- এই মুহূর্তে দে । শ
- জুলাই ৮, ২০২৬
আবর্জনার পাহাড়ের চাপে পুণের পুরসভা ভবনে ধস, ধ্বংসস্তূপে আটকে অন্তত ১৬ কর্মী ! গুজরাতে বৃষ্টির তাণ্ডবে মৃত ৯, জলমগ্ন সুরাট
টানা বর্ষণের জেরে যেন একের পর এক বিপর্যয়ের মুখে পশ্চিম ভারতের দুই রাজ্য। মহারাষ্ট্রের পুণেতে আবর্জনার পাহাড় ধসে তিনতলা প্রশাসনিক ভবন ভেঙে পড়ল। ধ্বংসস্তূপের নীচে অন্তত ১৬ জন কর্মী আটকে পড়েছেন বলে আশঙ্কা উদ্ধারকারীদের। অন্যদিকে, গুজরাতে অতি ভারী বৃষ্টিতে কার্যত বিপর্যস্ত সুরত। দু–দিনে বৃষ্টিজনিত ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে অন্তত ৯ জনের। হাজার হাজার মানুষ জলবন্দি। দুই রাজ্যেই যুদ্ধকালীন তৎপরতায় উদ্ধার ও ত্রাণকাজ চালাচ্ছে প্রশাসন।
বুধবার দুপুরে পুণের পিম্পরি-চিঞ্চওয়াড়ের মোশি এলাকায় ঘটে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। সেখানে পুরসভার ‘লেগাসি ওয়েস্ট, ডাম্পিং ইয়ার্ড’-এর পাশেই ছিল একটি তিনতলা প্রশাসনিক ভবন। ভবনটি পিম্পরি-চিঞ্চওয়াড় পুরসভার হয়ে বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণের কাজ করা একটি বেসরকারি সংস্থার দফতর হিসেবে ব্যবহৃত হতো। টানা ভারী বর্ষণের ফলে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা পাহাড়প্রমাণ আবর্জনার স্তূপ আচমকাই আলগা হয়ে ভূমিধসের মতো নেমে আসে। মুহূর্তের মধ্যে সেই বিশাল বর্জ্যের চাপ ভবনের উপর আছড়ে পড়ে। মুহূর্তেই ধসে পড়ে গোটা ভবন।
দুর্ঘটনার সময় ভবনের ভিতরে প্রায় ২০ জন কর্মী ছিলেন বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৪ জন কোনোক্রমে প্রাণ বাঁচিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন। কিন্তু অন্তত ১৫ থেকে ১৬ জন এখনো ধ্বংসস্তূপের নীচে আটকে রয়েছেন বলে আশঙ্কা প্রশাসনের। পিম্পরি-চিঞ্চওয়াড় পুরসভার কমিশনার বিজয় সূর্যবংশী জানিয়েছেন, ‘প্রাথমিক তদন্তে মনে হচ্ছে, গত দু–দিনের প্রবল বর্ষণে আবর্জনার স্তূপ আলগা হয়ে পড়েছিল। সে কারণেই তা ধসে প্রশাসনিক ভবনের উপর এসে পড়ে। ভবনের ভিতরে থাকা কয়েক জনের সঙ্গে আমরা যোগাযোগ স্থাপন করতে পেরেছি। উদ্ধারকাজ চলছে।’
খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (এনডিআরএফ), দমকল, পুলিশ, অ্যাম্বুল্যান্স এবং অন্যান্য জরুরি পরিষেবার কর্মীরা। ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে আটকে পড়াদের উদ্ধারে ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে এক দিকে বিপুল পরিমাণ আবর্জনা, অন্য দিকে অবিরাম বৃষ্টি; দুইয়ের জেরে উদ্ধারকাজে বাধা তৈরি হচ্ছে। পুরসভার কর্মকর্তা সঞ্জয় কুলকর্ণী জানান, প্রথম তলায় থাকা চার জন কর্মীকে ইতিমধ্যেই নিরাপদে উদ্ধার করা হয়েছে। কিন্তু নিচতলায় থাকা কর্মীরা ধ্বংসস্তূপের নীচে আটকে পড়েছেন। তাঁরা ভিতর থেকে সাহায্যের জন্য চিৎকার করছিলেন। সে খবর পাওয়ার পরই উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছয়।
এ ঘটনার পরই প্রশ্ন উঠেছে প্রশাসনিক ভবনটির অবস্থান ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে। পাহাড়সম পুরনো আবর্জনার স্তূপের একেবারে পাশে কী ভাবে একটি কর্মরত অফিস চালানো হচ্ছিল, তা নিয়েও শুরু হয়েছে বিতর্ক। ভবনটির নির্মাণমান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ। যদিও প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করা হবে। গত কয়েকদিনে মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রান্তেও বৃষ্টির জেরে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। বিশেষ করে পুণের অবস্থা ক্রমেই আরও খারাপ হচ্ছে। দিকে দিকে জলমগ্ন পরিস্থিতি। বন্ধ যান চলাচল থেকে রেল পরিষেবা।
এরই মধ্যে খড়কওয়াসলা বাঁধ পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় জল ছাড়া শুরু করেছে পুণের সেচ দফতর। বুধবার সকালে জল ছাড়ার পরিমাণ বাড়িয়ে ২৭,২০৩ কিউসেকে পৌঁছয়। ফলে নদী–তীরবর্তী একাধিক এলাকায় জল ঢুকতে শুরু করেছে। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে নদীর ধারের কয়েকটি রাস্তা বন্ধ রাখা হয়েছে। ইতিমধ্যেই প্রায় দেড় হাজার মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বুধবার, পুণের মেয়র মঞ্জুষা বাসিন্দাদের উদ্দেশে আবেদন জানিয়ে বলেন, বাঁধ থেকে আরও জল ছাড়া হতে পারে। তাই গাড়ি এবং মূল্যবান জিনিসপত্র দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, পশ্চিম ভারতে বর্ষার সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র এখন গুজরাতে। বিশেষ করে সুরাট শহর কার্যত জলের নীচে। আবহাওয়াবিদদের মতে, একসঙ্গে সক্রিয় পাঁচটি আবহাওয়া ব্যবস্থা দক্ষিণ গুজরাতে অস্বাভাবিক বর্ষণের পরিস্থিতি তৈরি করেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় রাজ্যের ১৯৫টি তালুকে বৃষ্টি হয়েছে। তার মধ্যে ছয়টি তালুকে ১০ ইঞ্চিরও বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সুরাট জেলা। সোমবারই শহরের কয়েকটি এলাকায় ১৯ ইঞ্চি পর্যন্ত বৃষ্টি রেকর্ড হয়েছে। সে সঙ্গে ভেঙে গিয়েছে ৮৫ বছরের পুরনো জুলাই মাসের বৃষ্টিপাতের রেকর্ড। টানা দু–দিনের বর্ষণে শহরের পাঁচটি প্রধান খালের মধ্যে চারটিই উপচে পড়েছে। জল ঢুকে পড়েছে আবাসন, বাজার, শিল্পাঞ্চল, বস্তি থেকে প্রধান সড়কে। শহরের অর্ধেকেরও বেশি এলাকা এখন জলমগ্ন। বহু জায়গায় যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে ‘এনডিআরএফ’ ও ‘এসডিআরএফ’ উদ্ধারকাজ চালাচ্ছে। সুরাট পুরসভা এবং জেলা প্রশাসনের সঙ্গে যৌথভাবে এখনো পর্যন্ত প্রায় ৪ হাজার জনকে উদ্ধার করে ত্রাণশিবিরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সেখানে খাবার, বিশুদ্ধ পানীয় জল, চিকিৎসা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় পরিষেবার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সরকারি হিসাবে, গত ২ দিনে সুরাটে বৃষ্টিজনিত ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে অন্তত ৯ জনের। আহত হয়েছেন আরও ৩ জন। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে রাজ্যজুড়ে ৩৬টি ‘এনডিআরএফ’ এবং ‘এসডিআরএফ’ দল মোতায়েন করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী ভূপেন্দ্র পটেল জরুরি বৈঠক করে জেলা প্রশাসনকে সর্বক্ষণ তৎপর থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় দায়িত্বপ্রাপ্ত সচিব ও মন্ত্রীদের অবিলম্বে পৌঁছে ত্রাণ ও পুনর্বাসনের কাজ তদারকির নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
আবহাওয়া দফতর আগামী ৪৮ ঘণ্টায় সুরাট-সহ দক্ষিণ গুজরাতের একাধিক জেলায় লাল সতর্কতা জারি করেছে। বজ্রবিদ্যুৎ, ঘণ্টায় ৬০ কিলোমিটার পর্যন্ত বেগে ঝোড়ো হাওয়া এবং অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে। রাজ্যের আরও কয়েকটি জেলায় জারি হয়েছে কমলা সতর্কতা। আবহাওয়াবিদদের আশঙ্কা, আগামী কয়েক দিনও বর্ষার দাপট অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে মহারাষ্ট্র ও গুজরাত— দুই রাজ্যই এই মুহূর্তে বিপদের মুখোমুখি।
❤ Support Us






