে পাকিস্তানি প্রশাসনের বিরুদ্ধে। এরই মধ্যে মঙ্গলবার প্রকাশিত হয়েছে আইনসভা নির্বাচনের প্রথম দফায় ভোট হওয়া ১৩টি আসনের ফলাফল। সেখানে সে দেশের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের দল ‘পাকিস্তান মুসলিম লিগ’ (নওয়াজ) বা ‘পিএমএল-এন’ ৯টি এবং তাদের শরিক ‘পাকিস্তান পিপলস পার্টি’ (পিপিপি) ৪টি আসনে জয়ী হয়েছে।

কিন্তু ফল প্রকাশের পরই বিস্ফোরক অভিযোগ করেছেন ‘পিপিপি’ নেতা নইয়ার বুখারি। তাঁর অভিযোগ, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সহায়তায় ‘পিএমএল’-এন নির্বাচনে কারচুপি করেছে। তিনি দাবি করেন, ভোটগণনার সময় ‘পিএমএল’-এন সমর্থিত দুষ্কৃতীরা ‘পিপিপি’-র এক কর্মীকে খুন করেছে। ফলে ক্ষমতাসীন জোটের শরিক দলের তরফেই নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় গোটা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে।  পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরের ৫৩ সদস্যের আইনসভার মধ্যে ৪৫টি আসনে সরাসরি নির্বাচন হচ্ছে। ভোট তিন দফায়—২৭ জুলাই, ২ আগস্ট এবং ১০ আগস্ট। প্রথম দফায় মিরপুর বিভাগের ১৩টি আসনে ভোটগ্রহণ হয়েছে। দ্বিতীয় দফায় মুজাফফরাবাদ বিভাগ এবং সমস্ত শরণার্থী আসনে ২ আগস্ট ভোট হবে। তৃতীয় দফায় ১০ আগস্ট পুঞ্চ বিভাগের ১১টি আসনে ভোটগ্রহণ নির্ধারিত রয়েছে।

করাচিভিত্তিক সংবাদপত্র ‘ডন-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্বাচন উপলক্ষে অন্তত ১৮ হাজার নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। পুলিশ, রেঞ্জার্স এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনী যৌথভাবে নিরাপত্তার দায়িত্ব সামলাচ্ছে। পাকিস্তানের নির্বাচন কমিশনের দাবি, সামগ্রিকভাবে ভোট শান্তিপূর্ণ হলেও মিরপুরে বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। সেখানে ভোট কারচুপির অভিযোগকে কেন্দ্র করে ‘পিপিপি’ ও ‘পিএমএল-এন’ সমর্থকদের সংঘর্ষে এক ‘পিপিপি’ কর্মীর মৃত্যু হয়েছে। মিরপুর-১ কেন্দ্রে ভোটদানের হার ছিল মাত্র ২৭ শতাংশ। এই অস্থিরতার মূলেই রয়েছে আইনসভার ১২টি সংরক্ষিত আসন। ‘জেএএসি’-র অভিযোগ, এই আসনগুলির মাধ্যমেই ইসলামাবাদ পিওকে-র রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে। ৫৩ সদস্যের আইনসভার মধ্যে ১২টি আসন জম্মু ও কাশ্মীর থেকে পাকিস্তানে চলে যাওয়া উদ্বাস্তুদের জন্য সংরক্ষিত। এর মধ্যে ছয়টি কাশ্মীর উপত্যকা এবং ছয়টি জম্মু অঞ্চলের উদ্বাস্তুদের জন্য। এই প্রতিনিধিরা পিওকে-র বাসিন্দা নন; পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাস করেন। ফলে এই আসনগুলির নির্বাচনও পিওকে-র বাইরে অনুষ্ঠিত হয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংরক্ষিত আসনগুলি পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের কাশ্মীর নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ইসলামাবাদ আন্তর্জাতিক মহলে দেখাতে চায় যে জম্মু ও কাশ্মীর প্রশ্নের এখনো সমাধান হয়নি। কিন্তু ‘জেএএসি’-র অভিযোগ, এই আসনগুলির মাধ্যমে সাজানো নির্বাচনে জয়ী প্রতিনিধিদের ব্যবহার করে পিওকে-র নির্বাচিত সরকারের উপর প্রভাব বিস্তার করে ইসলামাবাদ। এ কারণেই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান দাবি, ১২টি সংরক্ষিত আসন সম্পূর্ণ তুলে দিতে হবে এবং পিওকে-র সমস্ত আসনে কেবলমাত্র সেখানকার স্থায়ী বাসিন্দারাই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন। আন্দোলনের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ‘জেএএসি’ সম্প্রতি পাকিস্তান-সমর্থিত জঙ্গি কার্যকলাপের বিরুদ্ধেও সরব হয়েছে। সংগঠনের নেতা সর্দার আমান খান অভিযোগ করেছেন, পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী স্থানান্তরিত কাশ্মীরিদের একটি অংশকে ব্যবহার করে জম্মু ও কাশ্মীরে জঙ্গি কার্যকলাপ এবং অস্ত্র পাচার চালিয়ে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে পাকিস্তানি নির্যাতন থেকে পিওকে-র বাসিন্দাদের রক্ষায় দিল্লির হস্তক্ষেপও চেয়েছেন তিনি।

প্রসঙ্গত, বর্তমান আন্দোলনের সূত্রপাত হয় গত ৯ জুন। ৩৮ দফা দাবিকে সামনে রেখে ‘জেএএসি’ আন্দোলনের নতুন পর্যায় শুরু করে। সে দাবির মধ্যে রয়েছে সংরক্ষিত আসন বাতিল, রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করা এবং ইসলামাবাদের হস্তক্ষেপ বন্ধ করা। ‘জেএএসি’-র অভিযোগ, আন্দোলনের নতুন পর্যায় শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত পাকিস্তানি সেনা ও নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে ৬০ জনেরও বেশি বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন বলে খবর। অন্য কিছু আন্তর্জাতিক ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে এই সংখ্যা ৪০ থেকে ৮০-এর মধ্যে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এ পরিসংখ্যানগুলির কোনোটিই স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

এদিকে পিওকে-র নির্বাচন এবং সাম্প্রতিক সংঘর্ষ নিয়ে মঙ্গলবার কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ভারতের বিদেশ মন্ত্রক। মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরে অনুষ্ঠিত তথাকথিত আইনসভা নির্বাচন একটি ‘প্রহসনমূলক নির্বাচন’ ছাড়া কিছু নয়। তাঁর অভিযোগ, এই নির্বাচনের মাধ্যমে পাকিস্তান তার অবৈধ দখলদারিকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করছে এবং ওই অঞ্চলে চলতে থাকা গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনকে আড়াল করতে চাইছে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, পিওকে-তে চলমান গণআন্দোলন অর্থনৈতিক শোষণ, মৌলিক অধিকার হরণ এবং প্রশাসনিক নিপীড়নেরই প্রত্যক্ষ ফল।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!