- দে । শ
- জুলাই ১৭, ২০২৬
বর্ষার আদ্রতায় ‘দূষিত’ হচ্ছে ইথানল মিশ্রিত পেট্রোল ? জ্বালানির মান ঘিরে পাম্প মালিকদের অভিযোগে নতুন বিতর্ক
বর্ষার জল, ভেজা মাটি আর আর্দ্রতায় দূষিত হচ্ছে বিতর্কিত ‘ই-২০’ পেট্রোল ? দেশের বিভিন্ন প্রান্তে, বিশেষ করে উপকূলবর্তী এলাকায়, পেট্রোল পাম্প মালিকদের একাংশের দাবি ঘিরে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে ইথানল মিশ্রিত জ্বালানি নিয়ে। তাঁদের অভিযোগ, ‘ই-২০’ পেট্রোলে থাকা ইথানলের জল শোষণ করার স্বাভাবিক প্রবণতা বর্ষাকালে জ্বালানির মান নষ্ট করে দিতে পারে। আর তার ফলেই কখনো কখনো গাড়িতে বিশুদ্ধ জ্বালানির বদলে জল-মিশ্রিত ইথানল পৌঁছে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
দেশ জুড়ে ‘ই-২০’ বা ২০ শতাংশ ইথানল মিশ্রিত পেট্রোল ঘিরে বিতর্কের শেষ নেই। কোথাও এ জ্বালানির ফলে গাড়ির ইঞ্জিন খারাপ হয়ে যাওয়ার অভিযোগ, কোথাও মাইলেজ কমে যাওয়ার অভিযোগ। কেউ কেউ কেন্দ্রের বিরুদ্ধে জোর করে ‘খারাপ তেল’ চাপিয়ে দেবার অভিযোগ তুলছেন। সমালোচকদের কেউ কেউ আবার আরেকধাপ এগিয়ে সরাসরি অভিযোগ তুলেছেন কেন্দ্রীয় সড়ক-পরিবহণ মন্ত্রীর বিরুদ্ধে। তাঁদের দাবি, দেশের ইথানল উদপাদনের বৃহৎ অংশ কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর ছেলের আওয়াধীন। ব্যক্তিগত স্বার্থে, কোনোরকম পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়াই দেশের আমজনতার উপর জোর করে মিশ্রিত জ্বালানি চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এরইমধ্যে পেট্রল পাম্পের মালিকদের নতুন অভিযোগ শোরগোল ফেলে দিয়েছে।
সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিওতে দেখা গিয়েছে, পেট্রোল পাম্পের নোজ়ল থেকে জ্বালানির বদলে কাদাযুক্ত বা জল মেশানো তরল বেরোচ্ছে। পেট্রোল পাম্প মালিকদের বক্তব্য, সমস্যার সূত্রপাত ভূগর্ভস্থ জ্বালানি সংরক্ষণ ট্যাঙ্কে। বৃষ্টির জল চুঁইয়ে ঢোকা, বাতাসের আর্দ্রতা ঘনীভূত হওয়া কিংবা ট্যাঙ্কারে জ্বালানি সরবরাহের সময় সামান্য পরিমাণ জল মিশে যাওয়া— এমন নানা কারণে ট্যাঙ্কের ভিতরে জল জমতে পারে। সাধারণ পেট্রোলের ক্ষেত্রে যা তুলনামূলকভাবে কম সমস্যার সৃষ্টি করত, ‘ই-২০’-এর ক্ষেত্রে তা বড়োসড়ো উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে বলে দাবি তাঁদের।
বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা, ইথানল অত্যন্ত ‘হাইগ্রোস্কোপিক’, অর্থাৎ জলকে সহজে নিজের সঙ্গে টেনে নেয়। ফলে ট্যাঙ্কে জলের পরিমাণ নির্দিষ্ট মাত্রার বেশি হয়ে গেলে ইথানল আর পেট্রোলের সঙ্গে সমভাবে মিশে থাকে না। বরং জলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আলাদা স্তর তৈরি করে। এ প্রক্রিয়াকেই বলা হয় ‘ফেজ সেপারেশন’। তখন ইথানল-জলের মিশ্রণ ট্যাঙ্কের নিচে জমে যায় ও পেট্রোল উপরে ভেসে থাকে। সমস্যা আরও জটিল হয়ে ওঠে কারণ, অধিকাংশ জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা ট্যাঙ্কের নীচের অংশ থেকেই জ্বালানি টেনে নেয়। ফলে কোনো গাড়িতে যদি ওই তলায় জমে থাকা ইথানল-জল মিশ্রণ পৌঁছে যায়, তা হলে ইঞ্জিন স্টার্ট নিতে সমস্যা হতে পারে, চলন্ত গাড়ি আচমকা বন্ধ হয়ে যেতে পারে অথবা কিছু দূর যাওয়ার পর গাড়ি বিকল হয়ে পড়তে পারে। পাম্প মালিকদের দাবি, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গ্রাহক অভিযোগ জানাতে ফিরে না আসা পর্যন্ত তাঁরা সমস্যার কথা জানতেই পারেন না।
উপকূলবর্তী এলাকায় ঝুঁকি আরও বেশি বলে মনে করছেন ডিলারদের একাংশ। তাঁদের মতে, সমুদ্রঘেঁষা অঞ্চলে মাটির নীচের জলস্তর তুলনামূলকভাবে বেশি হওয়ায় ভূগর্ভস্থ ট্যাঙ্কে জল প্রবেশের সম্ভাবনাও বেশি। ট্যাঙ্কের সিল বা জয়েন্টে সামান্য ত্রুটি থাকলেও সেখান থেকে আর্দ্রতা ঢুকে পড়তে পারে। এর ফলে নয়া জ্বালানিতে স্তর-বিচ্ছিন্নতার আশঙ্কা আরও বেড়ে যায়। কিছু ডিলার আবার দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামোগত সমস্যার আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন। তাঁদের দাবি, ইথানল জল শোষণ করায় ভূগর্ভস্থ স্টিলের ট্যাঙ্ক ও পাইপলাইনে ক্ষয় বাড়তে পারে। যদিও তেল বিপণন সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই বেশ কিছু সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ‘ই-২০’ চালুর আগে বহু পাম্পে সিল, ওয়াশার এবং অন্যান্য যন্ত্রাংশ ‘নিওপ্রিন রাবার’ দিয়ে বদলে ফেলা হয়েছে।
পাম্প মালিকদেরও দাবি, জ্বালানিতে জল মেশার সম্ভাবনা রুখতে নজরদারিও অনেক বাড়ানো হয়েছে। জল শনাক্তকারী বিশেষ পেস্ট লাগানো ‘ডিপস্টিক’ দিয়ে ভূগর্ভস্থ ট্যাঙ্ক পরীক্ষা করার নির্দেশ রয়েছে। সাধারণ সময়ে দিনে তিন বার পরীক্ষা হলেও বর্ষাকালে তা বাড়িয়ে প্রায় প্রতি দু–ঘণ্টায় এক বার করা হচ্ছে। কোথাও জল ধরা পড়লে সংশ্লিষ্ট তেল সংস্থাকে খবর দেওয়া হয় , তাদের কর্মীরা এসে ট্যাঙ্ক থেকে জল বের করে দিচ্ছেন। তবে এখানেই আর এক অসন্তোষ। ডিলারদের অভিযোগ, দূষিত জ্বালানি ফেলে দিতে হলে আর্থিক ক্ষতির বোঝা তাঁদেরই বইতে হযচ্ছে। এক পাম্প মালিকের দাবি, সম্প্রতি তাঁকে প্রায় ৬০০ লিটার জ্বালানি বাতিল করতে হয়েছে। অন্যদের ক্ষেত্রে সে ক্ষতির পরিমাণ কয়েক হাজার লিটার পর্যন্ত পৌঁছেছে। দূষিত ইথানল-জল মিশ্রণ কী ভাবে পরিবেশবান্ধব উপায়ে নিষ্পত্তি করা হবে, সে সম্পর্কেও স্পষ্ট নির্দেশিকা চেয়েছেন তাঁরা।
এ দিকে, পেট্রোল পাম্পে ‘ই-২০’ সংক্রান্ত তথ্য প্রদর্শন নিয়েও নতুন অভিযোগ উঠেছে। কিছু ডিলারের দাবি, তাঁরা গ্রাহকদের সচেতন করতে পাম্পে বোর্ড লাগিয়েছিলেন যে, সেখানে ‘ই-২০’ পেট্রোল বিক্রি হচ্ছে, এটি সরকারি নীতির অংশ। কিন্তু তেল বিপণন সংস্থাগুলি সে বোর্ড সরিয়ে ফেলতে নির্দেশ দিয়েছে বলে অভিযোগ। যদিও এ দাবির স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা যায়নি। সমস্ত অভিযোগের প্রেক্ষিতে ‘ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশন’ (আইওসিএল) স্পষ্ট জানিয়েছে, জ্বালানির গুণমান নিয়ে তাদের ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি রয়েছে। সংস্থার দাবি, নিয়মিত পরিদর্শন, আকস্মিক অভিযান ও বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার মাধ্যমে তারা জ্বালানির মান পর্যবেক্ষণ করে। গত এক সপ্তাহে ১০ হাজারের বেশি আকস্মিক পরিদর্শন করে সাড়ে আট হাজারেরও বেশি গুণমান পরীক্ষা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থা। কোনো পাম্পে দূষণ, ভেজাল বা মান লঙ্ঘনের প্রমাণ মিললে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয় বলেও দাবি ‘আইওসিএল’-এর।
তবে এ বিতর্ক নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে ‘ই২০’ চালু করবার পরিকাঠামো প্রস্তুতি নিয়ে। এত দিন পর্যন্ত আলোচনা মূলত আবর্তিত হয়েছে গাড়ির ইঞ্জিন নয়া জ্বালানির উপযোগী কি না, তা নিয়ে। কিন্তু পাম্প মালিকদের সাম্প্রতিক অভিযোগ সে বিতর্ককে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিয়েছে। এখন প্রশ্ন উঠছে, ভারতের বিপুল জ্বালানি অবকাঠামো কি সত্যিই উচ্চ ইথানল-সমৃদ্ধ পেট্রোল সংরক্ষণের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত? বিশেষ করে বর্ষা-প্রবণ ও উপকূলবর্তী অঞ্চলে, যেখানে প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে প্রতিদিন জ্বালানি পৌঁছে দিতে হয় লক্ষ লক্ষ গাড়িচালকের কাছে। সরকারের উচ্চাভিলাষী ইথানল মিশ্রণ কর্মসূচি দেশের জ্বালানি আমদানির বিল কমাতে এবং কৃষকদের জন্য নতুন বাজার তৈরি করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। কিন্তু সে কর্মসূচির দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করবে জ্বালানির গুণমান রক্ষা, আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা , গাড়ির প্রযুক্তি বৃদ্ধি ও গ্রাহকদের আস্থা অটুট রাখার উপর, এমনটাই মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহলের একাংশ।
❤ Support Us





