- দে । শ
- জুলাই ১৬, ২০২৬
উত্তর-পূর্বে উচ্চশিক্ষার নতুন দিশা? লিবারেল আর্টসকে ঘিরে বাড়ছে আগ্রহ, বলছেন শিক্ষাবিদরা
বহুদিন ধরেই উত্তর-পূর্ব ভারতের শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন ঘুরপাক খেয়েছে সরকারি চাকরি, সিভিল সার্ভিস, ডাক্তারি বা প্রকৌশলের মতো কয়েকটি নির্দিষ্ট পেশাকে কেন্দ্র করে। আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা, সীমিত শিল্পোন্নয়ন আর কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে সরকারি চাকরি ছিল নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা, আর্থিক স্থিতিশীলতার প্রতীক। ফলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষাগত আকাঙ্ক্ষাও আবর্তিত হয়েছে পরিচিত পথ ঘিরেই। কিন্তু বদলে যাচ্ছে সময়, বদলাচ্ছে অর্থনীতি, বদলাচ্ছে কর্মসংস্থানের চরিত্রও। সে পরিবর্তনের আবহে উত্তর-পূর্ব ভারতের তরুণ প্রজন্মের কাছে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে ‘লিবারেল আর্টস’ বা আন্তঃবিষয়ক শিক্ষা— এমনটাই মনে করছেন বহু শিক্ষাবিদ।
সম্প্রতি উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক, সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসকদের সঙ্গে বিস্তৃত মতবিনিময়ের পর এমন পর্যবেক্ষণ সামনে এনেছেন বেঙ্গালুরুর ‘ক্রাইস্ট ইউনিভার্সিটি’-র লিবারেল আর্টস বিভাগের শিক্ষকেরা। তাঁদের দাবি, লিবারেল আর্টস সম্পর্কে সচেতনতা এখনো সীমিত হলেও শিক্ষার্থীদের মধ্যে কৌতূহল আর আগ্রহ দুটোই লক্ষণীয়। বিশেষ করে বিভিন্ন শাখার বিষয় একসঙ্গে পড়ার সুযোগ তাদের আকৃষ্ট করছে। শিক্ষাবিদদের মতে, উত্তর-পূর্ব ভারত এখন গভীর সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং ভূ-রাজনৈতিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, সীমান্ত-বাণিজ্যের প্রসার, ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশ, নতুন শিল্পের উত্থান এবং উদ্যোক্তা সংস্কৃতির বিস্তারের ফলে কর্মক্ষেত্রের চাহিদাও দ্রুত বদলাচ্ছে। ফলে শুধু কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে জ্ঞান অর্জনই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, যোগাযোগ ক্ষমতা এবং বহুমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি। আর এ ক্ষেত্রেই লিবারেল আর্টস শিক্ষার গুরুত্ব বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, উত্তর-পূর্ব ভারতের ক্ষেত্রে এই শিক্ষাপদ্ধতির গুরুত্ব আরও বেশি। কারণ দীর্ঘদিন ধরে দেশের মূলধারার পাঠ্যক্রমে উত্তর-পূর্ব ভারতের ইতিহাস, সংস্কৃতি, ভাষা বা জ্ঞানচর্চার পর্যাপ্ত প্রতিফলন ঘটেনি। ফলে অঞ্চলটির বহু গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা ও বৌদ্ধিক ঐতিহ্য জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থার প্রান্তেই থেকে গিয়েছে। লিবারেল আর্টস শিক্ষার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো তার আন্তঃবিষয়ক চরিত্র। এ কাঠামোর মধ্যে উত্তর-পূর্ব ভারতের ইতিহাস, আদিবাসী জ্ঞানব্যবস্থা, ঔপনিবেশিক ও উত্তর-ঔপনিবেশিক অভিজ্ঞতা, পরিবেশ, সীমান্ত-রাজনীতি কিংবা সমকালীন সামাজিক প্রশ্নগুলি পাঠ্যক্রমের অংশ হয়ে উঠতে পারে। শিক্ষার্থীরা শুধু পাঠ্যবইয়ের তথ্য গ্রহণ করবে না, বরং নিজেদের সমাজ ও সংস্কৃতি নিয়ে গবেষণা, নথিবদ্ধকরণ, নতুন জ্ঞান উৎপাদনের ক্ষেত্রেও সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারবে।
শিক্ষাবিদদের বক্তব্য, উত্তর-পূর্ব ভারতের মতো অঞ্চলের জন্য লিবারেল আর্টসের সবচেয়ে বড়ো সম্ভাবনা এখানেই। দীর্ঘদিন যে অঞ্চল জাতীয় মেধা চর্চার আলোচনায় প্রান্তিক অবস্থানে ছিল, সে অঞ্চল জ্ঞান উৎপাদনের কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। স্থানীয় বাস্তবতা, লোকজ ঐতিহ্য আর মূলনিবাসী জ্ঞানভাণ্ডারকে ভিত্তি করে নতুন গবেষণা ও অ্যাকাডেমিক চর্চার সুযোগ তৈরি হতে পারে। ‘জাতীয় শিক্ষানীতি–২০২০’-ও এই পরিবর্তনের পক্ষে অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে। নীতিতে বহুমাত্রিক ও আন্তঃবিষয়ক শিক্ষার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। চার বছরের স্নাতক পাঠক্রম, ‘মেজর-মাইনর’ বিষয় নির্বাচনের সুযোগ, একাধিক ‘এক্সিট অপশন’ এবং গবেষণাভিত্তিক শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়ার ফলে লিবারেল আর্টস শিক্ষার প্রসারে নতুন গতি আসতে পারে। এ নীতির মূল দর্শন, জ্ঞানকে আর আলাদা আলাদা খণ্ডে ভাগ করে দেখা যাবে না। ভিন্ন ধারার শিক্ষাকে একক বৃহত্তর শিক্ষা পরিসরের মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। ভারতীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে এ ধারণার গভীর সম্পর্ক রয়েছে বলেও নীতিতে উল্লেখ রয়েছে। প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্য ‘কাদম্বরী’-তে বর্ণিত ‘চৌষট্টি কলা’র ধারণাকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলা হয়েছে, বহু জ্ঞানের সমন্বিত শিক্ষা বা ‘লিবারেল আর্টস’-ই একবিংশ শতাব্দীর জন্য সবচেয়ে উপযোগী মডেল।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও এ ধরনের শিক্ষার সম্ভাবনা ক্রমশ বাড়ছে। সিভিল সার্ভিস, সমাজকর্ম, প্রত্নতত্ত্ব, আর্কাইভ ও মিউজিয়াম, শিক্ষকতা, সাংবাদিকতা, জনসংযোগ, মিডিয়া, সম্প্রচার, বিনোদন শিল্প, অনুবাদ, কনটেন্ট রাইটিং, স্ক্রিপ্ট রাইটিং-সহ বহু ক্ষেত্রে এই শিক্ষার প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে। বর্তমানে দেশের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে লিবারেল আর্টস শিক্ষার পরিকাঠামো গড়ে উঠেছে। হরিয়ানার অশোকা ইউনিভার্সিটি, পুণের ‘ফ্লেম ইউনিভার্সিটি’, অন্ধ্রপ্রদেশের ‘ক্রিয়া ইউনিভার্সিটি’, বেঙ্গালুরুর ‘আজিম প্রেমজি ইউনিভার্সিটি’, ‘ও.পি. জিন্দল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটি’, ‘শিব নাদার ইউনিভার্সিটি’-সহ একাধিক প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের কোর্স ইতিমধ্যেই চালু রয়েছে। পূর্ব ভারতের ক্ষেত্রেও কলকাতার ‘অ্যাডামাস বিশ্ববিদ্যালয়’ লিবারেল আর্টস শিক্ষার পৃথক স্কুল গড়ে তুলেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, লিবারেল আর্টস শিক্ষার আরও একটি সুবিধা হলো এর নমনীয়তা। একজন শিক্ষার্থী একই সঙ্গে অর্থনীতি ও পরিবেশবিদ্যা, মনোবিজ্ঞান ও তথ্যবিজ্ঞান, দর্শন ও কম্পিউটার সায়েন্স কিংবা রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও ডেটা অ্যানালিটিক্সের মতো বিষয় একত্রে পড়তে পারে। ফলে ভবিষ্যতের বহুমাত্রিক কর্মক্ষেত্রের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া সহজ হয়।
তবে এ কথাও মনে রাখা দরকার যে, লিবারেল আর্টস চিকিৎসাবিজ্ঞান বা প্রকৌশলের মতো পেশাগত শিক্ষার বিকল্প নয়। এটি এমন শিক্ষার্থীদের জন্যই উপযুক্ত, যারা একাধিক বিষয়ে আগ্রহী, গবেষণামুখী, সমালোচনামূলক চিন্তায় দক্ষ এবং বিশেষায়নের আগে বিভিন্ন ক্ষেত্র সম্পর্কে বিস্তৃত ধারণা অর্জন করতে চান। যেমন, একজন ইতিহাসের ছাত্র যদি মিডিয়া স্টাডিজ, বিজনেস অ্যানালিটিক্স, ডেটা সায়েন্স বা অর্থনীতির মতো বিষয় পড়ে, তবে তার কর্মক্ষেত্রের পরিধি অনেক বেড়ে যায়। একই ভাবে অর্থনীতির ছাত্র আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বা জননীতি পড়লে আন্তর্জাতিক সংস্থা, ব্যবসায়িক সাংবাদিকতা বা নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে কাজের সুযোগ পেতে পারে। সাংবাদিকতার শিক্ষার্থী ইতিহাস বা জনপ্রশাসন পড়লে সমাজ ও প্রশাসন সম্পর্কে আরও গভীর ধারণা অর্জন করতে পারে। সমাজবিজ্ঞান, সমাজকর্ম, পর্যটন, ঐতিহ্য সংরক্ষণ, পরিবেশবিদ্যা, শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন, জননীতি, যোগচর্চা, নৈতিক শিক্ষা— এ ধরনের বহু বিষয়কেও স্বাধীন শিক্ষাক্ষেত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার উপর জোর দেওয়া হচ্ছে। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এ শিক্ষাব্যবস্থা চালু করতে সব ক্ষেত্রে নতুন পরিকাঠামো নির্মাণের প্রয়োজন নেই। বিদ্যমান কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলির পাঠ্যক্রম পুনর্গঠন এবং আন্তঃবিষয়ক কাঠামো গ্রহণের মাধ্যমেই অনেক ক্ষেত্রে লিবারেল আর্টস মডেল চালু করা সম্ভব বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদেরা।
❤ Support Us







