- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- জুন ২৬, ২০২৬
সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত থেকে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি, বিধানসভায় তিন গুরুত্বপূর্ণ বিল আনছে বিজেপি সরকার
রাজ্যে আইন-শৃঙ্খলা আরও কড়া করতে, সমাজবিরোধী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে সোমবার বিধানসভায় তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিল পেশ করতে চলেছে বিজেপি সরকার। এর মধ্যে রয়েছে সমাজবিরোধী কার্যকলাপ দমন, জনশৃঙ্খলা রক্ষা সংক্রান্ত সংশোধনী বিল এবং বহুল আলোচিত অভিন্ন দেওয়ানি বিধি সংক্রান্ত বিল।
সরকারি সূত্রে জানা গিয়েছে, বিধানসভায় ‘পশ্চিমবঙ্গ জন নিরাপত্তা ও সমাজবিরোধী কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ বিল, ২০২৬’ এবং ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল মেনটেনেন্স অফ পাবলিক অর্ডার (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল’ পেশ করা হবে। এই দুটি বিল আইনে পরিণত হলে সমাজবিরোধী কার্যকলাপ, সরকারি বা বেসরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর ও তোলাবাজির মতো অপরাধে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা পাবে প্রশাসন। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, সরকারি বা বেসরকারি সম্পত্তি নষ্ট করার ঘটনায় অভিযুক্তদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে সেই সম্পত্তি থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের আইনি ব্যবস্থা করা যাবে। প্রয়োজনে বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি নিলাম করারও ক্ষমতা থাকবে সরকারের হাতে।
এর আগে মঙ্গলবার বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী কড়া বার্তা দিয়ে জানিয়েছিলেন, অনেকেই মনে করছেন কয়েক মাস জেলে থেকে আইনি লড়াই করে জামিনে বেরিয়ে এলেই সব শেষ। কিন্তু নতুন আইন কার্যকর হলে শুধু গ্রেফতার নয়, অভিযুক্তদের সম্পত্তিও বাজেয়াপ্ত করা হবে। এমনকি সেসব সম্পত্তি নিলামে তুলে প্রাপ্ত অর্থ জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যবহার করা হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। গত বৃহস্পতিবার ‘বিজনেস অ্যাডভাইজরি’ কমিটির বিশেষ বৈঠকে এই দুই বিল বিধানসভায় আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
অন্যদিকে, সোমবারই বিধানসভায় পেশ হতে চলেছে বহুল আলোচিত অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বা ইউসিসসি সংক্রান্ত বিল। বর্তমানে বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের জন্য বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ এবং উত্তরাধিকার সংক্রান্ত পৃথক ব্যক্তিগত আইন কার্যকর রয়েছে। কিন্তু অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু হলে ধর্ম নির্বিশেষে সব নাগরিকের জন্য একই দেওয়ানি আইন কার্যকর হবে। সরকারের মতে ব্যক্তিগত আইনভিত্তিক পৃথক ব্যবস্থার পরিবর্তে বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ, উত্তরাধিকার, দত্তক গ্রহণ এবং লিভ-ইন সম্পর্কের মতো দেওয়ানি বিষয়গুলিকে একক আইনি কাঠামোর আওতায় আনাই এই বিলের মূল লক্ষ্য। সরকারের যুক্তি, এতে আইনের সমতা প্রতিষ্ঠা হবে, নারীর অধিকার আরও সুরক্ষিত হবে এবং নাগরিকদের জন্য অভিন্ন দেওয়ানি কাঠামো গড়ে উঠবে। বিজেপি নেতৃত্বের বক্তব্য, সংবিধানের নির্দেশমূলক নীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই অভিন্ন দেওয়ানি বিধির উল্লেখ রয়েছে। সেই সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতিই বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ।
বিধানসভা ও নবান্ন সূত্রে খবর, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নিজেই বিলটি বিধানসভায় উপস্থাপন করবেন। বিলটি বিধানসভায় পাশ হয়ে পরবর্তী সাংবিধানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে উত্তরাখণ্ড, গুজরাত ও অসমের পরে পশ্চিমবঙ্গও ইউসিসি কার্যকর করা দেশের চতুর্থ রাজ্যে পরিণত হবে। ফলে সোমবারের অধিবেশন ঘিরে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক পারদ চড়তে শুরু করেছে। জানা যাচ্ছে, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় স্পিকার রথীন্দ্র বসুর ডাকা কার্যবিবরণী কমিটির বৈঠকে বিলটি পেশের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। যদিও একই দিনের দুপুরে অনুষ্ঠিত কমিটির প্রথম বৈঠকে প্রশাসনিক ও আইন সংক্রান্ত একাধিক বিলের সময়সূচি নিয়ে আলোচনা হলেও অভিন্ন দেওয়ানি বিধির প্রসঙ্গ ওঠেনি। বিকেলে মুখ্যমন্ত্রী বিধানসভায় পৌঁছনোর পরেই পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়।
সূত্রের দাবি, তাঁর উপস্থিতিতেই চলতি অধিবেশনেই বিলটি আনার বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়। পরে সন্ধ্যার বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, সোমবারের কর্মসূচির দ্বিতীয় ভাগে বিলটি বিধানসভার টেবিলে তোলা হবে। বিধানসভা সূত্রে জানা গিয়েছে, বিলটি নিয়ে প্রায় এক ঘণ্টা আলোচনা নির্ধারিত হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ছাড়াও বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং শাসক-বিরোধী— উভয় পক্ষের একাধিক বিধায়ক আলোচনায় অংশ নেবেন। ফলে বিলটি ঘিরে বিধানসভায় উত্তপ্ত বাদানুবাদের সম্ভাবনা প্রায় নিশ্চিত বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ। রাজ্য প্রশাসনের অন্দরমহলে অবশ্য আর-একটি বিষয় নিয়েও জোর আলোচনা চলছে। সূত্রের খবর, অসমের মতোই পশ্চিমবঙ্গের খসড়াতেও পাহাড় ও জঙ্গলমহলের কয়েকটি বিশেষ জনজাতি সম্প্রদায়ের প্রচলিত রীতি-নীতি এবং সাংবিধানিক সুরক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে কিছু ব্যতিক্রমী বিধান রাখা হতে পারে। যদিও বিলটি বিধানসভায় পেশ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে সরকারিভাবে কিছু জানানো হয়নি। ফলে ঠিক কোন কোন ক্ষেত্রে ছাড় রাখা হচ্ছে, তা নিয়ে জল্পনা অব্যাহত।
সম্প্রতি অসম বিধানসভায় ইউসিসি বিল পাশ হওয়ার সময় মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা দাবি করেছিলেন, এটি কেবল কোনও রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়, সংবিধানের নির্দেশমূলক নীতির বাস্তবায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। অসমের আইনে বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ, উত্তরাধিকার, লিভ-ইন সম্পর্কের নথিভুক্তিকরণ এবং বহুবিবাহ সংক্রান্ত একাধিক বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে সেখানে জনজাতি সম্প্রদায়কে আইনের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে, যাতে তাদের ঐতিহ্যগত সামাজিক কাঠামো অক্ষুণ্ণ থাকে। বিধানসভা নির্বাচনের আগে পশ্চিমবঙ্গে প্রচারে এসে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, বিজেপি সরকার গঠিত হলে ছয় মাসের মধ্যে রাজ্যে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করা হবে। তাঁর বক্তব্য ছিল, দেশের সব নাগরিকের জন্য সমান আইন থাকা উচিত এবং ধর্মের ভিত্তিতে আলাদা দেওয়ানি আইন বজায় রাখা উচিত নয়।
তবে ‘ইউসিসি’ নিয়ে বিরোধিতাও কম নয়। অসমে বিলটি পাশের সময় কংগ্রেস এবং তৃণমূল কংগ্রেস-সহ বিরোধী দলগুলি অভিযোগ করেছিল, ব্যক্তিগত আইন ও ধর্মীয় স্বাধীনতার ক্ষেত্রে সরকার অযথা হস্তক্ষেপ করছে। যদিও শিশুবিবাহ রোধ, নারীর অধিকার সুরক্ষা এবং বহুবিবাহ নিয়ন্ত্রণের মতো কয়েকটি প্রস্তাবকে বিরোধীদের একাংশ সমর্থন জানিয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গেও একই ধরনের বিতর্ক সামনে আসতে পারে বলেই রাজনৈতিক মহলের ধারণা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিধানসভা নির্বাচনের পর নতুন সরকারের এটি হতে পারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পদক্ষেপগুলির একটি। একই সঙ্গে আগামী দিনে রাজ্যের রাজনৈতিক মেরুকরণেও এই বিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। ফলে সোমবারের বিধানসভা অধিবেশন কেবল একটি বিল পেশের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং রাজ্যের রাজনীতি, সমাজ এবং আইন— তিন ক্ষেত্রেই নতুন বিতর্কের সূচনা হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। নজর থাকবে বিলের খুঁটিনাটি বিধান, বিরোধীদের অবস্থান ও শেষ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গ সত্যিই অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকর করার পথে কতটা এগোয়, তার দিকেই।
❤ Support Us





