- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- জুন ২৯, ২০২৬
মেঘভাঙা বৃষ্টি, ভূমিধসে বিধ্বস্ত অরুণাচল, মৃত ৩, নিখোঁজ বহু। রেলের সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বিচ্ছিন্ন অসম, ভারী বৃষ্টির সতর্কতা
এক সপ্তাহেরও কম সময়ের ব্যবধানে ফের ভয়াবহ ‘মেঘ ভাঙা বৃষ্টি’ ও অতিভারী বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত অরুণাচল প্রদেশ ও অসম। লাগাতার বৃষ্টি ও ভূমিধসের জেরে দুই রাজ্যের একাধিক এলাকা প্লাবিত, বহু জায়গায় যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। অসমে ধেমাজি জেলায় নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রেলের একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু। ফলে আর্চিপাথার ও সিমেন চাপরি স্টেশনের মধ্যে ট্রেন চলাচল অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেল (এনএফআর)।
সোমবার, অরুণাচলে উদ্ধার অভিযানের সময় এক মর্মান্তিক ঘটনায় বন্যার তীব্র স্রোতে একটি উদ্ধারকারী নৌকা ভেসে যায়। ওই নৌকায় স্থানীয় প্রশাসনিক প্রতিনিধিসহ উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা ছিলেন বলে জানা গেছে। ঘটনায় অন্তত ৯ জন নিখোঁজ হয়েছেন, তাঁদের সন্ধানে তল্লাশি অভিযান চলছে। রাজ্যের কেয়ি পাইয়র জেলায় মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩-এ। প্রশাসন জানিয়েছে, বন্যাকবলিত এলাকায় আটকে পড়া মানুষদের নিরাপদে সরিয়ে আনার কাজ চলাকালীনই প্রবল স্রোতের কারণে নৌকাটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পূর্ব সিয়াং ও লেপারাডা জেলা। শুধু পূর্ব সিয়াং জেলাতেই অন্তত ৯টি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। একাধিক রুটে যান চলাচল বন্ধ, স্থানীয়দের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ভূমিধস ও কাদার স্রোতের কারণে পাসিঘাটকে পাঙ্গিন, মারিয়াং-ইংকিয়ং এবং মেবো-দাম্বুক-বোমজিরের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকার সঙ্গে যোগাযোগকারী সড়কগুলো বন্ধ হয়ে রয়েছে। পাসিঘাট–রুনে–টাকিলালুগ সংযোগকারী রাস্তায়ও বড়সড় ক্ষতি হয়েছে। জাতীয় সড়ক-১৩-এর একাধিক অংশে ভূমিধস ও পাথরধসে যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। প্রশাসনের আশঙ্কা, কিছু রুট মেরামত ও পুনরুদ্ধারে এক সপ্তাহেরও বেশি সময় লাগতে পারে।
অরুণাচলের প্রবল বর্ষণের ব্যাপক প্রভাব পড়েছে প্রতিবেশী অসমেও। লেকু নদীর জল উপচে জোনাই মহকুমার একাধিক গ্রামে ঢুকে পড়েছে। শতাধিক পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ডুবে গিয়েছে বাড়িঘর, চাষের জমি ও গবাদি পশু। জাতীয় সড়ক ৫১৫-এর বহু অংশ জলমগ্ন হয়ে পড়ায় অসম ও অরুণাচলের মধ্যে সড়ক যোগাযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন। স্থানীয়দের দাবি, অতীতে কখনো লেকু নদী এত ভয়াবহ ভাবে গ্রামে ঢোকেনি। কেদিচুক-সহ একাধিক গ্রামে নজিরবিহীন বন্যা দেখা দিয়েছে। ধেমাজি জেলায় ১১০ মিলিমিটারেরও বেশি বৃষ্টিপাতের ফলে নদীভাঙনে আর্চিপাথার ও সিমেন চাপরি স্টেশনের মাঝের একটি রেলসেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তার জেরে ওই রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেল। ‘এনএফআর’-এর মুখ্য জনসংযোগ আধিকারিক কপিঞ্জল কিশোর শর্মা জানিয়েছেন, বন্যা ও নদীভাঙনের ফলে রেলসেতু বিপজ্জনক হয়ে পড়েছে। যাত্রীদের নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখেই ট্রেন চলাচল স্থগিত রাখা হয়েছে।
অসমের বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা। রবিবার তিনি জানান, পরিস্থিতির উপর তিনি নিজে নিয়মিত নজর রাখছেন। ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্যে রাজ্য সরকারের সমস্ত উপলব্ধ সম্পদ কাজে লাগানো হয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, এ মুহূর্তে সরকারের প্রধান লক্ষ্য দ্রুত ত্রাণ ও উদ্ধারকাজ চালানোর পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্তদের দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা। তিনি গোটা পরিস্থিতির উপর নিবিড় নজর রাখছেন। একই সঙ্গে রাজ্যের জলসম্পদমন্ত্রী সুশান্ত বরগোহাঁই এবং রাজস্ব ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী কেশব মহন্তকে ধেমাজিতে থেকে উদ্ধার, ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম সরাসরি তদারকির নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও ফোনে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে বন্যা পরিস্থিতির খোঁজ নিয়েছেন বলে জানা যাচ্ছে।
অসম প্রশাসন জানিয়েছে, রাজ্য সরকার যুদ্ধকালীন তৎপরতায় উদ্ধার ও ত্রাণকাজ চালিয়ে যাচ্ছে এবং কেন্দ্র-রাজ্যের সমন্বয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা চলছে। চলমান উদ্ধার অভিযানে গতি আনতে অতিরিক্ত ২৩ জন এনডিআরএফ কর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। এসডিআরএফ-এর বাহিনীও বিভিন্ন এলাকায় উদ্ধারকাজ চালিয়ে যাচ্ছে। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৪০টি বাড়ি সম্পূর্ণ ধ্বংস অথবা ভেসে গিয়েছে অন্তত ১৪টি বাড়ি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গোটা জেলায় ১২৮টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত। সরকারি ত্রাণশিবিরে বর্তমানে ৬০ জন আশ্রয় নিয়েছেন। সিয়াং জেলার লেডুমেও আচমকা বন্যায় পরিকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। লেপারাডা জেলায় কিডি নদীর জল বিপদসীমার উপর দিয়ে বইছে। বৃষ্টিজনিত বন্যা ও ভূমিধসে এখনো পর্যন্ত কেয়ি পানিয়র, পাপুম পারে, ক্রা দাদি, কুরুঙ কুমে, লোয়ার সুবনসিরি, কামলে, আপার সুবনসিরি, পূর্ব সিয়াং এবং লেপারাডা— মোট ৯টি জেলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, আগামী কয়েক দিনে অরুণাচল প্রদেশের কয়েকটি জেলায় ২০০ মিলিমিটারেরও বেশি বৃষ্টিপাত হতে পারে, ফলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সে কারণে অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত এড়ানো, শুধুমাত্র দিনের আলোতে ভ্রমণ এবং ভূমিধসপ্রবণ এলাকায় সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় প্রশাসন সাধারণ মানুষ ও পর্যটকদের জন্য জরুরি ভ্রমণ সতর্কতা জারি করেছে। আবহাওয়া পরিস্থিতি উন্নত হলে উদ্ধার ও অনুসন্ধান অভিযানে সহায়তার জন্য ভারতীয় বায়ুসেনা মঙ্গলবার ভোরে হেলিকপ্টার মোতায়েন করবে বলেও জানানো হয়েছে।
উল্লেখ্য, এর আগেও গত সপ্তাহে অরুণাচলের অন্য অংশে আকস্মিক বন্যা ও প্রবল বৃষ্টির জেরে প্রাণহানি ও বহু নিখোঁজের ঘটনা ঘটেছিল। বর্তমানে রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর পাশাপাশি সেনা ও বায়ুসেনাও উদ্ধারকাজে যুক্ত রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, উত্তর-পূর্ব ভারতের পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি ও বর্ষাকালে স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টির কারণে ক্লাউডবার্স্টের ঝুঁকি ক্রমশ বাড়ছে। তাই আগামী কয়েক দিন পরিস্থিতির উপর কড়া নজর রাখা এবং সরকারি নির্দেশিকা মেনে চলাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
❤ Support Us






