- বি। দে । শ
- জুলাই ৩, ২০২৬
শান্তি-আলোচনার মাঝেই ইরানের শীর্ষ আলোচকদের হত্যা করতে পারে ইজরায়েল! সতর্কবার্তা ট্রাম্প প্রশাসনের
শান্তি আলোচনার সময়, ইরানের শীর্ষ আলোচকদের লক্ষ্য করে হামলা চালাতে পারে ইজরায়েল, সে সম্ভাবনার কথা জানিয়ে পশ্চিম এশিয়ার একাধিক দেশকে তেহরানকে সতর্ক করার অনুরোধও করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। এমনই বিস্ফোরক দাবি উঠে এসেছে ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এর এক প্রতিবেদনে। বর্তমান ও প্রাক্তন মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এবং পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফকে নিয়ে ওয়াশিংটনের উদ্বেগ ছিল সবচেয়ে বেশি। কারণ, তাঁদের বিরুদ্ধে কোননো হত্যাচেষ্টা হলে সদ্য শুরু হওয়া যুদ্ধবিরতির আলোচনা মুহূর্তে ভেঙে পড়তে পারত। গোটা পশ্চিম এশিয়া ফের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের মুখে পড়ত।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতির প্রাথমিক আলোচনা শুরু হওয়ার পর থেকেই মার্কিন প্রশাসন উপলব্ধি করেছিল, ইজরায়েলের সামরিক কৌশল এবং ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক লক্ষ্য আর এক পথে চলছে না। যুক্তরাষ্ট্র যেখানে সংঘাত থামিয়ে আলোচনার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের চেষ্টা করছিল, সেখানে তেল আভিভ যুদ্ধের মাধ্যমে ইরানের ক্ষমতার কাঠামো ভেঙে দিতে বদ্ধপরিকর ছিল। সে কৌশলের অংশ হিসেবেই তেহরানের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছিল বলে মার্কিন গোয়েন্দাদের মূল্যায়ন।
‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’ জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ইজরায়েলের লক্ষ্য ছিল ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে একে একে সরিয়ে দেওয়া। বিশেষ করে আয়াতোল্লাহ খোমেনেই নিহত হবার পর, সে প্রক্রিয়া আরও কঠোর ভাবে চালাতে চেয়েছিলেন বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। ওয়াশিংটনের উদ্বেগ ছিল, যুদ্ধবিরতির আলোচনায় নেতৃত্বদানকারী আরাঘচি এবং গালিবাফও যে কোনো সময় হামলার শিকার হতে পারেন। মার্কিন কর্মকর্তাদের আশঙ্কা ছিল, এমন কোনো ঘটনা ঘটলে আলোচনার পথ কার্যত বন্ধ হয়ে যাবে। যুদ্ধ নতুন করে আরও ভয়াবহ আকার নেবে। এ আশঙ্কা থেকেই যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম এশিয়ার একাধিক মিত্র দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করে। তাদের অনুরোধ করা হয়, যাতে তারা সরাসরি ইরানকে সতর্ক করে দেয়—ইজরায়েল তেহরানের শীর্ষ আলোচকদের লক্ষ্য করে হামলা চালাতে পারে।
প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, যুদ্ধের প্রথম থেকেই ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বকে হত্যা করা ছিল ইজরায়েলের ঘোষিত নয়, কিন্তু কার্যকর কৌশল। সংঘাতের সূচনায় ইজরায়েলের ধারাবাহিক বিমান হামলায় ইরানের বহু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নিহত হন। মার্কিন বাহিনী মূলত ইরানের নৌবাহিনী, ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার ওপর আঘাত হানলেও, ইজরায়েল মনোনিবেশ করেছিল নেতৃত্বের শীর্ষস্তরে। হামলায় প্রাণ হারান ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ আলি লারিজানি এবং সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী কামাল খাররাজি। মার্কিন প্রশাসনের একাংশের মতে, এ দুই নেতাকে তুলনামূলক বাস্তববাদী হিসেবে দেখা হতো এবং ট্রাম্প প্রশাসন ভবিষ্যতে তাঁদের সঙ্গে আলোচনায় বসার সম্ভাবনাও বিবেচনা করছিল। কিন্তু তাঁরা নিহত হওয়ায় সে সম্ভাবনাও কার্যত শেষ হয়ে যায়।
মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, যুদ্ধ যত এগিয়েছে, ততই স্পষ্ট হয়েছে যে ওয়াশিংটন ও তেল আভিভের লক্ষ্য আর এক নয়। যুক্তরাষ্ট্র চাইছিল যুদ্ধবিরতির ভিত্তিতে একটি রাজনৈতিক সমাধান গড়ে তুলতে। কিন্তু ইজরায়েল মনে করছিল, সে সময়ে যুদ্ধ থামিয়ে দেওয়া হলে ইরানের শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করার সুযোগ হাতছাড়া হবে। এপ্রিল মাসে কার্যকর হওয়া প্রথম দফার দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিকে ইজরায়েলি নেতৃত্ব প্রকাশ্যে সমর্থন করলেও, সে সমর্থনের মধ্যে ছিল তীব্র অনীহা। তেল আভিভের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা মহলের একাংশের আশঙ্কা ছিল, যুক্তরাষ্ট্র খুব দ্রুত যুদ্ধের ইতি টানতে চাইছে। অথচ তাঁদের মতে, ইরানের ধর্মতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা তখনো ভেঙে পড়েনি, বরং সংঘাতের জেরে ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কর্পস’ (আইআরজিসি) আরও শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছে গেছে।
প্রতিবেদনে আরও একটি নাটকীয় ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সঙ্গে বৈঠক শেষে গালিবাফ যখন বিমানে করে তেহরানে ফিরছিলেন, তখন ইরানের গোয়েন্দারা এমন তথ্য পায় যে তাঁর বিমানকে লক্ষ্য করে হামলার পরিকল্পনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে দুটি ইজরায়েলি যুদ্ধবিমান ইরানের আকাশসীমায় ঢুকে পড়েছে বলেও খবর আসে। পরিস্থিতি এতটাই উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে যে গালিবাফের বিমানকে জরুরি ভিত্তিতে মাশহাদে অবতরণ করানো হয়। পরে তিনি সড়কপথে রাজধানী তেহরানে ফিরে যান। তবে এই ধারাবাহিক নিরাপত্তা-হুমকিও ইরানের কূটনৈতিক উদ্যোগকে থামাতে পারেনি। মে মাসে আরাঘচি এবং গালিবাফ প্রথমে কাতার, পরে সুইজারল্যান্ডে গিয়ে শান্তি-আলোচনায় অংশ নেন।
এ পরিস্থিতিতে আরাঘচি ও গালিবাফের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর রাখা, আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় বজায় রাখা এবং শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বৃহত্তর শান্তি চুক্তির দিকে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এই দুই নেতাই মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। জুন মাসে ওয়াশিংটন ও তেহরান একটি প্রাথমিক কাঠামোগত চুক্তিতে পৌঁছায়। সে চুক্তির মূল লক্ষ্য ছিল হরমুজ প্রণালিতে নৌ-চলাচল স্বাভাবিক করা এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ভবিষ্যতের আলোচনার ভিত্তি তৈরি করা। কিন্তু ওই চুক্তিকে শুরু থেকেই তীব্র সমালোচনার চোখে দেখেছিল ইজরায়েল। দেশটির বহু সামরিক বিশ্লেষক ও সরকারি কর্মকর্তার মতে, ওই সমঝোতা ইজরায়েলের ঘোষিত কোনো লক্ষ্যই পূরণ করতে পারেনি। ইরানে শাসন পরিবর্তন, দেশটির মিত্র প্রক্সি গোষ্ঠীগুলিকে দুর্বল করা কিংবা ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করার কোনো উদ্দেশ্যই বাস্তবায়িত হয়নি। উল্টে চুক্তির মাধ্যমে ইরানের হাতে বিপুল আর্থিক সংস্থান পৌঁছাতে পারে, যার সাহায্যে তারা যুদ্ধের ক্ষতি দ্রুত কাটিয়ে উঠবে— এমন আশঙ্কাও প্রকাশ করা হয়।
❤ Support Us







