Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • জুলাই ৮, ২০২৬

ইয়াকের গলায় স্মার্ট ডিভাইস, অসুস্থতা থেকে অবস্থান সবই জানাবে প্রযুক্তি! আইওটি-ভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থা তৈরি ভারতীয় বিজ্ঞানীদের

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
ইয়াকের গলায় স্মার্ট ডিভাইস, অসুস্থতা থেকে অবস্থান সবই জানাবে প্রযুক্তি! আইওটি-ভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থা তৈরি ভারতীয় বিজ্ঞানীদের

দূর হিমালয়ের দুর্গম চরাঞ্চলে বিচরণরত ইয়াক কোথায় গেলআদৌ সুস্থ রয়েছে কি নাকিংবা অতিরিক্ত মানসিক চাপ বা শারীরিক সমস্যার লক্ষণ দেখা দিয়েছে কি না— এ বার সে সব তথ্য মিলবে প্রায় তাৎক্ষণিক ভাবে। শুধু তাই নয়আন্তর্জাতিক সীমান্তের দিকে কোনো প্রাণী চলে গেলে তাও জানতে পারবেন পালকেরা। এ লক্ষ্যেই ইন্টারনেট অব থিংসভিত্তিক একটি স্মার্ট স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ ও জিও-ফেন্সিং ব্যবস্থা তৈরি করেছেন অরুণাচলের ‘আইসিএআরন্যাশনাল রিসার্চ সেন্টার অন ইয়াক’ এবং অসম ডন বসকো বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা। গবেষকদের দাবিভারতের হিমালয় অঞ্চলে চমরী গাই পালনের ক্ষেত্রে এটি একটি উল্লেখযোগ্য প্রযুক্তিগত অগ্রগতি।

ইয়াককে দীর্ঘদিন ধরেই হিমালয়ের মানুষের জীবিকার অন্যতম ভরসা হিসেবে দেখা হয়। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৮ হাজার ফুট বা তারও বেশি উচ্চতায় বসবাসকারী এ প্রাণী দুধমাংসপশম এবং মালবাহী পরিবহণ— একাধিক ক্ষেত্রেই অপরিহার্য। লাদাখসিকিমঅরুণাচল প্রদেশহিমাচল প্রদেশ ও উত্তরাখণ্ডের বিস্তীর্ণ পার্বত্য এলাকায় এখনো ঐতিহ্যগতভাবে মুক্ত চরাঞ্চলভিত্তিক পদ্ধতিতে ইয়াক পালন করা হয়। ফলে দিনের পর দিন দুর্গম পাহাড়ে বিচরণকারী পশুর অবস্থান জানা বা অসুস্থতার প্রাথমিক লক্ষণ চিহ্নিত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে।

এ সমস্যার সমাধান করতেই তৈরি হয়েছে নতুন স্মার্ট ব্যবস্থা। গবেষকদের বক্তব্যইয়াকের শরীরে বসানো সেন্সর-সমৃদ্ধ ডিভাইসের মাধ্যমে প্রাণীর শরীরের বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় তথ্যচলাচলের ধরণ এবং অবস্থান নিরবচ্ছিন্ন ভাবে সংগ্রহ করা যাবে। সেসব তথ্য বিশ্লেষণ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে আগাম বোঝা সম্ভব হবে প্রাণীটি অতিরিক্ত চাপের মধ্যে রয়েছে কি নাঅসুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে কি না কিংবা স্বাভাবিক আচরণে কোনো পরিবর্তন এসেছে কি না। এর পাশাপাশি রয়েছে জিও-ফেন্সিং প্রযুক্তি। অর্থাৎনির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানা ডিজিটাল ভাবে নির্ধারণ করে দেওয়া হবে। ইয়াক সেই নির্ধারিত এলাকা ছেড়ে বাইরে চলে গেলেই সঙ্গে সঙ্গে সতর্কবার্তা পৌঁছে যাবে পালক বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে। বিশেষ করে চিন ও ভুটান সীমান্ত সংলগ্ন সংবেদনশীল এলাকায় এ প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।

আইসিএআর’–এর অধিকর্তা ড. মিহির সরকারের জানান, ‘উচ্চ হিমালয় অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের জীবিকার অন্যতম প্রধান অবলম্বন ইয়াক। কিন্তু বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা পশুর গতিবিধি নজরে রাখাপ্রাথমিক পর্যায়ে স্বাস্থ্যগত সমস্যা চিহ্নিত করা কিংবা সময়মতো চিকিৎসার ব্যবস্থা করা পালকদের কাছে অত্যন্ত কঠিন কাজ। নতুন প্রযুক্তি প্রাণীর স্বাস্থ্যমানসিক চাপ এবং অবস্থান সম্পর্কে তাৎক্ষণিক তথ্য দিয়ে দৈনন্দিন পাল ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর করে তুলবে।’ তিনি আরও বলেনহিমালয়ের ভৌগোলিক ও আবহাওয়াগত প্রতিকূলতার মধ্যে দাঁড়িয়ে মাঠপর্যায়ের প্রয়োজন মেনে প্রযুক্তি উদ্ভাবনই এখন সবচেয়ে জরুরি। সে লক্ষ্যেই এমন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল।

গবেষকদের মতেবহু সময় পশুগুলি দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে বা দলছুট হয়ে যায়। খারাপ আবহাওয়ায় তাদের খুঁজে বের করা যেমন কঠিনতেমনই অসুস্থতা ধরা পড়তেও দেরি হয়। নতুন ব্যবস্থায় এসব সমস্যার দ্রুত সমাধান করা সম্ভব হবে। সময়মতো চিকিৎসা সম্ভব হবে। কমবে প্রাণী হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও। সীমান্তবর্তী এলাকায় এ প্রযুক্তির কৌশলগত গুরুত্বও রয়েছে। মুক্ত চরাঞ্চলে চরতে গিয়ে অনেক সময় প্রাণীরা আন্তর্জাতিক সীমান্তের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। সে ক্ষেত্রে তাদের হারিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি চোরাশিকারের ঝুঁকিও থাকে। জিও-ফেন্সিংয়ের মাধ্যমে আগাম সতর্কবার্তা মিললে এ ধরনের পরিস্থিতি অনেকটাই এড়ানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে সীমান্তবর্তী এলাকায় অচেনা ব্যক্তির যাতায়াত নিয়েও নজরদারি সহজ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীরা।

২০তম প্রাণিসম্পদ গণনার তথ্য অনুযায়ী, ভারতে বর্তমানে প্রায় ৫৮ হাজার ইয়াক রয়েছে। তার মধ্যে প্রায় অর্ধেকই রয়েছে লাদাখে। বাকিরা অরুণাচল প্রদেশসিকিমহিমাচল প্রদেশ এবং উত্তরাখণ্ডে। পাহাড়ি অর্থনীতিতে এ প্রাণীর গুরুত্বের কথা মাথায় রেখেই সাম্প্রতিক সময়ে বিজ্ঞানীরা প্রযুক্তিনির্ভর পশুপালনের উপর জোর দিচ্ছেন। এ প্রকল্পে আইসিএআরন্যাশনাল রিসার্চ সেন্টার অন ইয়াক’-এর তরফে ছিলেন বিজ্ঞানী মোক্তার হুসেনবিজয় পাল, দিনামণি মেধি এবং কেন্দ্রের অধিকর্তা মিহির সরকার। অসম ডন বসকো বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে গবেষণায় অংশ নেন সহকারী অধ্যাপ রূপেশ মণ্ডলনুপুর চৌধুরী, গীতু দাস এবং জ্যোতি কুমার বর্মন।

গবেষণা কেন্দ্রের বক্তব্য, ‘এআই’, ‘ইন্টারনেট অব থিংস’, ‘এমবেডেড সিস্টেম এবং তথ্যপ্রযুক্তি উন্নয়নের ক্ষেত্রে অসম ডন বসকো বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতাই এ প্রকল্পের অন্যতম ভিত্তি। তাদের দাবি, অত্যাধুনিক স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ ও জিও-ফেন্সিং ব্যবস্থা শুধু ইয়াক পালনের ক্ষেত্রেই নয়ভবিষ্যতে ভারতের পার্বত্য অঞ্চলে প্রযুক্তিনির্ভর পশুপালন ব্যবস্থাপনার নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে। একই সঙ্গে টেকসই পশুপালনপ্রাণীকল্যাণ এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলে গবাদি পশু ব্যবস্থাপনায়ও নয়া প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে বলেই আশাবাদী বিজ্ঞানীরা।


  • Tags:
❤ Support Us
Advertisement
error: Content is protected !!