- বি। দে । শ
- জুলাই ৬, ২০২৬
দক্ষিণ ইউরোপে ভয়াবহ দাবানল ! গ্রিস, ফ্রান্স, পর্তুগাল ও স্পেনে হাজার হাজার মানুষ ঘরছাড়া, বিষাক্ত ধোঁয়ায় সতর্কতা জারি
ইউরোপের দক্ষিণাংশ আগুনের বলয়ে বন্দি। গ্রিস, পর্তুগাল, স্পেন ও ফ্রান্স— চার দেশেই একের পর এক দাবানল নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় হাজার হাজার মানুষকে বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে হয়েছে। কোথাও বিষাক্ত ধোঁয়ায় ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ রাখার নির্দেশ, কোথাও আবার আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা দর্শকদের জন্য সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে প্রশাসন। আগুনের ভয়াবহতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ যৌথভাবে উদ্ধার ও অগ্নিনির্বাপণ অভিযানে নেমেছে।
রবি ও সোমবার জুড়ে দক্ষিণ ইউরোপের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়া দাবানল ইতিমধ্যেই প্রায় ২০ হাজার হেক্টরেরও বেশি বনভূমি, কৃষিজমি ও সংরক্ষিত অরণ্য গ্রাস করেছে। আবহাওয়াবিদদের আশঙ্কা, প্রবল বাতাস এবং ফের বাড়তে থাকা তাপমাত্রা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতির একটি তৈরি হয়েছে গ্রিসে। দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর থেসালোনিকির উপকণ্ঠ ওরাইওকাস্ত্রো এলাকায় একটি পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ কারখানায় দাবানল ছড়িয়ে পড়ার পর সেখান থেকে নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়ায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে আশপাশের এলাকা। প্রশাসন সঙ্গে সঙ্গে শহরের একাধিক অংশের বাসিন্দাদের ঘরের ভিতরে থাকার, জানালা-দরজা বন্ধ রাখার ও অপ্রয়োজনে বাইরে না বেরোনোর নির্দেশ দেয়।
জানা যাচ্ছে, প্রবল হাওয়ার দাপটে রাতভর আগুন দ্রুত ছড়াতে থাকে। পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রায় ১৬০ জন দমকলকর্মী রাতভর লড়াই চালান। ভোর হওয়ার পর জলবাহী বিমান ও হেলিকপ্টার অভিযান শুরু করলে অগ্নিনির্বাপণের কাজ আরও জোরদার হয়। ওরাইওকাস্ত্রোর মেয়র জানিয়েছেন, একাধিক বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যদিও প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির হিসাব এখনো নিশ্চিত নয়। তদন্তে উঠে এসেছে, ৭৬ বছর বয়সি এক ব্যক্তির গাড়ি থেকে বেরোনো স্ফুলিঙ্গ শুকনো ঘাসে আগুন ধরিয়ে দেয়। সে আগুন থেকেই ভয়াবহ দাবানলের সূত্রপাত হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে মনে করছে দমকল বিভাগ। তাঁকে গ্রেফতার করে আদালতে তোলা হয়েছে।
রবিবার বিকেলেই গ্রিসের রাজধানী এথেন্সের পশ্চিমে মান্দ্রা অঞ্চলেও নতুন করে দাবানল ছড়িয়ে পড়ে। পাইন অরণ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে ২১০ জন দমকলকর্মী, বিশেষ প্রশিক্ষিত বাহিনী, স্বেচ্ছাসেবক এবং ২৯টি বিমান ও হেলিকপ্টার মোতায়েন করা হয়েছে। রাত নামার আগে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য মরিয়া চেষ্টা চালানো হয়, কারণ অন্ধকার নেমে এলে আকাশপথে অগ্নিনির্বাপণ কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে। গ্রিসের দমকল বিভাগের মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার ইয়োয়ানিস আর্তোপিওস জানিয়েছেন, দেশে প্রায় ৮৫ শতাংশ দাবানলের জন্য দায়ী মানুষের অবহেলা। কৃষিকাজের যন্ত্রপাতি থেকে উড়ে যাওয়া স্ফুলিঙ্গ, অসাবধানতাবশত ফেলে দেওয়া সিগারেট কিংবা খোলা জায়গায় বারবিকিউ করার মতো ঘটনাই অধিকাংশ অগ্নিকাণ্ডের উৎস।
গ্রীষ্মকালে দাবানল গ্রিসের কাছে নতুন নয়। ২০১৮ সালে এথেন্সের পূর্ব উপকূলে ভয়াবহ দাবানলে একশোরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। ২০২৩ সালে উত্তর-পূর্ব গ্রিসের সংরক্ষিত অরণ্যে যে দাবানল ছড়িয়েছিল, সেটিই ছিল ইউরোপীয় ইউনিয়নের ইতিহাসে নথিভুক্ত বৃহত্তম দাবানল। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় চারটি নতুন উপগ্রহকে কাজে লাগিয়ে দাবানল পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা গড়ে তুলছে গ্রিস সরকার।
পর্তুগালের পরিস্থিতিও কম ভয়াবহ নয়। দেশের মধ্যাঞ্চলের ভুজেলা এলাকায় বৃহস্পতিবার শুরু হওয়া দাবানল এখনও সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আসেনি। সেখানে ১,২০০-রও বেশি দমকলকর্মী, প্রায় ৪০০টি যানবাহন এবং ১৫টি বিমান আগুন নেভানোর কাজে নিয়োজিত। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোপার্নিকাস উপগ্রহের তথ্য অনুযায়ী, ইতিমধ্যেই প্রায় ১৩ হাজার হেক্টর এলাকা পুড়ে গিয়েছে। আগুনের ভয়াবহতা বিবেচনা করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নাগরিক সুরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়েছে। স্পেন ১২০ জন দমকলকর্মী ও ৪৫টি বিশেষ যান পাঠিয়েছে। ইতালি এবং স্পেন থেকে অতিরিক্ত অগ্নিনির্বাপণ বিমানও পর্তুগালে পৌঁছেছে। সোমবার পর্তুগালের জরুরি পরিষেবা জানিয়েছে, দাবানলের প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণে এলেও এখনো বহু জায়গায় আগুনের সক্রিয় কেন্দ্র রয়ে গেছে। দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুইস নেভেস পরিস্থিতিকে ‘বারুদের স্তূপ’-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন।
স্পেনেও একাধিক প্রদেশে আগুন ছড়িয়েছে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জিরোনা প্রদেশে শুক্রবার শুরু হওয়া দাবানলে ইতিমধ্যেই প্রায় ২,২০০ হেক্টর এলাকা পুড়ে গিয়েছে। আগুনের প্রায় ৯৭ শতাংশই সংরক্ষিত লেস গাভারেস প্রাকৃতিক অরণ্যের মধ্যে ছড়িয়েছে। প্রায় ৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ আগুনের পরিধির মধ্যে এখনও অসংখ্য জায়গায় ধিকিধিকি আগুন জ্বলছে। ফলে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনতে আরও কয়েক দিন সময় লাগতে পারে বলে মনে করছেন দমকল আধিকারিকেরা। স্পেনের পূর্বাঞ্চলের কাস্তেয়োন প্রদেশে আগুন ‘সিয়েরা দে এস্পাদান’ জাতীয় উদ্যানে ছড়িয়ে পড়ায় পাঁচশোরও বেশি বাসিন্দাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
ফ্রান্সেও পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি হয়েছে। স্পেন সীমান্ত সংলগ্ন পিরেনিজ পর্বতমালার পাদদেশে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া দাবানলে পাঁচ হাজার হেক্টরেরও বেশি এলাকা পুড়ে গিয়েছে। আগুন থেকে বাঁচাতে দশ হাজারেরও বেশি মানুষকে সরিয়ে নিতে হয়েছে। প্রায় সাতশো দমকলকর্মী দিনরাত অভিযান চালাচ্ছেন। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ জানিয়েছেন, চলতি মরসুমে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় দ্বিগুণ এলাকা আগুনে পুড়ে গিয়েছে। সোমবার সকাল থেকেই আবহাওয়ার অবনতি হওয়ায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। আগুনের জেরে বিখ্যাত সাইকেল প্রতিযোগিতা ‘ট্যুর দ্য ফ্রান্স’-এর তৃতীয় পর্যায়ে নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে প্রশাসনকে। দর্শকদের পুরো রুট ও সমাপ্তিস্থলে না যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শুধুমাত্র প্রতিযোগী সাইক্লিস্ট এবং প্রতিযোগিতা পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় যানবাহন চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
জলবায়ু গবেষণা সংস্থা ‘ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন’-এর বিজ্ঞানীদের মতে, জুন মাসে পশ্চিম ইউরোপে যে নজিরবিহীন তাপপ্রবাহ দেখা গিয়েছিল, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন না হলে তা কার্যত অসম্ভব। মে মাস থেকেই শুরু হওয়া অস্বাভাবিক গরম, দীর্ঘ খরা এবং শুষ্ক বনাঞ্চল এখন গোটা দক্ষিণ ইউরোপকে দাবানলের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। চলতি সপ্তাহে বহু এলাকায় তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছুঁতে পারে বলেও পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। শুধু এই চার দেশই নয়, ক্রোয়েশিয়ার হভার দ্বীপ এবং আলবেনিয়ার তালে এলাকাতেও দাবানলে শত শত হেক্টর বনভূমি, আঙুরের বাগান এবং ঝোপঝাড় পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছে।বিশেষজ্ঞদের মতে, একের পর এক দাবানল আবারও স্পষ্ট করে দিচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত আর ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়। তা এখন প্রতিদিনের বাস্তবতা। প্রতি বছর আগুনের মরসুম আরও দীর্ঘ হচ্ছে, আগুন আরও দ্রুত ছড়াচ্ছে, আর অগ্নিনির্বাপণ বাহিনীর সামনে তৈরি হচ্ছে ক্রমশ কঠিনতর লড়াই।
❤ Support Us







