Advertisement
  • বি। দে । শ মা | ঠে-ম | য় | দা | নে
  • জুলাই ৬, ২০২৬

ট্রাম্পের ফোনে বালোগুনের নির্বাসন স্থগিত ? বিশ্বকাপে নজিরবিহীন বিতর্কে ফিফা

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
ট্রাম্পের ফোনে বালোগুনের নির্বাসন স্থগিত ? বিশ্বকাপে নজিরবিহীন বিতর্কে ফিফা

বিশ্বকাপে বিতর্ক নতুন নয়। কখনো বিতর্কের কেন্দ্রে থাকে অফসাইডের সিদ্ধান্তকখনো ‘ভিএআর’,  কখনো  বা রেফারির বিতর্কিত বাঁশি। কিন্তু চলতি বিশ্বকাপে রবিবার যা ঘটলতা ফুটবলের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় লিখে দিল। মাঠের বাইরের একটি ফোনকল মুহূর্তের মধ্যে বদলে দিল বিশ্বকাপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ
নক-আউট ম্যাচের সমীকরণ। আর সে ফোনকল করেছিলেন বিশ্বের অন্যতম ক্ষমতাধর রাজনৈতিক নেতা
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

ট্রাম্পের ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপের পর ফিফা নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নিয়ে মার্কিন তারকা স্ট্রাইকার ফোলারিন বালোগুনের এক ম্যাচের স্বয়ংক্রিয় নির্বাসন স্থগিত রাখে। ফলে সোমবার বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে শেষ ষোলোর লড়াইয়ে মাঠে নামার অনুমতি পান যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ গোলদাতা এই ফরোয়ার্ড। ফিফার এ সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে আসতেই কয়েক মিনিটের মধ্যে তা বিশ্বকাপের অন্যতম বড়ো বিতর্কে পরিণত হয়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমটেলিভিশনের বিতর্কসভাপ্রাক্তন ফুটবলারধারাভাষ্যকার এবং আইন বিশেষজ্ঞদের আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে একটি প্রশ্ন— ফিফা কি সত্যিই ন্যায়বিচার করেছেনাকি রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করে নিজেদের শৃঙ্খলাব্যবস্থার ভিত্তিকেই দুর্বল করে দিলবিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচ শুরুর আগেই মাঠের লড়াই ছাপিয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠল ফিফার স্বাধীনতাবিচারিক ক্ষমতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবের প্রশ্ন।

ঘটনার সূত্রপাত বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ২-০ জয়ের ম্যাচে। সে ম্যাচে চলতি বিশ্বকাপে নিজের তৃতীয় গোল করেন ২৫ বছর বয়সি বালোগুন। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে বসনিয়ার ডিফেন্ডার তারিক মুহারেমোভিচের ডান গোড়ালিতে তাঁর বুটের স্টাড লাগার ঘটনায় প্রথমে কোনো কার্ড না দেখালেও পরে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর)-এর পর্যালোচনার ভিত্তিতে ব্রাজিলের রেফারি রাফায়েল ক্লাউস তাঁকে সরাসরি লাল কার্ড দেখান। ফিফার নিয়ম অনুযায়ী সরাসরি লাল কার্ড মানেই পরবর্তী ম্যাচে স্বয়ংক্রিয় নির্বাসন। সে কারণেই ধরে নেওয়া হয়েছিলবেলজিয়ামের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ নক-আউট ম্যাচে যুক্তরাষ্ট্রকে খেলতে হবে তাদের প্রধান স্ট্রাইকারকে ছাড়াই। কিন্তু ম্যাচ শেষ হওয়ার পর নাটকীয় মোড় নেয় ঘটনাপ্রবাহ।

সূত্রের দাবিট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে ফোন করে লাল কার্ডের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানান। এরপরই কিছু সময়ের মধ্যেই ফিফার ডিসিপ্লিনারি কমিটি বালোগুনের নির্বাসনের কার্যকারিতা এক বছরের পরীক্ষাকালীন সময়ের জন্য স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে।  তবে লাল কার্ডটি বাতিল করা হয়নি। অর্থাৎ অপরাধ বহাল রাখা হয়েছেকিন্তু তার শাস্তি আপাতত কার্যকর করা হচ্ছে না। পড়ে, ফিফার বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, ডিসিপ্লিনারি কোডের ২৭ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনো শাস্তির কার্যকারিতা সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে স্থগিত রাখার ক্ষমতা বিচারিক সংস্থার রয়েছে। সে ক্ষমতাই এ ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়েছে। সংস্থার বক্তব্যআগামী এক বছরের পরীক্ষাকালীন সময়ে যদি বালোগুন একই ধরনের এবং সমান গুরুতর অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হনতবে এই স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করা হবে। সেক্ষেত্রে পুরনো শাস্তি কার্যকর হওয়ার পাশাপাশি নতুন অপরাধের জন্য পৃথক শাস্তিও বহাল থাকবে।

কিন্তু, হঠাৎ মার্কিন তারকার জন্য কেন এ ক্ষমতা প্রয়োগ করা হলো, সে প্রশ্নের কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি ফিফা। ট্রাম্প ও ইনফান্তিনোর কথোপকথন সম্পর্কেও কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি ফিফার কর্মকর্তারা। অন্যদিকে সিদ্ধান্ত ঘোষণার পরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প লেখেন, ‘সঠিক কাজটি করার জন্য এবং একটি বিরাট অবিচারের সংশোধন করার জন্য ফিফাকে ধন্যবাদ।’ তবে এ ঘটনায়  মার্কিন ফুটবল শিবিরে অবশ্য স্বস্তির আবহ। দলীয় বাসে অনুশীলনে যাওয়ার সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকেই খবরটি জানতে পারেন ফুটবলাররা। অধিনায়ক ক্রিশ্চিয়ান পুলিসিচ বলেন, ‘প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। তারপর মনে হলসত্যিই দারুণ খবর।’ তিনি আরও বলেন, ‘ঘটনাটি যদি ভালো করে দেখা হয়সেখানে ইচ্ছাকৃত কোনো আঘাত ছিল না। চলতি বিশ্বকাপে এর থেকেও কঠিন ট্যাকল হয়েছেযেখানে এমন শাস্তি দেওয়া হয়নি।’

মার্কিন কোচ মাউরিসিও পোচেত্তিনোও ফিফার সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছেন। তাঁর দাবি, ‘বিশ্ব ফুটবলের ৯৯.৯ শতাংশ মানুষই বলেছেনএটি লাল কার্ড’ খাওয়ার মতো ছিল না। অতীতেও এমন হয়েছেযেখানে শাস্তি স্থগিত রেখে পরে কার্যকর করা হয়েছে। তাই এত অবাক হওয়ার কিছু নেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা বসনিয়ার বিরুদ্ধে প্রায় তিরিশ মিনিট দশজন নিয়ে খেলেছি। সে মূল্য আমরা দিয়েছি। এরপর আরও একটি ম্যাচে ওকে হারানো সম্পূর্ণ অন্যায্য হতো।’ ট্রাম্পের হস্তক্ষেপ নিয়েও বিস্মিত নন আর্জেন্টিনার প্রাক্তন আন্তর্জাতিক এই কোচ। তাঁর দাবি, ‘আমি এমন সংস্কৃতি থেকে এসেছি যেখানে ফুটবল ধর্মের মতো। কখনো কখনো ধর্মের থেকেও বড়ো। খেলাধুলা মানুষকে একত্রিত করে। রাষ্ট্রকে একসূত্রে বাঁধে।’

মার্কিন শিবিরের উচ্ছ্বাসের সম্পূর্ণ বিপরীত ছবি দেখা যায় বেলজিয়াম শিবিরে। রয়্যাল বেলজিয়ান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (আরবিএফএ) জানায়তারা এই সিদ্ধান্তে স্তম্ভিত তাদের অভিযোগফিফা নিজেরাই নিজেদের প্রতিযোগিতা সংক্রান্ত বিধি লঙ্ঘন করেছে। সংস্থার যুক্তিডিসিপ্লিনারি কোডের ২৭ নম্বর অনুচ্ছেদে শাস্তি স্থগিত রাখার ক্ষমতা থাকলেও একই কোডের ৬৬.৪ নম্বর অনুচ্ছেদ স্পষ্টভাবে বলছেসরাসরি লাল কার্ড দেখলে পরবর্তী ম্যাচে নির্বাসন স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হবে। এ ছাড়া বিশ্বকাপ প্রতিযোগিতার ১০.৫ নম্বর অনুচ্ছেদেও একই বিধান রয়েছে। তাই আরবিএফএ-র দাবিফিফার এ সিদ্ধান্ত সরাসরি নিজেদের প্রতিযোগিতা পরিচালন বিধির সঙ্গেই সাংঘর্ষিক। বেলজিয়ামের কোচ রুডি গার্সিয়া আরও তীব্র ভাষায় কটাক্ষ করেছেন। তাঁর মন্তব্য, ‘আমি জানতাম নাফিফার দফতরে ৫ জুলাই মানেই ইউরোপে ১ এপ্রিল।’ এপ্রিল ফুল দিবসের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘আমরা শুধু বেলজিয়ান ফুটবলকে নয়গোটা ফুটবলের সততা এবং নৈতিকতাকেই রক্ষা করার চেষ্টা করছি। আমার মনে হয়বিশ্বকাপের ইতিহাসে এই প্রথম এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো।’ তবে তাঁকে যখন জিজ্ঞেস করা হয়তাঁরা কি কোর্ট অব আরবিট্রেশন ফর স্পোর্টস’-এ (সিএএস) যাবেনঅথবা ট্রাম্পের ফোন সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছে কি নাসে বিষয়ে মন্তব্য করতে চাননি গার্সিয়া। তবে, ‘আরবিএফএ জানিয়েছেসম্ভাব্য সব আইনি পথ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

শুধু বেলজিয়াম নয়ইউরোপের আরও কয়েকটি শিবির থেকেও প্রশ্ন উঠেছে। ইংল্যান্ডের কোচ টমাস টুখেল বলেছে, ‘আমারও মনে হয় না ওটা লাল কার্ড ছিল। কিন্তু তিনজন ম্যাচ কর্মকর্তা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তারপর সে সিদ্ধান্ত কে বদলাচ্ছেকোন ক্ষমতায়? বাইরের ই হস্তক্ষেপের শেষ কোথায়? তিনি আরও প্রশ্ন তুলেছেন, ‘আজ যদি এটি হয়কাল অন্য কোনো হলুদ বা লাল কার্ড নিয়েও কি একইভাবে সিদ্ধান্ত পাল্টানো হবে?’ নরওয়ের কোচ স্টলে সোলবাক্কেন আরও কঠোর ভাষায় বলেন, ‘এটি অত্যন্ত খারাপ সিদ্ধান্ত। পরের লাল কার্ডের ক্ষেত্রেও কি একই কাজ হবেএই সিদ্ধান্ত বিশ্বকাপেরই ক্ষতি করবে।’

তবে, ফিফার ইতিহাসে এমন নজির সম্পূর্ণ নতুন নয়। ২০২৫ সালের নভেম্বরে আয়ারল্যান্ডের বিরুদ্ধে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে লাল কার্ড দেখার পর ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর তিন ম্যাচের নির্বাসনের শেষ দুটি ম্যাচ স্থগিত রাখা হয়েছিল। ফলে তিনি বিশ্বকাপের শুরু থেকেই খেলতে পেরেছিলেন। এ বছরই বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে নিকোলাস ওতামেন্দি এবং মোইসেস কাইসেদোর নির্বাসনও স্থগিত রাখা হয়। আরও পুরনো নজির রয়েছে ১৯৬২ সালের বিশ্বকাপে। সেমিফাইনালে চিলির বিরুদ্ধে লাল কার্ড দেখার পর ব্রাজিলের কিংবদন্তি গ্যারিঞ্চাকে রাজনৈতিক তদবিরের জেরে ফাইনালে খেলতে দেওয়া হয়েছিল। পরে সেই ফাইনাল জিতে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় ব্রাজিল। তবে বর্তমান বিতর্কের বিশেষত্ব অন্যত্র। কারণএখানে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাবান রাজনৈতিক নেতাদের একজন সরাসরি হস্তক্ষেপ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। আর সে অভিযোগের পরই ফিফার সিদ্ধান্ত বদলেছে। ফলে সোমবার যুক্তরাষ্ট্র-বেলজিয়াম ম্যাচ যতটা না ফুটবলের লড়াইতার থেকেও বেশি হয়ে উঠেছে বিশ্ব ফুটবলের প্রশাসনিক স্বচ্ছতারাজনৈতিক প্রভাব এবং ফিফার স্বাধীনতার এক কঠিন পরীক্ষার মঞ্চ।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!