- এই মুহূর্তে দে । শ
- জুলাই ১০, ২০২৬
সীমান্তবর্তী অঞ্চলে ‘অস্বাভাবিক’ জনবিন্যাস বদলের নেপথ্যে অনুপ্রবেশ ! ‘ডেমোগ্রাফি মিশন’-এর আওতায় কঠোর পদক্ষেপের বার্তা শাহের
সীমান্তবর্তী এলাকায় জনবিন্যাসের চরিত্র বদলের মূল কারণ অনুপ্রবেশ। অবিলম্বে ‘পারাপার’ রুখতে প্রশাসনকে সতর্ক করলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। তাঁর স্পষ্ট বার্তা, সীমান্ত অঞ্চলে ‘অস্বাভাবিক কারণে’ জনবিন্যাসের যে পরিবর্তন ঘটছে, তা কোনো ভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। এ প্রবণতা দমনে কেন্দ্র সরকার কঠোর ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।
বৃহস্পতিবার দিল্লিতে দেশের স্থলসীমান্ত সংলগ্ন ১১৯টি জেলার পুলিশ সুপারদের নিয়ে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে শাহ বলেন, ‘সীমান্তবর্তী এলাকায় অস্বাভাবিক কারণে জনবিন্যাসের যে বদল হচ্ছে, তা কঠোর হাতে রুখতে বদ্ধপরিকর কেন্দ্র সরকার।’ বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নিত্যানন্দ রাই ও বান্ডি সঞ্জয় কুমার, বিভিন্ন সীমান্তবর্তী রাজ্যের পুলিশ মহাপরিচালক, জেলাগুলির পুলিশ সুপার, গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থার প্রতিনিধিরা। পশ্চিমবঙ্গের ১১টি সীমান্তবর্তী জেলার পুলিশ সুপার এবং রাজ্য পুলিশের ডিজি সিদ্ধিনাথ গুপ্তও বৈঠকে যোগ দেন। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব গোবিন্দ মোহন ও ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর ডিরেক্টর মহেশ দীক্ষিতও উপস্থিত ছিলেন।
এদিনের বৈঠকে মূল আলোচ্য বিষয় ছিল সীমান্ত নিরাপত্তা, অনুপ্রবেশ, মাদক পাচার, চোরাচালান এবং সীমান্তবর্তী এলাকায় জনবিন্যাসের পরিবর্তন। তবে সূত্রের দাবি, জনবিন্যাসের চরিত্র বদলের প্রশ্নটিই এ দিনের বৈঠকে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। পুলিশ সুপারদের উদ্দেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, কোথাও যদি জনসংখ্যার গঠনে অস্বাভাবিক পরিবর্তনের প্রবণতা দেখা যায়, অথবা কোনো এলাকার আদি বাসিন্দারা যদি চাপের মুখে নিজেদের ভিটেমাটি ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হন, তা হলে সে তথ্য অবিলম্বে প্রশাসনের নিম্নস্তর থেকে সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত পৌঁছে দিতে হবে। এ বিষয়ে কোনো ধরনের শিথিলতা বরদাস্ত করা হবে না বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
দীর্ঘ দিন ধরেই বিজেপি নেতৃত্ব দাবি করে আসছে, দেশের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলিতে, বিশেষ করে বাংলাদেশ ও মায়ানমারের সঙ্গে সীমান্ত ভাগ করে নেওয়া পূর্ব, উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন জেলায় গত কয়েক দশকে জনবিন্যাসের চরিত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটেছে। বিজেপির অভিযোগ, এ পরিবর্তন স্বাভাবিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফল নয়; এর পিছনে রয়েছে পরিকল্পিত অনুপ্রবেশ। গেরুয়া শিবিরের মতে, এ প্রবণতা কেবল সামাজিক বা রাজনৈতিক ভারসাম্য নয়, জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করছে। সে অবস্থানই এ দিন আরও জোরালো ভাবে তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। অমিত শাহ বলেন, সীমান্তবর্তী এলাকায় জনতাত্ত্বিক পরিবর্তনের প্রধান কারণ অনুপ্রবেশ। তাই সীমান্ত নিরাপত্তাকে আর শুধু সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কাজ হিসেবে দেখা হবে না। বরং সীমান্তরক্ষী বাহিনী, রাজ্য সরকার, জেলা প্রশাসন, কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এবং স্থানীয় জনগণকে একত্রিত করে চতুর্মুখী নিরাপত্তা বলয় বা ‘কোয়াড্রানগুলার সিকিউরিটি গ্রিড’ গড়ে তোলা হচ্ছে। তাঁর দাবি, এই নতুন কাঠামো ভারতের সীমান্ত ব্যবস্থাপনাকে প্রতিক্রিয়াশীল অবস্থান থেকে সক্রিয় ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থায় রূপান্তরিত করবে।
এ প্রেক্ষাপটেই উঠে আসে কেন্দ্রের নতুন ‘ডেমোগ্রাফি মিশন’-এর প্রসঙ্গ। গত বছরের স্বাধীনতা দিবসে লালকেল্লা থেকে ভাষণ দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রথম জনবিন্যাসের পরিবর্তন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তা খতিয়ে দেখার জন্য একটি বিশেষ মিশন গঠনের ঘোষণা করেন। সম্প্রতি, সেই ‘ডেমোগ্রাফি মিশন’ গঠিত হয়েছে। এর অধীনে একটি উচ্চস্তরীয় কমিটিও কাজ শুরু করেছে। ইতিমধ্যেই বিভিন্ন রাজ্যে সফর করে তথ্য সংগ্রহের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এদিন শাহ জানান, এই মিশনের প্রধান কাজ হলো সীমান্তবর্তী এলাকায় জনসংখ্যা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে কোন কোন অস্বাভাবিক কারণ কাজ করছে তা চিহ্নিত করা, পরিবর্তনের উৎস নির্ণয় করা এবং ভবিষ্যতে তা রোধ করার জন্য কার্যকর সুপারিশ করা। এদিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়ে দেন, কেন্দ্রীয় সরকার এমন একটি শক্তিশালী প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তুলতে চাইছে যাতে ভারতকে সম্পূর্ণ ভাবে অনুপ্রবেশমুক্ত করা সম্ভব হয়, ভবিষ্যতেও এ সম্ভাবনা যাতে ন্যূনতম পর্যায়ে নেমে আসে।
সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদারের ক্ষেত্রে প্রযুক্তিনির্ভর ‘স্মার্ট বর্ডার’ ব্যবস্থার উপরও বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তাঁর মতে, আগামী দিনের সীমান্ত সুরক্ষা কেবল কাঁটাতার বা মানবশক্তির উপর নির্ভর করবে না; বরং উন্নত প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর নজরদারি, সেন্সর, ড্রোন, ‘রিয়েল-টাইম’ তথ্য এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থার সমন্বয়ে গড়ে উঠবে নতুন সীমান্ত নিরাপত্তা কাঠামো। কেন্দ্রীয় সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান সীমান্ত মিলিয়ে প্রায় ৬ হাজার কিলোমিটার এলাকা ‘স্মার্ট বর্ডার’ প্রকল্পের আওতায় আনা হবে। এ প্রকল্পে নজরদারি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক এবং প্রযুক্তিনির্ভর করা হবে। পূর্ব ভারতের বিস্তীর্ণ অংশে সীমান্ত নির্ধারিত হয়েছে নদীকে কেন্দ্র করে। কিন্তু নদীর গতিপথ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সীমান্ত চিহ্নিতকরণ ও নজরদারির ক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়। সে বাস্তবতা মাথায় রেখেই উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর সীমান্ত ব্যবস্থাপনার উপর জোর দিচ্ছে কেন্দ্র। অমিত শাহ দাবি করেছেন, গত কয়েক বছরে সীমান্ত অবকাঠামো উন্নয়নে ৪০০ শতাংশ বৃদ্ধি ঘটানো হয়েছে। সীমান্তবর্তী এলাকায় রাস্তা, যোগাযোগ ব্যবস্থা, নজরদারি পরিকাঠামো ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ব্যাপক সম্প্রসারণ করা হয়েছে। তাঁর মতে, আগামী দিনে ভারতের সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা বিশ্বের অন্যতম আধুনিক এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থায় পরিণত হবে।
সীমান্ত অঞ্চলে বিদ্যমান নানা ধরনের নিরাপত্তা হুমকির কথাও উল্লেখ করেন তিনি। অনুপ্রবেশের পাশাপাশি মাদক পাচার, অস্ত্র চোরাচালান, সংগঠিত অপরাধচক্র, ড্রোনের মাধ্যমে বেআইনি কার্যকলাপ, সাইবার অপরাধ, উগ্রপন্থা ও আন্তঃসীমান্ত অপরাধের মতো বিষয়গুলি এখন সীমান্ত নিরাপত্তার সামনে বড়ো চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে জানান তিনি। তাঁর বক্তব্য, এসব হুমকিকে একসঙ্গে মোকাবিলা করতেই সীমান্ত নিরাপত্তার নতুন রূপরেখা তৈরি করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সীমান্তবর্তী অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের বিষয়েও গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি জানান, ‘ভাইব্র্যান্ট ভিলেজেস’ কর্মসূচির আওতায় সীমান্তবর্তী গ্রামগুলিতে কর্মসংস্থান, পরিকাঠামো উন্নয়ন, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং সরকারি প্রকল্পের শতভাগ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ চলছে। প্রধানমন্ত্রী মোদির ‘দেশের শেষ গ্রামই দেশের প্রথম গ্রাম’ ভাবনাকে সামনে রেখেই এ কর্মসূচি এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এর ফলে সীমান্ত অঞ্চল থেকে মানুষের অন্যত্র চলে যাওয়ার প্রবণতা কমবে, কৌশলগত ভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলি আরও শক্তিশালী হবে বলে মনে করছে কেন্দ্র।
ভারত-মায়ানমার সীমান্ত নিয়েও এদিন বড়ো পদক্ষেপের কথা ঘোষণা করেন শাহ। তিনি জানান, ১,৬১০ কিলোমিটার দীর্ঘ ভারত-মায়ানমার সীমান্তে প্রায় ৩১ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে বেড়া নির্মাণের কাজ এগিয়ে চলছে। কেন্দ্রের মতে, এ প্রকল্প অনুপ্রবেশ, মাদক পাচার, উগ্রপন্থী কার্যকলাপ এবং অন্যান্য আন্তঃসীমান্ত অপরাধ রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে। অমিত শাহ এ দিন আরও দাবি করেন, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে জম্মু-কাশ্মীরে সন্ত্রাসবাদ, উত্তর-পূর্ব ভারতে বিচ্ছিন্নতাবাদী কার্যকলাপ এবং নকশাল সমস্যা মোকাবিলায় উল্লেখযোগ্য সাফল্য এসেছে। সে অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়েই এখন সীমান্ত নিরাপত্তা, অনুপ্রবেশ রোধ এবং জনবিন্যাসের অস্বাভাবিক পরিবর্তন প্রতিরোধকে অগ্রাধিকারের তালিকায় রাখা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, দেশের উত্তর-পূর্ব, পূর্ব সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদারের ক্ষেত্রে এখন রাজনৈতিক সমন্বয়ের সুযোগও বেড়েছে। কারণ, সীমান্তবর্তী অধিকাংশ রাজ্যেই বর্তমানে বিজেপি বা বিজেপি-সমর্থিত সরকার রয়েছে। ফলে আন্তঃরাজ্য সমন্বয়, গোয়েন্দা তথ্য আদানপ্রদান এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত নীতির বাস্তবায়ন আরও সহজ হবে বলে মনে করছে কেন্দ্র। সূত্রের খবর, সীমান্ত দিয়ে নতুন করে অনুপ্রবেশ রোধ করার পাশাপাশি ইতিমধ্যেই ভারতে প্রবেশ করা অবৈধ বাংলাদেশি নাগরিকদের ‘পুশ ব্যাক’ বা ফেরত পাঠানোর বিষয়েও নীতিগত স্তরে জোর দিচ্ছে কেন্দ্র। যদিও এ বিষয়ে সরকারিভাবে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
❤ Support Us








