Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • জুলাই ১৪, ২০২৬

স্কুল-কলেজের পাঠ্যক্রমে যৌন নিরাপত্তার পাঠ! সম্মতি থেকে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, নতুন সিলেবাসে সচেতনতায় জোর

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
স্কুল-কলেজের পাঠ্যক্রমে যৌন নিরাপত্তার পাঠ! সম্মতি থেকে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, নতুন সিলেবাসে সচেতনতায় জোর

দেশের স্কুল ও কলেজের পাঠ্যক্রমে শীঘ্রই অন্তর্ভুক্ত হতে চলেছে ‘কমপ্রিহেনসিভ সেক্স এডুকেশন’। সুপ্রিম কোর্টে দাখিল করা এক হলফনামায় কেন্দ্র সরকার জানিয়েছে, শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের যৌন স্বাস্থ্য, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, সম্মতি, সম্পর্ক এবং যৌন নির্যাতন সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক ও বয়স-উপযোগী শিক্ষা দেওয়ার লক্ষ্যে গঠিত ২৬ সদস্যের জাতীয় বিশেষজ্ঞ কমিটির সুপারিশ গ্রহণ করা হয়েছে। এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, যৌন নির্যাতন রোধ করা এবং সচেতনতা বৃদ্ধি।

প্রাথমিক স্তর থেকেই যৌন শিক্ষা শুরু করার পরামর্শ

সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, শুধুমাত্র নবম বা একাদশ শ্রেণি থেকে যৌন শিক্ষা শুরু করলে তা যথেষ্ট নয়। শিশুদের ছোটবেলা থেকেই বয়স অনুযায়ী উপযুক্ত শিক্ষা দেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে শরীর সম্পর্কে সচেতনতা, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এবং ‘গুড টাচ’ ও ‘ব্যাড টাচ’-এর পার্থক্য খুব অল্প বয়স থেকেই শেখানো উচিত বলে মত আদালতের।

আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বয়ঃসন্ধিকালে শরীরে ও মনে যে পরিবর্তন আসে, হরমোনজনিত পরিবর্তনের ফলে কী কী বিষয় সম্পর্কে সতর্ক থাকা দরকার এবং নিজের শরীরের প্রতি কীভাবে যত্নশীল হতে হবে—এসব বিষয়ে কিশোর-কিশোরীদের স্পষ্ট ধারণা থাকা জরুরি। আদালত আরও জানায়, সঠিক সময়ে সঠিক শিক্ষা না পাওয়ার কারণে অনেক সময় অজ্ঞতার বশে কিশোর-কিশোরীরা এমন কিছু কাজে জড়িয়ে পড়ে, যা পরে ‘পকসো’ আইনের আওতায় অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। তাই আগাম সচেতনতাই এ ধরনের পরিস্থিতি প্রতিরোধের অন্যতম উপায়।

মামলার প্রেক্ষাপট

এই মামলাটি দায়ের করা হয় চিকিৎসক ও সমাজকর্মী ডাঃ রুদ্রাণী দেবীর ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পর। আবেদনকারীদের দাবি ছিল, শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে যৌনতা, সম্মতি, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এবং যৌন নির্যাতন সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর জন্য সারা দেশে একটি অভিন্ন ও বৈজ্ঞানিক শিক্ষানীতি প্রয়োজন। সুপ্রিম কোর্টে কেন্দ্র জানিয়েছে, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রক এবং শিক্ষা মন্ত্রক যৌথভাবে এ প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ করছে। সে  উদ্দেশ্যে একটি ২৬ সদস্যের জাতীয় বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হয়েছিল, যারা ইতিমধ্যেই একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ জমা দিয়েছে। কেন্দ্র জানিয়েছে, সেই সুপারিশ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।

বিশেষজ্ঞ কমিটির গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ

বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রস্তাব অনুযায়ী—

  • স্কুল ও কলেজের পাঠ্যক্রমে ‘কমপ্রিহেনসিভ সেক্স এডুকেশন’ অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
  • শিশুদের জন্য যৌন নির্যাতন সম্পর্কে সচেতনতা বাধ্যতামূলক করা হবে।
  • বয়সভিত্তিক, বৈজ্ঞানিক ও তথ্যনির্ভর পাঠ্যক্রম তৈরি করা হবে।
  • শিক্ষকদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে, যাতে সংবেদনশীল বিষয়গুলি সঠিকভাবে পড়ানো যায়।
  • প্রাথমিক স্তরের শিশুদের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা এবং ‘গুড টাচ’ ও ‘ব্যাড টাচ’ সম্পর্কে সহজ ভাষায় শিক্ষা দেওয়া হবে।
  • স্কুল ও কলেজে সপ্তাহে অন্তত দু’দিন ১৫ থেকে ২০ মিনিটের বিশেষ সচেতনতামূলক সেশন নেওয়া হবে, যা পরিচালনা করবেন প্রশিক্ষিত বিশেষজ্ঞ শিক্ষক।
  • শুধু শিক্ষার্থীদের নয়, অভিভাবকদের জন্যও সচেতনতা কর্মসূচি ও বিশেষ সেশনের আয়োজন করা হবে, যাতে সন্তানদের শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন সম্পর্কে তারা ইতিবাচক ও স্বাভাবিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে পারেন।

নতুন পাঠ্যক্রমে কী কী বিষয় থাকবে?

প্রস্তাবিত ‘কমপ্রিহেনসিভ সেক্স এডুকেশন’ শুধুমাত্র প্রজনন প্রক্রিয়া বা যৌন সম্পর্কের শিক্ষা নয়; বরং শিশু ও কিশোরদের সার্বিক নিরাপত্তা ও সুস্থ বিকাশের বিষয়গুলিকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। সম্ভাব্য পাঠ্যসূচিতে থাকবে—

  • বয়ঃসন্ধিকালে শরীরের স্বাভাবিক পরিবর্তন
  • ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এবং ‘গুড টাচ-ব্যাড টাচ’
  • সম্মতির গুরুত্ব (Consent)
  • স্বাস্থ্যকর সম্পর্ক ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ
  • অনলাইন নিরাপত্তা ও সাইবার শোষণ থেকে সুরক্ষা
  • যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক তথ্য
  • শিশু যৌন নির্যাতনের লক্ষণ চিহ্নিত করা এবং অভিযোগ জানানোর পদ্ধতি

কেন এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ?

কেন্দ্রের মতে, ভারতে যৌন শিক্ষা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক সংকোচ ও নানা ট্যাবু রয়েছে। ফলে অনেক শিশু ও কিশোর-কিশোরী প্রয়োজনীয় তথ্য থেকে বঞ্চিত হয় এবং যৌন নির্যাতনের শিকার হলেও তা বুঝতে বা জানাতে পারে না। শুধুমাত্র ‘গুড টাচ’ ও ‘ব্যাড টাচ’-এর মধ্যে সচেতনতা সীমাবদ্ধ রাখলে সমস্যার পূর্ণ সমাধান হয় না। তাই বৈজ্ঞানিক ও বয়স-উপযোগী যৌন শিক্ষা চালু হলে শিশুদের আত্মরক্ষার ক্ষমতা বাড়বে এবং যৌন নির্যাতন প্রতিরোধে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ

সুপ্রিম কোর্ট এই উদ্যোগকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছে। আদালতের মতে, সঠিক যৌন শিক্ষার অভাবে সমাজে এবং সামাজিক মাধ্যমে শিশু যৌন নির্যাতনমূলক কনটেন্ট ছড়িয়ে পড়ছে এবং যৌন অপরাধের ঝুঁকিও বাড়ছে। শিশুদের যদি ‘সম্মতি’, ‘ব্যক্তিগত সীমারেখা’ এবং ‘পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ’-এর প্রকৃত অর্থ শেখানো যায়, তবে ভবিষ্যতে লিঙ্গসমতা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি যৌন অপরাধের ঘটনাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে।

শীঘ্রই চূড়ান্ত হবে নতুন সিলেবাস

কেন্দ্র জানিয়েছে, জাতীয় শিক্ষানীতি, ২০২০-এর নির্দেশিকা অনুসারে খুব শীঘ্রই ‘এনসিইআরটি’ নতুন পাঠ্যক্রমের চূড়ান্ত রূপরেখা তৈরি করবে। দীর্ঘদিনের বিতর্ক ও সামাজিক সংকোচ কাটিয়ে জাতীয় স্তরে ‘কমপ্রিহেনসিভ সেক্স এডুকেশন’-কে আলাদা ও বিস্তৃত পাঠ্যক্রম হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগকে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এই নতুন উদ্যোগের মাধ্যমে শিশুদের যৌন নির্যাতন প্রতিরোধ, নিরাপদ আচরণ, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, সম্মতির গুরুত্ব এবং বৈজ্ঞানিক তথ্যভিত্তিক শিক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আরও সচেতন, নিরাপদ ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়ক হবে।

 


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!