- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- জুলাই ১০, ২০২৬
দেশজুড়ে শুরু ভোটার তালিকা সংশোধনের তৃতীয় পর্ব, পাহাড়-উপত্যকা বিভাজনের অভিযোগ মণিপুরে
দেশজুড়ে ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজে আরও এক ধাপ। ১৬টি রাজ্য এবং ৩টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ‘এসআইআর’-এর তৃতীয় পর্ব শুরু করার ঘোষণা করল কমিশন। কমিশনের দাবি, ভোটার তালিকাকে আরও নির্ভুল, হালনাগাদ ও স্বচ্ছ করে তোলাই এ কর্মসূচির প্রধান লক্ষ্য। এই পর্বে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে অন্ধ্রপ্রদেশ, অরুণাচল প্রদেশ, হরিয়ানা, ঝাড়খণ্ড, কর্ণাটক, মহারাষ্ট্র, মণিপুর, মেঘালয়, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড, ওড়িশা, পাঞ্জাব, সিকিম, ত্রিপুরা, তেলঙ্গানা এবং উত্তরাখণ্ড। পাশাপাশি জাতীয় রাজধানী অঞ্চল দিল্লি, চণ্ডীগড় এবং দাদরা ও নগর হাভেলি ও দমন-দিউতেও শুরু হচ্ছে এই বিশেষ সংশোধন প্রক্রিয়া।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার দেশের সমস্ত ভোটারের উদ্দেশে আবেদন জানিয়েছেন, তাঁরা যেন উৎসাহের সঙ্গে এ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন এবং নির্ধারিত গণনাপত্র বা ‘এনিউমারেশন ফর্ম’ পূরণ করেন। কমিশনের বক্তব্য, ভোটার তালিকার যথার্থতা নিশ্চিত করতে নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তৃতীয় পর্বের বিশাল কর্মসূচিতে সারা দেশে ৩.৯৪ লক্ষেরও বেশি বুথ লেভেল অফিসার (বিএলও) বাড়ি বাড়ি পৌঁছে যাবেন। তাঁদের লক্ষ্য ৩৬.৭৩ কোটি ভোটারের তথ্য যাচাই করা। এ কাজে রাজনৈতিক দলগুলির নিযুক্ত ৩.৪২ লক্ষ বুথ লেভেল এজেন্ট (বিএলএ) সহযোগিতা করবেন। কমিশনের মতে, ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক দলগুলির প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ স্বচ্ছতা বাড়াবে, ভবিষ্যতে বিতর্কের সম্ভাবনাও কমাবে।
এই পর্ব শেষ হলে কার্যত দেশের প্রায় সমস্ত অংশই বিশেষ নিবিড় সংশোধনের আওতায় চলে আসবে। এর আগের দুই পর্বে দেশের ১৩টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে প্রায় ৫৯ কোটি ভোটারকে অন্তর্ভুক্ত করে সংশোধনের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। প্রথম পর্বে একমাত্র বিহারে বিশেষ নিবিড় সংশোধনের কাজ সম্পূর্ণ হয়। দ্বিতীয় পর্বে অন্তর্ভুক্ত ছিল ছত্তিশগড়, গোয়া, গুজরাত, কেরালা, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, তামিলনাড়ু, উত্তরপ্রদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গ। পাশাপাশি আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ, লক্ষদ্বীপ এবং পুদুচেরিতেও এ প্রক্রিয়া চালানো হয়েছে। অন্যদিকে, আপাতত ‘এসআইআর’ প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা হয়েছে হিমাচল প্রদেশ, জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখকে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ওই অঞ্চলগুলিতে জনগণনার কাজ সম্পূর্ণ হওয়ার পর এবং তুষারাবৃত ও দুর্গম এলাকাগুলির আবহাওয়া পরিস্থিতি বিবেচনা করে পৃথক সময়সূচি ঘোষণা করা হবে।
এরই মধ্যে মণিপুরের ভোটার তালিকার সংশোধন ঘিরে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। সম্প্রতি প্রকাশিত ‘খসড়া তালিকা’-য় দেখা যাচ্ছে, রাজ্যের জনজাতি অধ্যুষিত পাহাড়ি বিধানসভা কেন্দ্রগুলিতে ভোটার বাদ পড়ার হার উদ্বেগজনক ভাবে বেশি। এ তথ্য সামনে আসতেই কুকি-জো এবং নাগা সংগঠনগুলি ‘পদ্ধতিগত বঞ্চনা’র অভিযোগ তুলেছে। অন্যদিকে, উপত্যকার রাজনৈতিক নেতৃত্বের একাংশের দাবি, ভোটার তালিকা শুদ্ধ করার জন্য এ প্রক্রিয়া জরুরি। ফলে দীর্ঘদিনের জাতিগত ও ভৌগোলিক বিভাজনে জর্জরিত মণিপুরে ভোটার তালিকা সংশোধনকে ঘিরেও নতুন করে সামাজিক ও রাজনৈতিক সংঘাতের আবহ তৈরি হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত খসড়ার তথ্য অনুযায়ী, ‘এসআইআর’ শুরুর আগে মণিপুরে মোট ভোটারের সংখ্যা ছিল ২০ লক্ষ ৯৩ হাজার ৭৬ জন। ৩০ মে থেকে ২৮ জুন পর্যন্ত চলা গণনা ও যাচাই পর্ব শেষে খসড়া তালিকায় ভোটারের সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ১৯ লক্ষ ৩৪ হাজার ৩৯৯। অর্থাৎ প্রাথমিক তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন ১ লক্ষ ৫৮ হাজার ৬৭৭ জন। শতাংশের হিসেবে যা মোট ভোটারের প্রায় ৭.৫৮। কিন্তু বিতর্কের সূত্রপাত অন্য জায়গায়। বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছে, রাজ্যের ১৯টি তফসিলি জনজাতি সংরক্ষিত বিধানসভা কেন্দ্র— যেগুলি মূলত পাহাড়ি অঞ্চলে অবস্থিত এবং যেখানে কুকি-জো ও নাগা সম্প্রদায়ের সংখ্যাধিক্য, সেখানেই বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা সর্বাধিক। মোট বাদ পড়া ১.৫৮ লক্ষ ভোটারের মধ্যে প্রায় ১.০২ লক্ষ, অর্থাৎ ৬৪.২ শতাংশই এই ১৯টি কেন্দ্রের বাসিন্দা। অথচ ‘এসআইআর’ শুরু হওয়ার আগে রাজ্যের মোট ভোটারের মাত্র ৩৭.৮ শতাংশ ওই কেন্দ্রগুলিতে বসবাস করতেন। এ পরিসংখ্যানই প্রশ্ন তুলে দিয়েছে গোটা প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে।
পাহাড়ি এলাকার বিভিন্ন জনজাতি সংগঠন ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিদের অভিযোগ, বাস্তুচ্যুত মানুষের বাস্তব পরিস্থিতিকে উপেক্ষা করেই বাড়ি-বাড়ি গিয়ে যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। ২০২৩ সালের জাতিগত সংঘর্ষের পর এখনও কয়েক হাজার মানুষ নিজেদের গ্রামে ফিরতে পারেননি। অনেকে রয়েছেন ত্রাণশিবিরে, কেউ বা আশ্রয় নিয়েছেন মিজোরাম, অসম কিংবা অন্য রাজ্যে। ফলে ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় বুথ স্তরের কর্মীরা তাঁদের খুঁজে পাননি। তার ফলেই বিপুল সংখ্যক নাম ‘খসড়া তালিকা’ থেকে বাদ পড়েছে। ‘কুকি ইনপি মণিপুর’-সহ একাধিক সংগঠনের বক্তব্য, সংঘাতের কারণে ঘরছাড়া হওয়া নাগরিকদের অনুপস্থিতিকে যদি ‘অচিহ্নিত’ বা ‘স্থানান্তরিত’ বলে চিহ্নিত করা হয়, তা হলে তা কার্যত তাঁদের নাগরিক অধিকার খর্ব করার সামিল। পাহাড়ি এলাকার প্রতিনিধিদের অভিযোগ, বর্তমান পরিস্থিতিতে কঠোর শারীরিক যাচাই প্রক্রিয়া চালু করা মানেই বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীকে প্রশাসনিক ভাবে বঞ্চিত করা।
অন্যদিকে, ইম্ফল উপত্যকার রাজনৈতিক নেতৃত্বের বড়ো অংশ এই সমালোচনা মানতে নারাজ। বিজেপি ও তাদের সমর্থক সংগঠনগুলির দাবি, বহু বছর ধরে ভোটার তালিকায় ভুয়ো নাম, মৃত ভোটার ও স্থানান্তরিত ব্যক্তিদের নাম রয়ে গিয়েছিল। ‘এসআইআর’ সেই অসঙ্গতি দূর করারই চেষ্টা করেছে। তাঁদের বক্তব্য, নির্বাচনী গণতন্ত্রের স্বচ্ছতা বজায় রাখতে নির্ভুল ভোটার তালিকা অপরিহার্য। ‘খসড়া তালিকা’য় নাম না থাকলেই যে কেউ স্থায়ী ভাবে ভোটাধিকার হারাচ্ছেন, এমন নয়। সংশোধনের সুযোগ এখনও খোলা রয়েছে। নির্বাচন কমিশনও একই আশ্বাস দিয়েছে। মণিপুরের মুখ্য নির্বাচন আধিকারিক অরুণ কুমার সিনহা জানিয়েছেন, খসড়া তালিকা চূড়ান্ত নয়। ৫ জুলাই থেকে ৪ আগস্ট পর্যন্ত দাবি ও আপত্তি জানানোর সুযোগ রয়েছে। যাঁদের নাম বাদ পড়েছে, তাঁরা ফর্ম-৬ জমা দিয়ে পুনরায় অন্তর্ভুক্তির আবেদন করতে পারবেন। সে জন্য রাজ্য জুড়ে ৬০ জন নির্বাচনী নথিভুক্তি আধিকারিক (ইআরও), ৮৪ জন সহকারী আধিকারিক (এএইরও) এবং প্রায় ৩ হাজার বুথ স্তরের কর্মীকে কাজে লাগানো হয়েছে। পাশাপাশি ১৯৫০ নম্বরে হেল্পলাইন চালু করা হয়েছে।
নির্বাচন আরও কমিশনের দাবি, সংঘর্ষের জেরে বাস্তুচ্যুত হওয়া নাগরিকদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন ত্রাণশিবিরে পৌঁছে ফর্ম সংগ্রহের জন্য জেলা নোডাল অফিসার নিয়োগ করা হয়েছিল। যাঁদের মূল পরিচয়পত্র হারিয়ে গিয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রেও কিছু নথি শিথিল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ত্রাণশিবিরের শংসাপত্র, সরকারি ত্রাণভোগীর তালিকায় নাম, ডিজিটালভাবে সংরক্ষিত আধার কিংবা পুরনো ভোটার পরিচয়পত্রের তথ্যকে গ্রহণযোগ্য নথি হিসেবে ধরা হচ্ছে। এমনকি প্রয়োজনে গ্রামপ্রধান বা গেজেটেড অফিসারের প্রত্যয়নপত্রও বিবেচনা করা হবে। তবে, খসড়ার পরিসংখ্যান বলছে, বাদ পড়া ভোটারদের বড়ো অংশকে ‘এএসডিডি’ বা ‘অনুপস্থিত, স্থানান্তরিত ও ডুপ্লিকেট’ শ্রেণিতে ফেলা হয়েছে। এ শ্রেণিতে রয়েছেন ১ লক্ষ ৮ হাজার ২৮৩ জন। এ ছাড়া প্রায় ৪৩ হাজার মৃত ভোটারের নাম তালিকা থেকে সরানোর সুপারিশ করা হয়েছে। ‘ভুয়ো’ ভোটার হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন ৭ হাজার ৩৯৪ জন। আবার ৯১ হাজারেরও বেশি নামের ক্ষেত্রে পুরনো নথি বা পারিবারিক তথ্যের সঙ্গে নির্ভরযোগ্য মিল পাওয়া যায়নি বলে প্রশাসনের দাবি।
জেলাভিত্তিক পরিসংখ্যানও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। চুরাচাঁদপুর ও ফেরজওয়াল জেলায় বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা ৩৮ হাজারেরও বেশি, যা রাজ্যে সর্বোচ্চ। তামেংলং, কাঙপোকপি, উখরুল ও কামজংয়ের মতো পাহাড়ি জেলাগুলিতেও বাদ পড়ার হার উল্লেখযোগ্য। অন্যদিকে ইম্ফল পশ্চিম ও ইম্ফল পূর্বে বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা যথাক্রমে ১৭ হাজার ও ১৬ হাজারের বেশি হলেও, সংশ্লিষ্ট জেলার মোট ভোটারের তুলনায় তার হার অনেক কম। ফলে, এখন নজর ৪ আগস্টের দিকে। ওই দিন শেষ হচ্ছে দাবি ও আপত্তি জানানোর সময়সীমা। তার পর যাচাই-বাছাইয়ের কাজ সম্পূর্ণ করে আগামী ৬ সেপ্টেম্বর মণিপুরের ‘চূড়ান্ত ভোটার তালিকা’ প্রকাশ করবে নির্বাচন কমিশন। তবে তার আগেই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে, মণিপুরে ভোটার তালিকার সংশোধন আর নিছক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নেই। জাতিগত সংঘর্ষ, বাস্তুচ্যুতি, জনসংখ্যাগত ভারসাম্য এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে তা রাজ্যের অন্যতম স্পর্শকাতর ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের আগেই এ নিয়ে অশান্তির পরিবেশ সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা ওয়াকিবহাল মহলের।
❤ Support Us





