- এই মুহূর্তে দে । শ
- জুলাই ১০, ২০২৬
দেশে প্রতিদিন বন্ধ হচ্ছে ১৩টির বেশি সরকারি স্কুল, বাড়ছে ড্রপআউটের সংখ্যা, উদ্বেগ কেন্দ্রীয় রিপোর্টে
দেশের সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থার সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে? কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রকের অধীনস্ত ‘ইউনিফায়েড ডিস্ট্রিক্ট ইনফরমেশন সিস্টেম ফর এডুকেশন প্লাস’ (ইউডিআইএসই+)-এর সর্বশেষ রিপোর্ট এবং নীতিআয়োগের সাম্প্রতিক সমীক্ষা সে উদ্বেগই আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, একদিকে, দেশজুড়ে সরকারি স্কুলে ছাত্রভর্তি ধারাবাহিকভাবে কমছে। অন্যদিকে, লাগাতার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে হাজার হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে সারা দেশে মোট ৪,৭৯১টি স্কুল বন্ধ হয়েছে। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন ১৩টিরও বেশি স্কুলে ঝাঁপ নেমেছে। আর গত এক দশকের হিসাব ধরলে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। নীতিআয়োগের তথ্য অনুযায়ী, ১০ বছরে দেশে ৯৪ হাজার সরকারি স্কুল বন্ধ হয়ে গিয়েছে। সে হিসাবে প্রতিদিন প্রায় ২৫টি স্কুল হারিয়ে গিয়েছে দেশের শিক্ষা মানচিত্র থেকে।
শিক্ষা মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে দেশে মোট স্কুলের সংখ্যা ছিল ১৪ লক্ষ ৭১ হাজার ৪৭৩। এক বছরের মধ্যেই তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৪ লক্ষ ৬৬ হাজার ৬৮২-এ। অর্থাৎ মাত্র এক বছরে প্রায় ৫ হাজার স্কুলের অস্তিত্ব মুছে গিয়েছে। সবচেয়ে বেশি স্কুল বন্ধ হয়েছে মধ্যপ্রদেশে। মোট ২,৪২৬টি স্কুল বন্ধ হয়েছে সে রাজ্যে, যা জাতীয় সংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি। তার পরে রয়েছে তেলঙ্গানা, যেখানে ১,৩৯২টি স্কুল বন্ধ হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে ৫৬৮টি, অন্ধ্রপ্রদেশে ৪৭৪টি, তামিলনাড়ুতে ৩৬৯টি, কর্ণাটকে ২৮১টি এবং হিমাচল প্রদেশে ২৬৬টি স্কুল বন্ধ হয়েছে। তবে সব রাজ্যের ছবি এক রকম নয়। কয়েকটি রাজ্যে স্কুলের সংখ্যা বেড়েছে। বিহারে নতুন করে ৯৪৬টি স্কুল যুক্ত হয়েছে। ছত্তিশগড়ে বেড়েছে ২৩৪টি এবং দিল্লিতে ৮৭টি স্কুল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, স্কুলের সংখ্যা বাড়লেও ওই রাজ্যগুলিতে ছাত্রভর্তি কমেছে। বিহারে এক বছরে ছাত্রসংখ্যা কমেছে ৪ লক্ষ ৩৭ হাজারেরও বেশি। ছত্তিশগড়ে প্রায় ৫০ হাজার এবং দিল্লিতে ৪৫ হাজারেরও বেশি ছাত্রছাত্রী কমেছে।
রিপোর্টে উঠে এসেছে আরও একটি তাৎপর্যপূর্ণ তথ্য। বহু বছর পর প্রথম বার কমেছে ‘জিরো এনরোলমেন্ট’ বা শূন্য-ভর্তি স্কুলের সংখ্যা। ২০২৪-২৫ সালে এমন স্কুলের সংখ্যা ছিল ৭,৯৯৩। চলতি শিক্ষাবর্ষে তা নেমে এসেছে ৫,৬৬৩-এ। কিন্তু এখানেও রয়েছে বিস্ময়কর বৈপরীত্য। এই স্কুলগুলিতে এখনো কর্মরত রয়েছেন ২০ হাজার ৬৬৭ জন শিক্ষক। এ তালিকায় সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে পশ্চিমবঙ্গ। এক বছরে রাজ্যে শূন্য-ভর্তি স্কুলের সংখ্যা বেড়েছে ৩২১। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে ৪,১৩৩টি স্কুলে এক জনও ছাত্রছাত্রী নেই। অথচ সেখানে কর্মরত রয়েছেন ১৯,৫০২ জন শিক্ষক। দেশের মোট শূন্য-ভর্তি স্কুলের সিংহভাগই পশ্চিমবঙ্গে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। উত্তরপ্রদেশেও একই প্রবণতা চোখে পড়েছে। সেখানে শূন্য-ভর্তি স্কুলের সংখ্যা ৮১ থেকে বেড়ে হয়েছে ৩১৩। শিক্ষক সংখ্যাও ৫৬ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭৭। ছত্তিশগড়ে গত বছর এমন কোনো স্কুল ছিল না। কিন্তু এ বছর ১৪৯টি স্কুলে একজনও ছাত্রছাত্রীও ভর্তি হয়নি, যদিও সেখানে ১৪০ জন শিক্ষক রয়েছেন।
অন্যদিকে নীতিআয়োগের রিপোর্ট আরও দীর্ঘমেয়াদি সঙ্কটের ছবি তুলে ধরেছে। ‘স্কুল এডুকেশন সিস্টেম ইন ইন্ডিয়া: টেম্পোরাল অ্যানালিসিস অ্যান্ড পলিসি রোডম্যাপ ফর কোয়ালিটি এনহ্যান্সমেন্ট’ শীর্ষক ওই সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০১৪-১৫ সালে গোটা দেশে সরকারি স্কুলের সংখ্যা ছিল ১১.০৭ লক্ষ। ২০২৪-২৫ সালে তা কমে হয়েছে ১০.১৩ লক্ষ। সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলের সংখ্যাও ৮৩ হাজার থেকে কমে ৭৯ হাজারে নেমেছে। বিপরীতে বেসরকারি স্কুলের সংখ্যা বেড়েছে ২.৮৮ লক্ষ থেকে ৩.৩৯ লক্ষে। একই সময়ে দেশের মোট ছাত্রভর্তি ২৬.৯৫ কোটি থেকে কমে হয়েছে ২৪.৬৯ কোটি। অর্থাৎ এক দশকে ২.২৬ কোটিরও বেশি ছাত্রছাত্রী শিক্ষা ব্যবস্থার বাইরে চলে গিয়েছে অথবা স্কুলে ভর্তি হয়নি। নীতিআয়োগ এর পিছনে জন্মহার হ্রাস, স্কুলমুখী জনসংখ্যা কমে যাওয়া এবং স্কুল একত্রীকরণের মতো কারণের কথা বললেও, শিক্ষা আন্দোলনকারীদের একাংশের দাবি, স্থানীয় স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়াই বহু শিশুকে শিক্ষার মূল স্রোত থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে।
বিশেষ করে মাধ্যমিক স্তরে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। রিপোর্ট বলছে, প্রাথমিক স্তরে ড্রপআউট হার মাত্র ০.৩ শতাংশ হলেও উচ্চ প্রাথমিক স্তরে তা ৩.৫ শতাংশ এবং মাধ্যমিকে ১১.৫ শতাংশে পৌঁছেছে। উচ্চ প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিকে উত্তরণের হারও গত দশকে ৯১.৫৮ শতাংশ থেকে কমে ৮৬.৬ শতাংশ হয়েছে। কেরালা ও পুদুচেরির মতো রাজ্যে এ হার প্রায় শতভাগ হলেও বিহার, ঝাড়খণ্ড, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, মেঘালয় এবং নাগাল্যান্ডের মতো রাজ্যে পরিস্থিতি অনেকটাই পিছিয়ে। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা স্পষ্ট হয়েছে সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষার ক্ষেত্রে। ২০২৩-২৪ থেকে ২০২৫-২৬ — দু বছরের মধ্যে সরকারি স্কুলে ছাত্রভর্তি কমেছে প্রায় ৮৬ লক্ষ। একই সময়ে বেসরকারি অনুদানবিহীন স্কুলে ছাত্রসংখ্যা বেড়েছে ৮৮ লক্ষেরও বেশি। শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থার উপর আস্থা কমা এবং পরিকাঠামোগত বৈষম্য এই পরিবর্তনের অন্যতম কারণ।
তবে সামগ্রিক চিত্রে কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে। দেশের স্কুলশিক্ষায় শিক্ষক সংখ্যা ১.০২ কোটির গণ্ডি ছাড়িয়েছে। গত তিন বছরে তা বেড়েছে ৮.৩ শতাংশ। ছাত্র-শিক্ষক অনুপাতও জাতীয় শিক্ষা নীতির নির্ধারিত মানের কাছাকাছি রয়েছে। কম্পিউটার, ইন্টারনেট, বিদ্যুৎ, শৌচাগার, পানীয় জল, গ্রন্থাগারের মতো মৌলিক পরিকাঠামোতেও উন্নতি হয়েছে। প্রায় ৭০ শতাংশ স্কুলে এখন কম্পিউটার রয়েছে, ৬৭ শতাংশেরও বেশি স্কুলে ইন্টারনেট সংযোগ পৌঁছেছে। রাজ্যভিত্তিক পরিকাঠামোর নিরিখে তামিলনাড়ু সবচেয়ে এগিয়ে। ৯৪.৪ শতাংশ স্কুলে কম্পিউটার, ৯৯ শতাংশে ইন্টারনেট এবং শতভাগ বিদ্যুৎ সংযোগ রয়েছে সেখানে। কেরালা, ওড়িশা, পাঞ্জাব, মহারাষ্ট্র শীর্ষ সারিতে। অন্যদিকে মেঘালয়, অরুণাচল প্রদেশ, মণিপুর, পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, নাগাল্যান্ড, বিহার, ঝাড়খণ্ড এখনো অনেকখানি পিছিয়ে রয়েছে।
কেন্দ্রের এই চাঞ্চল্যকর রিপোর্ট প্রকাশের পর রাজনৈতিক চাপানউতোরও শুরু হয়েছে। মধ্যপ্রদেশের বিরোধী দলনেতা উমাং সিংহর অভিযোগ, ‘দেশে যে দুটি স্কুল বন্ধ হচ্ছে, তার একটি মধ্যপ্রদেশে। শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।’ উত্তরপ্রদেশ কংগ্রেসও অভিযোগ করেছে, সরকারি শিক্ষা দুর্বল করে বেসরকারি স্কুলকে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। রাজস্থান কংগ্রেসের নেতা জিতেন্দ্র সিং আলওয়ার দাবি করেছেন, রাজ্যে এখনো ৭,২০০টি সরকারি স্কুল এক জন শিক্ষক দিয়ে চলছে এবং ১৪০টি স্কুলে কোনো ছাত্রছাত্রী নেই। শিক্ষাবিদদের একাংশের মতে, জন্মহার কমে যাওয়া ও জনসংখ্যার পরিবর্তন নিঃসন্দেহে একটি কারণ। কিন্তু একই সঙ্গে সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি আস্থা হ্রাস, গ্রামীণ অঞ্চলে স্কুল একত্রীকরণ এবং ক্রমবর্ধমান বেসরকারিকরণের প্রভাবও অস্বীকার করা যায় না। কারণ সরকারি স্কুলে ছাত্রসংখ্যা কমলেও বেসরকারি স্কুলে ভর্তির সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ কি ক্রমশ বাজারনির্ভর হয়ে উঠছে? আর সে পরিবর্তনের সবচেয়ে বড়ো মূল্য কি শেষ পর্যন্ত দিতে হবে নিম্নবিত্ত ও গ্রামীণ পরিবারের শিশুদেরই?
❤ Support Us







