Advertisement
  • বি। দে । শ
  • জুলাই ৩, ২০২৬

যুদ্ধের চার মাস পর শেষযাত্রায় আয়াতোল্লাহ খামেনেই, ছ-দিনের রাষ্ট্রীয় শোককে শক্তিপ্রদর্শনের মঞ্চ করছে তেহরান ?

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
যুদ্ধের চার মাস পর শেষযাত্রায় আয়াতোল্লাহ খামেনেই, ছ-দিনের রাষ্ট্রীয় শোককে শক্তিপ্রদর্শনের মঞ্চ করছে তেহরান ?

প্রায় চার মাস আগে যুদ্ধের আগুনে নিহত হয়েছিলেন ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেই। আমেরিকা-ইজরায়েলের লাগাতার হামলার মাঝে তাঁর শেষকৃত্য করেনি তেহরান। অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান। শনিবার থেকে শুরু হচ্ছে তাঁর বহু প্রতীক্ষিত রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া। ছ-দিন ধরে চলবে আনুষ্ঠানিকতা। প্রথমে পবিত্র শহর কুম, পরে ইরাকের নাজাফ ও কারবালা ঘুরে শেষ পর্যন্ত খামেনেইকে সমাধিস্থ করা হবে তাঁর জন্মস্থান উত্তর-পূর্ব ইরানের মাশহাদে, ইমাম রেজার মাজার চত্বরে।

বিশাল এই আয়োজনকে কেবল ধর্মীয় নেতার বিদায় নয়, বরং ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের রাজনৈতিক শক্তি, জনসমর্থন এবং প্রতিরোধের বার্তা হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে তেহরান। গোটা রাজধানী জুড়ে টাঙানো হয়েছে বিশাল বিশাল ব্যানার, ফেস্টুন। কোথাও খামেনেইর মুষ্টিবদ্ধ হাতের ছবি, কোথাও লেখা— ‘আমাদের উঠে দাঁড়াতেই হবে’। আরবি, ফার্সি ও ইংরেজি— তিন ভাষাতেই ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে সে বার্তা। ইরানের সরকারি সূত্রের দাবি, অন্ত্যেষ্টিতে কয়েক কোটি মানুষের সমাগম হতে পারে। বিদেশি রাষ্ট্রনেতা, কূটনীতিক এবং ধর্মীয় প্রতিনিধিদেরও উপস্থিত থাকার কথা। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারেন বলে ইসলামাবাদ সূত্রে খবর। ভারত থেকেও একটি প্রতিনিধি দল তেহরানে পৌঁছবে। যদিও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা নেই বলেই কূটনৈতিক মহলের ধারণা।

খামেনেইর কফিন শুক্রবার তেহরানের ‘গ্র্যান্ড মোসাল্লা’য় জনসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা হয়। জাতীয় পতাকায় মোড়া কফিনের পাশে শায়িত তাঁর পরিবারের সদস্যদের দেহও, যাঁরা যুদ্ধের প্রথম দফার হামলায় নিহত হয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন খামেনেইর জামাই, জ্যেষ্ঠ কন্যা, মাত্র ১৪ মাস বয়সি নাতনি এবং নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা মোজতবা খামেনেইর স্ত্রী। শুক্রবার থেকেই ‘গ্র্যান্ড মোসাল্লা’য় শুরু হয়েছে শোকজ্ঞাপন। রাষ্ট্রপতি মাসুদ পেজেশকিয়ান, সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ, বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি-সহ ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব শ্রদ্ধা জানান। বিদেশি প্রতিনিধিদেরও একে একে কফিনের সামনে নতজানু হতে দেখা যায়। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের সম্প্রচারিত ছবিতে দেখা যায়, বহু শোকাহত মানুষ নিজেদের স্কার্ফ বা ব্যক্তিগত সামগ্রী কফিনে স্পর্শ করিয়ে আশীর্বাদ হিসেবে গ্রহণ করছেন। শিয়া ধর্মীয় সংস্কৃতিতে এ রীতি দীর্ঘদিনের।

পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা মোজতবা খামেনেইর অনুপস্থিতি। যুদ্ধের সময় হামলায় আহত হওয়ার পর তিনি এখনো প্রকাশ্যে আসেননি। ইজরায়েলের তরফে তাঁর প্রাণনাশের আশঙ্কা থাকায় নিরাপত্তাজনিত কারণেই তিনি বাবার অন্ত্যেষ্টিতেও যোগ দেবেন না বলে ইরানি সূত্রে দাবি। তবে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত প্রথম বার্তায় তিনি জানিয়েছেন, মৃত্যুর পর বাবার দেহের কাছে গিয়ে তিনি তাঁর মুষ্টিবদ্ধ হাত দেখেছিলেন। সে হাতই প্রতিরোধের প্রতীক। অন্যদিকে, বহু মাস পর প্রকাশ্যে দেখা গেছে ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পস’-এর প্রভাবশালী জেনারেল আহমদ বাহিদিকে। যুদ্ধ শুরুর আগে থেকেই তিনি জনসমক্ষে আসেননি। এদিন খামেনেইর কফিনের পাশে তাঁর উপস্থিতি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল। ইরানের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও আমেরিকার সঙ্গে সম্ভাব্য আলোচনায় বাহিদি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন বলেও তাঁদের ধারণা।

এ দিকে, যুদ্ধ শেষ হলেও পশ্চিম এশিয়ায় পরিস্থিতি এখনো অস্থির। হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে আমেরিকার সঙ্গে ইরানের টানাপড়েন অব্যাহত। ইজরায়েল ফের হামলা চালাতে পারে— এমন আশঙ্কাও পুরোপুরি উড়িয়ে দিচ্ছে না তেহরান। এ আবহেই ইরানের যৌথ সামরিক কমান্ড কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে। তাদের দাবি, আমেরিকা, ইজরায়েল বা তাদের সহযোগীরা যদি নতুন করে কোনো ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নেয়, তার জবাব হবে কঠোর।

খামেনেইর মৃত্যু ইরানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। ১৯৮৯ সালে আয়াতোল্লা রুহোল্লা খোমেনির মৃত্যুর পর ক্ষমতায় এসে টানা ৩৬ বছর ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের নেতৃত্ব দেন তিনি। এ সময়ে একদিকে যেমন ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে এগিয়ে নিয়ে যান, তেমনই লেবাননের হিজবুল্লাহ, গাজার হামাস, ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী এবং পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রতি সমর্থন জারি রাখেন। ইরানের ভাষায় যাকে বলা হত ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’। তবে গত কয়েক বছরের যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং দেশের ভিতরে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সংকট সে প্রভাবকে অনেকটাই ক্ষয় করেছে। মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব আর রাজনৈতিক দমননীতির বিরুদ্ধে একের পর এক গণআন্দোলনও হয়েছে। তবু শাসকগোষ্ঠী কঠোর হাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণেই রেখেছে।

বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, খামেনেইর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া তাই কেবল শোকের অনুষ্ঠান নয়। ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের অস্তিত্ব, উত্তরাধিকার এবং জনসমর্থনের এক বড়ো পরীক্ষা। লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাগম ঘটিয়ে বিশ্বকে এই বার্তা দিতে চাইছে তেহরান যে যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা কিংবা আন্তর্জাতিক চাপ— কোনো কিছুর মুখেই রাষ্ট্রের ভিত নড়েনি। অন্যদিকে, বিরোধীদের দাবি, এই বিপুল আয়োজনের আড়ালে দেশের অর্থনৈতিক সংকট, জনঅসন্তোষ এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাকে আড়াল করারই চেষ্টা করছে ইরানের শাসকগোষ্ঠী। ফলে, যুদ্ধ-পরবর্তী অনিশ্চয়তার আবহে শুরু হওয়া এই ছ-দিনের অন্ত্যেষ্টি তাই মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতি, ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং পশ্চিম এশিয়ার ভবিষ্যৎ সমীকরণের দিক থেকেও এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে উঠতে চলেছে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!