- এই মুহূর্তে স | হ | জ | পা | ঠ
- জুন ২৯, ২০২৬
গগনের সাফল্যে উজ্জ্বল আকাশ, ন্যাভআইসির ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা ! নেভিগেশনের দুই দেশীয় স্তম্ভ নিয়ে প্রবল আলোচনা
ভারতের মহাকাশ প্রযুক্তির দুই গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ — ‘গগন’ এবং ‘ন্যাভআইসি’। দুটিই উপগ্রহভিত্তিক নেভিগেশন ব্যবস্থা। কিন্তু কাজ একেবারেই আলাদা। একটির লক্ষ্য যাত্রীবাহী বিমানকে আরও নিরাপদে নামানো, অন্যটির উদ্দেশ্য দেশের নিজস্ব অবস্থান নির্ণয় ও সময়-নির্ভর অবকাঠামোকে বিদেশি ব্যবস্থার উপর নির্ভরতা থেকে মুক্ত রাখা। প্রযুক্তিগত দিক থেকে দুটি ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভিন্ন স্তরে কাজ করলেও, ভারতের কৌশলগত নিরাপত্তা, বিমান চলাচল এবং প্রযুক্তিগত সার্বভৌমত্বের জন্য দুটোই সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বাস্তব উদাহরণ মিলল গত ২৭ জুন। রাজস্থানের উদয়পুর বিমানবন্দরে ইন্ডিগোর একটি বিমান নিরাপদে অবতরণ করল। বাইরে থেকে দেখলে এটিকে কেবল একটি স্বাভাবিক ‘ল্যান্ডিং’ বলে মনে হতে পারে, কিন্তু বিমান চলাচল প্রযুক্তির দৃষ্টিতে এ ঘটনা ঐতিহাসিক। কারণ, প্রথমবার কোনো পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক বিমান ভারতের নিজস্ব স্যাটেলাইট-ভিত্তিক নেভিগেশন অগমেন্টেশন ব্যবস্থা ‘গগন’-এর সাহায্যে ‘লোকালাইজার পারফরম্যান্স উইথ ভার্টিক্যাল গাইড্যান্স’ ব্যবহার করে নিরাপদে রানওয়েতে নামল।
ভারতের অসামরিক বিমান চলাচলের ইতিহাসে এ সাফল্য যেমন এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল, তেমনই সামনে এনে দিল আর-এক বাস্তবতাকেও। দেশের দ্বিতীয় উপগ্রহভিত্তিক নেভিগেশন ব্যবস্থা’ ন্যাভআইসি’, যা দেশের নিজস্ব ‘জিপিএস সিস্টেম’ হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছিল, এখন সেটি অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই চালাচ্ছে। একাধিক উপগ্রহে ‘অ্যাটমিক ক্লক’-এর বিকল হয়ে যাওয়ায় ব্যবস্থাটি ন্যূনতম সক্ষমতা নিয়ে চলছে। ফলে একদিকে যখন গগন নিঃশব্দে ভারতের আকাশপথকে আরও নিরাপদ করছে, অন্যদিকে ‘ন্যাভআইসি’কে পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরিয়ে আনাই ‘ইসরো’র সামনে অন্যতম বড়ো কৌশলগত চ্যালেঞ্জ।
উপগ্রহভিত্তিক দুই ব্যবস্থাকে প্রায়ই একই প্রযুক্তির অংশ বলে মনে করা হয়। বাস্তবে তা নয়। ‘গগন’ ও ‘ন্যাভআইসি’ পরস্পরের বিকল্পও নয়, প্রতিদ্বন্দ্বীও নয়। ‘গগন’ স্যাটেলাইট-ভিত্তিক অগমেন্টেশন সিস্টেম। এ প্রযুক্তি নিজে থেকে কোনো অবস্থান নির্ণয় করে না। বরং মার্কিন ‘গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম’-এর সংকেতে থাকা ত্রুটি শনাক্ত করে তা সংশোধন করে আরও নির্ভুল ও নিরাপদ করে তোলে। বিশেষ করে বিমান অবতরণের সময়। কয়েক মিটারের সামান্য ত্রুটিও বিমান দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে, এখানেই ‘গগন’-এর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে, ‘ন্যাভআইসি’ একটি ‘পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন স্যাটেলাইট নেভিগেশন’ ব্যবস্থা। মার্কিন ‘জিপিএস’, রাশিয়ার ‘গ্লোনাস’, ইউরোপের ‘গ্যালিলিও’ বা চিনের ‘বেইদুয়ো’-র মতোই এটি নিজস্ব উপগ্রহমণ্ডলের মাধ্যমে ব্যবহারকারীকে জানায় তিনি ঠিক কোথায় অবস্থান করছেন। অর্থাৎ, ‘গগন’ যদি বিদ্যমান নেভিগেশন সংকেতকে আরও নির্ভুল করে, তবে ‘ন্যাভআইসি’ নিজেই একটি স্বাধীন নেভিগেশন সংকেত তৈরি করে। সহজ করে বললে, ‘জিপিএস’ যদি একজন গল্পকার হন, তবে ‘গগন’ হলেন সে গল্পের প্রুফ রিডার। আর ‘ন্যাভআইসি’ হলো ভারতের নিজস্ব গল্পকার, যার উপর অন্য কোনো প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ নেই।
সেখানেই দুটি ব্যবস্থার মৌলিক পার্থক্য। ‘গগন’ যতই উন্নত হোক, তার কাজের ভিত্তি কিন্তু ‘জিপিএস’।অর্থাৎ ‘জিপিএস’ সংকেত না থাকলে গগনের সংশোধন করারও কিছু থাকবে না। আন্তর্জাতিক সংঘাত, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ বা প্রযুক্তিগত বিপর্যয়ের সময় বিদেশি নেভিগেশন ব্যবস্থার উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল থাকা যে কোনো দেশের পক্ষেই ঝুঁকিপূর্ণ। এ কারণেই ভারতের কাছে ‘ন্যাভআইসি’ শুধু একটি প্রযুক্তি প্রকল্প নয়, বরং কৌশলগত স্বাধীনতার প্রতীক। জ্যামিং, স্পুফিং কিংবা সংকেত বন্ধ করে দেওয়ার মতো পরিস্থিতিতে দেশের নিজস্ব নেভিগেশন ব্যবস্থা সচল রাখার জন্যই ‘ন্যাভআইসি’ তৈরি করা হয়েছে।
অন্যদিকে, ভারতের বিমান চলাচলের ক্ষেত্রেও ‘গগন’-এর গুরুত্ব ক্রমশ বাড়ছে। দেশের বহু ছোটো ও মাঝারি বিমানবন্দরে এখনও ব্যয়বহুল ‘ইনস্ট্রুমেন্ট ল্যান্ডিং সিস্টেম’ বসানো সম্ভব হয়নি। ‘গগন’ প্রযুক্তির সাহায্যে ‘এলপিভি অ্যাপ্রোচ’ ব্যবহার করে তুলনামূলক কম খরচেই অত্যন্ত নির্ভুল অবতরণ সম্ভব। ফলে আঞ্চলিক বিমানবন্দরগুলিতেও খারাপ আবহাওয়া ও কম দৃশ্যমানতার মধ্যে নিরাপদে বিমান নামানো সহজ হবে। এতে উড়ান বাতিল, বিলম্ব, দুর্ঘটনার সম্ভাবনা কমে যায়। ভারতের বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যেই দেশের বিভিন্ন বিমানবন্দরে ‘গগন’-এর আওতায় ২৩টি ‘এলপিভি অ্যাপ্রোচ’ ব্যবস্থা চালু করেছে। চলতি বছরের শেষ নাগাদ সেই সংখ্যা ৪০-এর বেশি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর ফলে উড়ান প্রকল্পের আওতায় গড়ে ওঠা বহু নতুন বিমানবন্দরও উন্নত নেভিগেশন সুবিধা পাবে।
‘গগন’-এর এ সাফল্যের মধ্যেই ‘ন্যাভআইসি’র সংকট ভারতের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিজ্ঞানীদের মতে, একটি স্যাটেলাইট নেভিগেশন ব্যবস্থার প্রাণ হলো ‘অ্যাটমিক ক্লক’। সেকেন্ডের বিলিয়ন ভাগের এক ভাগ পর্যন্ত নির্ভুল সময় গণনা না হলে অবস্থান নির্ণয়ে শত শত মিটারের ত্রুটি দেখা দিতে পারে। আর সে কারণেই প্রতিটি নেভিগেশন উপগ্রহে একাধিক ‘অ্যাটমিক ক্লক’ থাকে। চলতি বছরের ১৩ মার্চ ‘ন্যাভআইসি’র একটি উপগ্রহে শেষ কার্যকর ‘অ্যাটমিক ক্লক’টিও বিকল হয়ে যাওয়ার পর গোটা ব্যবস্থার সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। অন্তত চারটি কার্যকর উপগ্রহ ছাড়া নির্ভুল অবস্থান নির্ণয় সম্ভব নয়। ফলে ভারতের নিজস্ব নেভিগেশন ব্যবস্থাকে দ্রুত পুনরুজ্জীবিত করা এখন শুধু প্রযুক্তিগত নয়, জাতীয় নিরাপত্তারও প্রশ্ন। বর্তমানে রেলপথ, মৎস্যজীবীদের জাহাজ, দুর্যোগ সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, সীমান্ত নজরদারি এবং সশস্ত্র বাহিনীর একাধিক পরিষেবা ‘ন্যাভআইসি’র উপর নির্ভরশীল। ইতিমধ্যেই দেশের হাজার হাজার ট্রেন এ ব্যবস্থার সাহায্যে চলাচল করছে। ফলে ‘ন্যাভআইসি’র কার্যকারিতা বজায় রাখা ভারতের কৌশলগত অবকাঠামোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
❤ Support Us








