- এই মুহূর্তে দে । শ
- জুলাই ১০, ২০২৬
অমরনাথ যাত্রা শুরুর পাঁচ দিনের মধ্যেই গলে জল বরফের ‘শিবলিঙ্গ’। জলবায়ু পরিবর্তন না কি মানবিক হস্তক্ষেপ ?
মাত্র পাঁচ দিন। অথচ তাতেই কার্যত গলে জল হয়ে গেল বরফের ‘শিবলিঙ্গ’। ৫৭ দিনের দীর্ঘ অমরনাথ যাত্রা শুরু হওয়ার এক সপ্তাহও পেরোয়নি, তার মধ্যেই ‘বাবা বরফানি’-র দ্রুত সঙ্কোচন ঘিরে শুরু হয়েছে জোর বিতর্ক। এক দিকে রেকর্ড সংখ্যক তীর্থযাত্রীর ভিড়, অন্য দিকে হিমালয়ের ক্রমবর্ধমান উষ্ণতা— দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে পরিবেশবিদ, বিজ্ঞানী এবং প্রশাসনের সামনে নতুন করে উঠে এসেছে হিমালয়ের পরিবেশ রক্ষার প্রশ্ন।
গত বছরের পহেলগাঁও জঙ্গি হামলার পরে অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন, এ বারের অমরনাথ যাত্রায় ভক্তদের উপস্থিতি কমতে পারে। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে উল্টো ছবি। নিরাপত্তা ব্যবস্থার কড়াকড়ির মধ্যেও এ বছর যাত্রার শুরু থেকেই ভক্তদের ঢল নেমেছে। প্রথম চার দিনেই প্রায় ৯৩ হাজার তীর্থযাত্রী গুহামন্দিরে পৌঁছেছেন। প্রশাসনের দাবি, গত কয়েক বছরের তুলনায় এ বার দর্শনার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়েছে। চমকের মধ্যে ছিল বরফের ‘শিবলিঙ্গ’ দর্শন। কিন্তু যাত্রা শুরুর কয়েক দিনের মধ্যেই প্রায় ৯০ শতাংশ গলে গিয়েছে সেটি।
গত ২৩ মে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর তোলা একটি ছবিতে দেখা গিয়েছিল, অমরনাথ গুহার ভিতরে প্রায় সাত ফুট উচ্চতার বরফের ‘শিবলিঙ্গ’ দাঁড়িয়ে রয়েছে। এমনকি ৩ জুলাই যাত্রা শুরুর সময়ও তার উচ্চতা ছিল পাঁচ ফুটেরও বেশি। কিন্তু ৬ জুলাইয়ের মধ্যেই শিবলিঙ্গের প্রায় ৯০ শতাংশ অংশ বিলীন হয়ে গিযইয়েছে। বর্তমানে গুহার ভিতরের দৃশ্য দেখে অনেক ভক্তই হতাশ।এ পরিস্থিতিতে সরব হয়েছেন পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টির নেত্রী ইলতিজা মুফতি। গুহার সাম্প্রতিক ছবি সমাজমাধ্যমে প্রকাশ করে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন তীর্থযাত্রা পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে। তাঁর দাবি, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী প্রতিদিন নির্দিষ্ট সংখ্যার বেশি তীর্থযাত্রীকে গুহামন্দিরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া উচিত নয়। বাস্তবে সে সীমা মানা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার। পাশাপাশি তিনি দ্রুত একটি স্বাধীন তদন্তেরও দাবি জানিয়েছেন।
তবে শুধুমাত্র তীর্থযাত্রীর সংখ্যা বৃদ্ধি নয়, বিজ্ঞানীদের একাংশের মতে, এর নেপথ্যে আরও বড়ো কারণ রয়েছে। তাঁদের বক্তব্য, হিমালয় অঞ্চলে দ্রুত বাড়তে থাকা তাপমাত্রা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে অমরনাথ গুহার অভ্যন্তরীণ পরিবেশে। গুহার ছাদ থেকে ধীরে ধীরে জল পড়ে জমাট বেঁধেই প্রতি বছর বরফের নানান আকৃতি তৈরি হয়। কিন্তু তাপমাত্রা বৃদ্ধি, আর্দ্রতার পরিবর্তন ও তুষারপাতের ধরনে বদল আসায় সেই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া বিঘ্নিত হচ্ছে বলে মনে করছেন গবেষকরা। পরিবেশবিদদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি মানবিক কর্মকাণ্ডও সমান ভাবে দায়ী হতে পারে। গত দু–দশকে অমরনাথ যাত্রাকে আরও সহজ ও নিরাপদ করতে ব্যাপক পরিকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে। রাস্তা চওড়া করা হয়েছে, গুহার কাছাকাছি অস্থায়ী আবাসন ও লঙ্গরের সংখ্যা বেড়েছে, বিদ্যুৎ ও সৌর আলোর ব্যবস্থা সম্প্রসারিত হয়েছে। সম্প্রতি কেন্দ্র সরকার অমরনাথ রোপওয়ে প্রকল্পেও অনুমোদন দিয়েছে। শেশনাগ থেকে পঞ্চতরণী পর্যন্ত একটি সুড়ঙ্গ নির্মাণের প্রস্তাব নিয়েও আলোচনা চলছে।
সমালোচকদের মতে, এ সমস্ত বিপুল নির্মাণকাজ এবং মানুষের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি গুহার স্বাভাবিক ‘মাইক্রোক্লাইমেট’ বা ক্ষুদ্র জলবায়ুকে প্রভাবিত করতে পারে। গুহার আশপাশে যানবাহনের চলাচল, কৃত্রিম আলো, সিসিটিভি ক্যামেরা, নিরাপত্তা সরঞ্জাম এবং হাজার হাজার মানুষের শরীর থেকে উৎপন্ন তাপ— সব মিলিয়ে বরফের শিবলিঙ্গের স্থায়িত্ব কমে যেতে পারে।এ প্রেক্ষাপটে ‘শ্রী অমরনাথ বরফানি লঙ্গরস অর্গানাইজেশন’ (সাবলো) স্বাধীন বৈজ্ঞানিক তদন্তের দাবি তুলেছে। সংগঠনের বক্তব্য, শিবলিঙ্গ দ্রুত গলে যাওয়ার জন্য শুধুমাত্র আবহাওয়াকে দায়ী না করে সমস্ত সম্ভাব্য কারণ বৈজ্ঞানিক ভাবে পরীক্ষা করা উচিত। হিমবিজ্ঞানী, জলবায়ুবিজ্ঞানী, পরিবেশ বিশেষজ্ঞ এবং ভূতত্ত্ববিদদের নিয়ে বহুমাত্রিক কমিটি গঠনের আবেদনও জানানো হয়েছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, অমরনাথের বরফ প্রতি বছরই আকারে পরিবর্তিত হয়। কখনো তা দীর্ঘ সময় স্থায়ী থাকে, কখনও তুলনামূলক দ্রুত গলে যায়। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলিতে এই গলনের গতি যে ক্রমশ বাড়ছে, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞ মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ২০১৮ সালে ‘শিবলিঙ্গ’ গলতে সময় লেগেছিল ২৯ দিন। ২০২০ সালে ৩৮ দিন, ২০২২ সালে ২৮ দিন এবং ২০২৪ সালে প্রায় এক সপ্তাহের মধ্যেই তা সঙ্কুচিত হয়ে পড়েছিল। এ বছর সে সময়সীমাও কার্যত ভেঙে গেল। ধর্মীয় আবেগের জায়গা থেকেও এ ঘটনাকে ঘিরে নানা ব্যাখ্যা সামনে আসছে। বহু ভক্তের কাছে ‘বাবা বরফানি’-র দ্রুত অন্তর্ধান কেবল পরিবেশগত ঘটনা নয়, এক ধরনের অশনি সংকেত বলেও মনে হচ্ছে। যদিও বিশেষজ্ঞরা এ ধরনের ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত নন। তাঁদের মতে, বিষয়টি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক এবং বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখা উচিত।
তবে, প্রবল বিতর্কের মাঝে যাত্রা অবশ্য থেমে নেই। ৩ জুলাই শুরু হওয়া অমরনাথ যাত্রা চলবে আগামী ২৮ আগস্ট, রাখি পূর্ণিমা পর্যন্ত। কিন্তু পাঁচ দিনের মাথায় ‘পবিত্র বরফলিঙ্গ’-এর প্রায় বিলীন হয়ে যাওয়া নতুন করে মনে করিয়ে দিল, হিমালয়ের ভঙ্গুর পরিবেশকে উপেক্ষা করে উন্নয়ন ও তীর্থপর্যটনের ভারসাম্য রক্ষা করা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে। আর সে ভারসাম্য রক্ষা না করতে পারলে আগামী দিনে অমরনাথে বরফের অস্তিত্ব নিয়েই বড়ো প্রশ্নের মুখে পড়তে হতে পারে।
❤ Support Us







