- দে । শ
- জুন ৩, ২০২৬
‘ওএসএম’ বিতর্কের জেরে সিবিএসই-এর চেয়ারম্যান-সচিব পদে বদল কেন্দ্রের
অন-স্ক্রিন মার্কিং (ওএসএম) ব্যবস্থা নিয়ে বিতর্ক যখন ক্রমশ তীব্র হচ্ছে, ঠিক সে সময়েই সেন্ট্রাল বোর্ড অব সেকেন্ডারি এডুকেশন (সিবিএসই)-এর শীর্ষ নেতৃত্বে বড়োসড়ো রদবদল করল কেন্দ্র। মঙ্গলবার আচমকাই সরিয়ে দেওয়া হল সিবিএসই চেয়ারম্যান রাহুল সিং এবং সচিব হিমাংশু গুপ্তকে। তাঁদের জায়গায় দায়িত্ব পেলেন দুই নতুন আমলা— লোকহান্ডে প্রশান্ত সীতারাম এবং বরুণ ভরদ্বাজ। একই দিনে ‘ওএসএম’ ব্যবস্থা চালুর জন্য পরিষেবা সংগ্রহ ও চুক্তি প্রদান প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটিও গঠন করেছে কেন্দ্র।
শিক্ষামহলের একাংশের মতে, ঘটনাক্রমের সময়কালই অনেক প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে। কারণ, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে সিবিএসই-র নতুন ডিজিটাল মূল্যায়ন ব্যবস্থা নিয়ে দেশজুড়ে ছাত্রছাত্রী, অভিভাবক–শিক্ষকদের একাংশের ক্ষোভ বাড়ছিল। অভিযোগ উঠছিল, স্ক্যান করা উত্তরপত্রে অস্পষ্ট ছবি, অনুপস্থিত পৃষ্ঠা, এমনকি অন্য পরীক্ষার্থীর উত্তরপত্র দেখানোর মতো গুরুতর ত্রুটিও দেখা গিয়েছে। সে বিতর্কের মধ্যেই শীর্ষ কর্তাদের বদলি নিছক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, না কি এর পিছনে আরও গভীর কোনো কারণ রয়েছে, তা নিয়ে জোর জল্পনা শুরু হয়েছে।
কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার নিয়োগ সংক্রান্ত কমিটি (অ্যাপয়েন্টমেন্টস কমিটি অব দ্য ক্যাবিনেট) মঙ্গলবার এই রদবদলের অনুমোদন দেয়। নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পাচ্ছেন ২০০১ ব্যাচের এজিএমইউটি ক্যাডারের আইএএস অফিসার লোকহান্ডে প্রশান্ত সীতারাম। তিনি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অতিরিক্ত সচিব পদে কর্মরত ছিলেন। অন্য দিকে, শিক্ষা মন্ত্রকের ডিরেক্টর পদে থাকা ২০০৮ ব্যাচের ভারতীয় তথ্য পরিষেবা (আইআইএস) অফিসার বরুণ ভরদ্বাজকে সিবিএসই-র নতুন সচিব করা হয়েছে।
বিদায়ী চেয়ারম্যান রাহুল সিংকে কৃষি ও কৃষক কল্যাণ মন্ত্রকের অতিরিক্ত সচিব পদে পাঠানো হয়েছে। তবে সচিব হিমাংশু গুপ্তর ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছে একাংশ। তাঁকে নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই মূল ক্যাডার অর্থাৎ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, তাঁর উপর আরোপ করা হয়েছে ‘এক্সটেন্ডেড কুলিং-অফ’-এর শর্ত। অর্থাৎ ২০৩০ সালের ডিসেম্বরের আগে তিনি আর কোনো কেন্দ্রীয় ডেপুটেশনে আসতে পারবেন না।
এই রদবদলের কয়েক ঘণ্টা আগেই কেন্দ্র সরকার ‘ওএসএম’ প্রকল্পের জন্য পরিষেবা সংগ্রহের প্রক্রিয়া নিয়ে তদন্তের নির্দেশ দেয়। গঠন করা হয় এক সদস্যের তদন্ত কমিটি। কমিটির প্রধান হয়েছেন সক্ষমতা উন্নয়ন কমিশনের চেয়ারপার্সন এস. রাধা চৌহান। তাঁকে এক মাসের মধ্যে রিপোর্ট জমা দিতে বলা হয়েছে। প্রয়োজনে অন্য সরকারি দফতরের সহায়তা নেওয়ার স্বাধীনতাও দেওয়া হয়েছে তাঁকে। মূলত দ্বাদশ শ্রেণির খাতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে এ বছর প্রথমবার সম্পূর্ণ ডিজিটাল অন-স্ক্রিন মার্কিং ব্যবস্থা চালু করেছিল সিবিএসই। প্রচলিত ব্যবস্থার পরিবর্তে পরীক্ষকদের হাতে আর আসেনি আসল উত্তরপত্র। তার পরিবর্তে স্ক্যান করা উত্তরপত্র কম্পিউটার স্ক্রিনে দেখে নম্বর দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। সিবিএসই-র দাবি ছিল, এতে মূল্যায়ন আরও দ্রুত, স্বচ্ছ ও নির্ভুল হবে।
কিন্তু ফল প্রকাশের পর থেকেই সামনে আসতে শুরু করে একের পর এক অভিযোগ। বহু ছাত্রছাত্রী দাবি করেন, তাঁদের যে উত্তরপত্রের স্ক্যান কপি দেখানো হয়েছে, তার অনেক পৃষ্ঠাই ঝাপসা। কোথাও কোথাও পুরো পৃষ্ঠা অনুপস্থিত। কয়েক জনের অভিযোগ, তাঁদের নিজের উত্তরপত্রের পরিবর্তে অন্য কারও খাতা দেখানো হয়েছে। পুনর্মূল্যায়নের জন্য আবেদন করতে গিয়েও বহু পরীক্ষার্থী প্রযুক্তিগত সমস্যার মুখে পড়েন। ‘পেমেন্ট গেটওয়ে’ কাজ না করা, আবেদন জমা না হওয়া-সহ নানা অভিযোগ সামনে আসে। বিতর্ক আরও ঘনীভূত হয় যখন ঝাড়খণ্ডের ১৭ বছরের এক ছাত্র, সার্থক সিদ্ধান্ত, বিষয়টি নিয়ে সংসদের শিক্ষা বিষয়ক স্থায়ী কমিটির দ্বারস্থ হন। দ্বাদশ শ্রেণির এই পরীক্ষার্থী সাত পৃষ্ঠার একটি নোট তৈরি করে সংসদীয় কমিটির সামনে উপস্থাপন করেন। সেখানে তিনি দাবি করেন, অন-স্ক্রিন মূল্যায়নের জন্য ভেন্ডর নির্বাচন প্রক্রিয়ায় একাধিক অসঙ্গতি রয়েছে। কংগ্রেস সাংসদ দিগ্বিজয় সিংয়ের নেতৃত্বাধীন সংসদীয় কমিটির সামনে তিনি বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন।
সূত্রের খবর, সার্থকের উপস্থাপনা সংসদীয় কমিটির সদস্যদের যথেষ্ট প্রভাবিত করে। তাঁর বক্তব্যে আর্থিক যোগ্যতা, টেন্ডারের শর্তপূরণ এবং নির্বাচিত সংস্থার অতীত রেকর্ড নিয়ে একাধিক প্রশ্ন উঠে আসে। অভিযোগ, যে বেসরকারি সংস্থাকে এ কাজ দেওয়া হয়েছে, তারা নিজেদের পূর্ববর্তী বিতর্কিত ইতিহাস যথাযথভাবে প্রকাশ করেনি। বিষয়টি রাজনৈতিক রংও পেতে শুরু করে। লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী সরাসরি কেন্দ্রের বিরুদ্ধে সরব হন। সমাজমাধ্যমে তিনি দাবি করেন, যে সংস্থাকে সিবিএসই ডিজিটাল মূল্যায়নের দায়িত্ব দিয়েছে, সে সংস্থার পূর্বসূরি প্রতিষ্ঠান ২০১৯ সালে তেলঙ্গানার পরীক্ষাব্যবস্থার বিতর্কেও জড়িত ছিল। তাঁর অভিযোগ, অতীত ইতিহাস জানা সত্ত্বেও সংস্থাকেই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। রাহুলের দাবি, ‘নাম বদলেছে, কিন্তু চরিত্র বদলায়নি। সব জেনেও চুক্তি দেওয়া হয়েছে। এটা ভুল নয়, পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র।’
যদিও সিবিএসই এ অভিযোগ সম্পূর্ণ খারিজ করে দিয়েছে। বোর্ডের দাবি, সমস্ত সরকারি আর্থিক বিধি, স্বচ্ছতার নিয়ম মেনেই টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারি ক্রয় পোর্টালে নিয়মমাফিক দরপত্র ডাকা হয়েছিল, যোগ্য সংস্থাকেই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে আরেক বিতর্ক সামনে আসে। সংসদীয় কমিটিকে সিবিএসই জানায়, পুনর্মূল্যায়ন পোর্টালের উপর সংগঠিত সাইবার আক্রমণ চালানো হয়েছিল। বোর্ডের দাবি, মাত্র দু–মিনিটে প্রায় ১৫ লক্ষ ‘হিট’ পাঠিয়ে ‘ডিনায়াল-অব-সার্ভিস’ (ডিওএস) হামলার চেষ্টা করা হয়। পাশাপাশি এক লক্ষেরও বেশি অননুমোদিত ফাইল-অ্যাক্সেসের প্রচেষ্টাও ধরা পড়ে। তবে বোর্ডের দাবি, সমস্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যকর ছিল এবং কোনও তথ্য ফাঁস হয়নি।
সিবিএসই জানিয়েছে, বর্তমানে তাদের ব্যবস্থা একসঙ্গে ৮ হাজারের বেশি ব্যবহারকারীকে পরিষেবা দিতে সক্ষম। মঙ্গলবার বিকেল পর্যন্ত ১৬ হাজারেরও বেশি ছাত্রছাত্রী সফল ভাবে পুনর্মূল্যায়নের আবেদন জমা দিয়েছেন। প্রযুক্তিগত ত্রুটিগুলিও মেরামত করা হয়েছে বলে দাবি বোর্ডের। আবেদন করার সময়সীমা বাড়িয়ে ৬ জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি চালুর ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছিল কি? নির্বাচিত সংস্থার যোগ্যতা যাচাই কতটা কঠোর ভাবে হয়েছিল? ছাত্রছাত্রীদের অভিযোগের মধ্যে কতটা সত্যতা রয়েছে? সিবিএসই-র শীর্ষ নেতৃত্বে আচমকা রদবদল কি শুধুই প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, নাকি বিতর্কের সঙ্গে তার কোনো প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে?
❤ Support Us





