Advertisement
  • দে । শ
  • জুলাই ১০, ২০২৬

২৯-এর লোকসভা ভোটের আগেই কার্যকর ‘এক দেশ, এক নির্বাচন’? ইঙ্গিত সংসদীয় কমিটির

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
২৯-এর লোকসভা ভোটের আগেই কার্যকর ‘এক দেশ, এক নির্বাচন’? ইঙ্গিত সংসদীয় কমিটির

স্বাধীনতার পর দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থায় সবচেয়ে বড়ো কাঠামোগত পরিবর্তনের পথে এগোচ্ছে কেন্দ্র২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগেই এক দেশএক নির্বাচন’ বা একযোগে লোকসভা ও বিধানসভা ভোটের প্রস্তাব বাস্তবায়নের সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিল সংসদের যৌথ কমিটি (জেপিসি)। শুক্রবার গোয়ায় কমিটির বৈঠকের ফাঁকে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে জেপিসি-র চেয়ারম্যান, রাজস্থানের পালি কেন্দ্রের বিজেপি সাংসদ পি পি চৌধুরী জানানদেশের বিভিন্ন প্রান্তে মতামত সংগ্রহের কাজ চলছে, এমন একটি গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়া তৈরির চেষ্টা হচ্ছেযাতে আগামী লোকসভা নির্বাচনের সময়ের মধ্যেই এই নির্বাচনী সংস্কার কার্যকর করা সম্ভব হয়। তাঁর দাবিএ পর্যন্ত যাঁদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছেতাঁদের প্রায় ৯৯ শতাংশই একযোগে নির্বাচনের পক্ষে মত দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেছেনদেশে বারবার নির্বাচন হওয়ার ফলে অর্থনীতির যে বিপুল ক্ষতি হচ্ছেতা রোধ করাও সংস্কারের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।

গোয়ায় দুদিনের বৈঠকে সংবিধান (১২৯তম সংশোধনী) বিল২০২৪ নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে সংসদীয় কমিটি। বৈঠকের প্রথম দিনেই গোয়ার মুখ্যমন্ত্রী প্রমোদ সাওয়ান্ত এবং তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় করে কমিটি। একযোগে নির্বাচন কার্যকর করতে কী কী সাংবিধানিকপ্রশাসনিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে এবং সেগুলির সম্ভাব্য সমাধান কী হতে পারেতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। পি পি চৌধুরী জানিয়েছেন, ‘গোয়ার মুখ্যমন্ত্রী  মন্ত্রিসভার সদস্যদের সঙ্গে আমাদের অনানুষ্ঠানিক বৈঠক হয়েছে। কী ভাবে এক দেশএক নির্বাচন’ বাস্তবায়ন করা যেতে পারেকী কী সমস্যা সামনে আসতে পারে, সেগুলি মোকাবিলার জন্যই বা কী ধরনের ব্যবস্থা প্রয়োজনতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। সব রাজনৈতিক দলের কাছে গ্রহণযোগ্য এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা চলছে।’

জেপিসি ইতিমধ্যেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গিয়ে মতামত সংগ্রহ করেছে। গুজরাটকর্নাটকমহারাষ্ট্রহিমাচল প্রদেশউত্তরাখণ্ড, পাঞ্জাবহরিয়ানা এবং দিল্লিতে সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞশিক্ষাবিদনাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে বৈঠক করেছে কমিটি। সে অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই জেপিসি-র চেয়ারম্যানের দাবিএকযোগে নির্বাচন নিয়ে নাগরিক সমাজের মধ্যে ব্যাপক সমর্থন রয়েছে। তিনি বলেন, ‘প্রায় ৯৯ শতাংশ অংশীজনবিশেষ করে নাগরিক সমাজ, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনএ প্রস্তাবের পক্ষে মত দিয়েছেন।’ যদিও বাস্তবায়নের নির্দিষ্ট সময়সীমা এখনও ঘোষণা করা হয়নিতবু চৌধুরীর বক্তব্যে স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলেছে যে ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের সময়ের মধ্যেই এই সংস্কার কার্যকর করার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে কমিটি। এমনকি তার আগেই কিছু রাজ্যকে একই নির্বাচনী চক্রে আনার সম্ভাবনার কথাও উড়িয়ে দেননি তিনি। তাঁর মতেযদি সংশ্লিষ্ট রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, রাজনৈতিক দলগুলি স্বেচ্ছায় সম্মত হয়তা হলে ধাপে ধাপে কয়েকটি রাজ্যের ভোটসূচি লোকসভা নির্বাচনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা যেতে পারে। তবে শুধুমাত্র সমর্থন থাকলেই যে পথ মসৃণতা নয়। দেশের বিভিন্ন রাজ্যের বিধানসভার মেয়াদ ভিন্ন সময়ে শেষ হয়। ফলে সব নির্বাচনকে একই ছাতার তলায় আনার জন্য প্রয়োজন হবে সাংবিধানিক সংশোধনরাজনৈতিক ঐকমত্য এবং প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস।

এক দেশএক নির্বাচন’-এর পক্ষে অর্থনৈতিক যুক্তিকেও সামনে এনেছেন পি পি চৌধুরী। প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দের নেতৃত্বে গঠিত উচ্চপর্যায়ের কমিটির কাছে জমা পড়া একটি সমীক্ষার উল্লেখ করে তিনি দাবি করেনদেশে আলাদা আলাদা সময়ে নির্বাচন হওয়ার ফলে প্রায় ৭ লক্ষ কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়। বিপরীতেএকযোগে নির্বাচন হলে অর্থনীতিতে সমপরিমাণ ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাঁর দাবি, ‘আজকের দিনে কোনো নির্বাচন আর শুধুমাত্র সেই রাজ্যের বিষয় নয়। দেশের যে কোনো প্রান্তে ভোট হলে তার প্রভাব অন্য রাজ্যের অর্থনীতিতেও পড়ে। কারণ অর্থনীতি এখন পরস্পরের সঙ্গে গভীর ভাবে যুক্ত।’ উদাহরণ হিসেবে তিনি গোয়ার পর্যটন শিল্পের কথা উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, দেশের কোনো রাজ্যে নির্বাচন চললেও তার প্রভাব গোয়ার পর্যটন ব্যবসায় পড়ে। আবার গোয়াতেই ভোট হলে পর্যটকদের আনাগোনা কমে যায়।

শুধু অর্থনীতি নয়প্রশাসনিক কাজকর্ম, শিক্ষাব্যবস্থার উপরেও ঘন ঘন নির্বাচনের নেতিবাচক প্রভাবের কথা তুলে ধরেছে কমিটি। তাদের বক্তব্যভোটার তালিকা সংশোধনপ্রশিক্ষণ এবং ভোটগ্রহণের কাজে নিয়মিত ভাবে শিক্ষকদের নিয়োগ করা হয়। এর ফলে সরকারি স্কুলে পাঠদানের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়। পি পি চৌধুরী বলেন, ‘সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় আর্থিক ভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারের ছাত্রছাত্রীরাযারা সরকারি বিদ্যালয়ের উপর নির্ভরশীল। দীর্ঘমেয়াদে এটি গুরুতর সামাজিক সমস্যা হয়ে উঠতে পারে।’  প্রশাসনের বড়ো অংশ দীর্ঘ সময় ধরে ভোট সংক্রান্ত কাজে ব্যস্ত থাকে। নির্বাচনী বিধিনিষেধ জারি হলে অনেক উন্নয়নমূলক প্রকল্পের কাজও মন্থর হয়ে যায়। ফলে নীতিনির্ধারণ  প্রকল্প বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়।

বিজেপি সাংসদের মতেপ্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভাবনায় এক দেশএক নির্বাচন’ শুধু একটি নির্বাচনী সংস্কার নয়বরং উন্নত ভারতের স্বপ্নপূরণের অন্যতম হাতিয়ার। তাঁর দাবিপ্রশাসনিক স্থিতিশীলতাব্যয় সাশ্রয় ও উন্নয়নমূলক কাজে ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে এ সংস্কার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। তবে এখনো পর্যন্ত বিষয়টি নিয়ে দেশজুড়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য গড়ে ওঠেনি। বিরোধী দলগুলির একাংশ কেন্দ্রের এ প্রস্তাবের তীব্র বিরোধীতা করে আসছে। কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি, ডিএমকে, সিপিআইএম সহ একাধিক রাজনৈতিক দলের দাবি, এই সংশোধন কার্যকর হলে দেশের যুক্তরাষ্ট্রীয় পরিকাঠামো ভেঙে পড়বে। কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপি ও তাদের সহযোগী দলগুলি রাজ্য ভোটে বাড়তি চাপ তৈরি করবে। রাজ্য ও কেন্দ্রের সরকার গঠনের ক্ষেত্রে নাগরিকদের ভিন্ন মত হারিয়ে যাবে। ফলে ধীরে ধীরে গোটা দেশ একদলীয় শাসন ব্যবস্থার দিকে যেতে পারে, যা ভারতের মতো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পক্ষে আত্মহননের শামিল।  


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!