- এই মুহূর্তে দে । শ
- জুলাই ৮, ২০২৬
কেরালার ওয়ানাড় টানেল ভূমিধসে ৩ নিহত, ৫ নিখোঁজের খোঁজে জারি দ্বিতীয় দিনের তল্লাশি। ‘মানবসৃষ্ট বিপর্যয়’ তত্ত্বে তদন্তের নির্দেশ মুখ্যমন্ত্রীর
বিপর্যয়ের পর এক দিন কেটে গেলেও, ভয়াবহ ভূমিধসের অভিঘাত কাটিয়ে উঠতে পারেনি কেরালার ওয়ানাড়। টানেল সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের কাজ চলাকালীন ধসে এ পর্যন্ত ৩ পরিযায়ী শ্রমিকের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এখনো নিখোঁজ ৫ জন। তাঁদের উদ্ধারে বুধবারও চলছে জোরদার তল্লাশি অভিযান। প্রবল বৃষ্টি, পুরু কাদার স্তর এবং দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি উদ্ধারকাজকে আরও কঠিন করে তুলেছে। এরই মধ্যে ঘটনাকে ঘিরে শুরু হয়েছে দায় নির্ধারণের প্রক্রিয়া। রাজ্য সরকারের এক মন্ত্রী একে প্রাথমিক ভাবে ‘মানবসৃষ্ট বিপর্যয়’ বলে উল্লেখ করেছে। অন্যদিকে, নির্মাণকারী সংস্থা সে অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে। ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে বিস্তারিত তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন কেরালার মুখ্যমন্ত্রী ভি ডি সতীশন।
বুধবার সকালে ওয়ানাড়ের পুলিশ সুপার দেবমনোহর জানান, ভূমিধসে ৩ জনের মৃত্যুর ঘটনায় অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা রুজু করা হয়েছে। ইতিমধ্যেই তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। একই সঙ্গে নিখোঁজ ৫ জনের সন্ধানে চলছে ব্যাপক অনুসন্ধান। উদ্ধার অভিযানে মোতায়েন করা হয়েছে জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (এনডিআরএফ), দমকল ও উদ্ধারকারী বাহিনীর বিশেষ দল এবং মৃতদেহ অনুসন্ধানে প্রশিক্ষিত কুকুর। গোটা দুর্গত এলাকাকে চারটি সেক্টরে ভাগ করে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি, ধসের জেরে ভেসে যাওয়ার আশঙ্কায় নদীর নিম্নপ্রবাহের বিস্তীর্ণ অংশেও চলছে অনুসন্ধান।
উদ্ধারকাজে যুক্ত আধিকারিকেরা জানিয়েছেন, ধসের পরে বিপুল পরিমাণ কাদা ও পাথরের স্তূপ জমে রয়েছে ঘটনাস্থলে। চুরালমালার দিকে যাওয়ার রাস্তা পরিষ্কার করা গেলেও মূল নির্মাণস্থলে এখনো বিপুল কাদা সরানো সম্ভব হয়নি। নিখোঁজদের খোঁজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত ভারী যন্ত্র ব্যবহার করে ধ্বংসস্তূপ অপসারণও সম্ভব নয়। তার উপর টানা বর্ষণের কারণে মাটি নরম হয়ে থাকায় উদ্ধারকারী দলকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে কাজ করতে হচ্ছে। ঘটনার পর থেকেই প্রশ্ন উঠেছে, এ বিপর্যয় কি শুধুই প্রাকৃতিক, না কি নির্মাণকাজে গাফিলতির ফলেও এর ভয়াবহতা বেড়েছে।
মঙ্গলবার কেরলার বন ও বন্যপ্রাণ দফতরের মন্ত্রী টি. সিদ্দিক স্পষ্ট ভাষায় ঘটনাটিকে ‘মানবসৃষ্ট বিপর্যয়’ বলে উল্লেখ করে। একই অভিযোগ গণপূর্তমন্ত্রী পি কে বশীরের। অভিযোগ, জেলা প্রশাসন এবং গণপূর্তমন্ত্রীর তরফে বারবার নির্দেশ দেওয়া সত্ত্বেও নির্মাণস্থলে জমে থাকা বিপুল কাদা অপসারণ করা হয়নি। সরকারের মতে, সে জমে থাকা কাদাই ধসের অভিঘাতকে আরও মারাত্মক করে তুলেছে। তবে সমস্ত অভিযোগ খারিজ করেছে নির্মাণকারী সংস্থা। সংস্থার দাবি, ভূমিধস নির্মাণস্থলের অনেক উপরে হয়েছে। প্রকল্পের জন্য সংস্থাকে যে জমি বরাদ্দ করা হয়েছিল, সে অংশে ধস নামেনি। ফলে নির্মাণস্থলে জমে থাকা কাদা বিপর্যয়ের জন্য দায়ী নয় বলেই তাঁদের দাবি। যদিও উদ্ধারকাজে যুক্ত এক আধিকারিকের বক্তব্য, ধসের সূচনা নির্মাণস্থলের উপরের পাহাড়ি অংশে হলেও নীচে জমে থাকা কাদা কাদাধসের তীব্রতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। ফলে ধসের ধাক্কা আরও ভয়াবহ আকার নেয়। সে কারণেই প্রকৃত দায় নির্ধারণে প্রযুক্তিগত ও বৈজ্ঞানিক তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন প্রশাসনের একাংশ।
বুধবার সকালে, মুখ্যমন্ত্রী ভি ডি সতীশন জানান, ঘটনার প্রতিটি দিক খতিয়ে দেখতে রাজ্য সরকার বিস্তারিত তদন্ত করবে। তিনি বলেন, শুধু ভূমিধসের কারণ নয়, টানেল প্রকল্পের জন্য পরিবেশগত ছাড়পত্র দেওয়ার সময় কেন্দ্রীয় সরকার যে সমস্ত শর্ত ও নির্দেশিকা দিয়েছিল, নির্মাণকারী সংস্থা সেগুলি যথাযথ ভাবে মেনেছে কি না, তাও পরীক্ষা করা হবে। মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়েছেন, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত ওয়ানাড়-কে কোঝিকোড়ের সঙ্গে যুক্ত করার টানেল প্রকল্পের নির্মাণকাজ বন্ধ থাকবে। বুধবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে ভূমিধস-সংক্রান্ত সমস্ত রিপোর্ট পর্যালোচনা করার পরই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ণয়ে প্রয়োজনীয় সব আইনি ও প্রযুক্তিগত পদক্ষেপ গ্রহণেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।সতীশন আরও জানান, প্রাথমিক কিছু রিপোর্টে বলা হয়েছে, নির্মাণস্থলের উপরের অংশ থেকেই ভূমিধসের সূত্রপাত হয়েছিল। সে দাবিরও পৃথক ভাবে তদন্ত করা হবে। প্রকৃত ঘটনা সামনে না আসা পর্যন্ত কোনো সম্ভাবনাকেই উড়িয়ে দিতে চাইছে না কেরালার কংগ্রেস সরকার।
জানা যাচ্ছে, দুর্ঘটনায় মৃত তিন জনই পরিযায়ী শ্রমিক। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন মধ্যপ্রদেশের যন্ত্রচালক চন্দ্রবান, বিহারের সিভিল ফোরম্যান বিকাশ কুমার এবং ঝাড়খণ্ডের শ্রমিক আনমোল। আহত সাত জনের চিকিৎসা চলছে মেপ্পাডির উইমস হাসপাতালে। চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে তাঁদের। এদিকে, প্রবল বর্ষার মধ্যেই সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে উদ্ধার অভিযান। নিখোঁজ ৫ জন এখনো ধ্বংসস্তূপের নীচে চাপা পড়ে রয়েছেন বলে আশঙ্কা উদ্ধারকারী দলের। প্রশাসনের আশা, আবহাওয়া কিছুটা অনুকূলে এলে উদ্ধারকাজে গতি আসবে।
❤ Support Us






