Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • জুলাই ১৭, ২০২৬

উচ্চশিক্ষার আলো ম্লান ? দেশের অন্যতম সেরা বিজ্ঞান বৃত্তিতে অনিশ্চয়তা, উদ্বেগে দেশের মেধাবী পড়ুয়ারা

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
উচ্চশিক্ষার আলো ম্লান ? দেশের অন্যতম সেরা বিজ্ঞান বৃত্তিতে অনিশ্চয়তা, উদ্বেগে দেশের মেধাবী পড়ুয়ারা

দ্বাদশ শ্রেণির পরীক্ষায় রাজ্যের সেরা ফল। হাতে এসেছে দেশের নামী বিজ্ঞান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ। বাড়ির আর্থিক সামর্থ্য সীমিত হলেও ভরসা ছিল একটি সরকারি বৃত্তির উপর। সে ভরসার নাম— ‘ইনোভেশন ইন সায়েন্স পারস্যুট ফর ইনস্পায়ার্ড রিসার্চ (ইনস্পায়ার)-এর অধীন উচ্চশিক্ষা বৃত্তি প্রকল্প। অথচ চলতি বছরে ওই বৃত্তির বিজ্ঞপ্তিই প্রকাশিত হয়নি। কবে হবেআদৌ হবে কি নাতা নিয়েও নেই কোনো সরকারি স্পষ্টীকরণ। ফলে দেশের হাজার হাজার মেধাবী বিজ্ঞান পড়ুয়াদের ভবিষ্যৎ প্রবল অনিশ্চয়তার মুখে।

কেন্দ্রের ‘বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রক’-এর অধীনস্থ ডিপার্টমেন্ট অফ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি’-র অন্যতম প্রধান প্রকল্প  ইনস্পায়ার শি’ দীর্ঘদিন ধরেই দেশের মেধাবী বিজ্ঞান শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষায় উৎসাহিত করার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। প্রতি বছর প্রায় ১২ হাজার পড়ুয়াকে এই প্রকল্পের আওতায় বছরে ৮০ হাজার টাকা করে বৃত্তি দেওয়া হয়। দ্বাদশ শ্রেণির বোর্ড পরীক্ষায় শীর্ষ এক শতাংশের মধ্যে থাকা ছাত্রছাত্রী অথবা জেইই-সহ নির্দিষ্ট জাতীয় স্তরের প্রবেশিকা পরীক্ষার মাধ্যমে দেশের শীর্ষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়া পড়ুয়ারা এ বৃত্তির জন্য যোগ্য বলে বিবেচিত হন।

সাধারণত সেপ্টেম্বর মাস নাগাদ আবেদন প্রক্রিয়া শুরু হয়। কলেজে ভর্তি ও বিভিন্ন প্রবেশিকা পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর ছাত্রছাত্রীরা আবেদন করেন। অক্টোবর-নভেম্বরের মধ্যে আবেদন গ্রহণ শেষ হয়। তার পর নথিপত্র যাচাইযোগ্যতা পরীক্ষা  বাছাইয়ের দীর্ঘ প্রক্রিয়া চলে পরের বছরের মার্চ পর্যন্ত। অবশেষে মে-জুন নাগাদ প্রকাশিত হয় নির্বাচিতদের তালিকা। কিন্তু এ বার চেনা সময়সূচি ভেঙে গিয়েছে। ২০০৯ সালে প্রকল্প চালু হওয়ার পর থেকে প্রতি বছরই ‘ডিএসটি’ নির্দিষ্ট সময়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে। ২০২৩ সালে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছিল ১০ সেপ্টেম্বর২০২৪ সালে ১ সেপ্টেম্বর। অথচ ২০২৫ সালের জন্য এখনো পর্যন্ত কোনো বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়নি। ইতিমধ্যে প্রায় দশ মাস অতিক্রান্ত। তবু কেন্দ্রের তরফে নেই কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা। ইনস্পায়ার’ প্রকল্পের সরকারি ওয়েবসাইটে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি হিসেবে রয়ে গিয়েছে ২০২৪ ব্যাচের আবেদন সংক্রান্ত তথ্য।

এ নীরবতাই বাড়িয়েছে উদ্বেগ। যে বৃত্তির উপর নির্ভর করে বহু ছাত্রছাত্রী উচ্চশিক্ষার পরিকল্পনা করেনঅন্য বৃত্তির জন্য আবেদন করেন নাএই আশায় যে এখান থেকে আর্থিক সহায়তা পাবেন, সেটির বিজ্ঞপ্তি হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ার জেরে অনেকের পড়াশোনাই সঙ্কটে পড়েছে। উত্তরপ্রদেশের হামিরপুরের বিএসসি পড়ুয়া প্রণীত সোহান এ উদ্বেগের অন্যতম মুখ। ২০২৬ সালের মার্চ মাসে তিনি তথ্যের অধিকার আইন’-এর মাধ্যমে আবেদন করে জানতে চান২০২৫ সালের ইনস্পায়ার শি’-এর বিজ্ঞপ্তি কবে প্রকাশিত হবে। এপ্রিল মাসে ‘ডিএসটি’-এর তরফে যে উত্তর আসেতা আরও বিস্ময়কর। সেখানে স্পষ্ট ভাষায় জানানো হয়— ‘২০২৫ সালের জন্য কোনো বিজ্ঞপ্তিই প্রকাশ করা হবে না।’ এর পর কেন্দ্রীয় অভিযোগ নিষ্পত্তি পোর্টাল’-এ আবেদন করে তিনি কারণ জানতে চান। কিন্তু সেখান থেকেও একই উত্তর আসে। বিজ্ঞপ্তি হবে নাকিন্তু কেন হবে নাতার কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই। সোহান জানান, ‘আমি এই বৃত্তির আশাতেই বিএসসি কোর্সে ভর্তি হয়েছিলাম। অন্য অনেক বৃত্তির জন্য আবেদন করিনি। এখন আর্থিক সমস্যার কারণে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়াই কঠিন হয়ে পড়ছে।’

প্রণীতের বক্তব্য কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। একই ধরনের উত্তর পেয়েছেন প্রাক্তন ইনস্পায়ার শি’ স্কলার বংশ শর্মাও। বিজ্ঞান শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন বৃত্তিইন্টার্নশিপ  গবেষণার সুযোগ নিয়ে তথ্যভিত্তিক একটি ইউটিউব চ্যানেল পরিচালনা করেন তিনি। সেপ্টেম্বর মাসে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ না হওয়ায় অসংখ্য ছাত্রছাত্রী তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাদের উদ্বেগ থেকেই তিনি আরটিআই আবেদন করেন। সেখানেও ‘ডিএসটি’-র উত্তর২০২৫ সালের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হবে না। এর আঁচ পৌঁছে গিয়েছে দেশের অন্যতম শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘আইআইটি কানপুর’-এও। শিক্ষার্থীদের প্রশ্নের জবাব খুঁজতে  শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের  বৃত্তি ও পুরস্কার বিষয়ক কমিটি’ সরাসরি ‘ডিএসটি’-র সঙ্গে যোগাযোগ করে। সেখান থেকেও একই উত্তর আসে। জানানো হয়, প্রতিষ্ঠানগুলির পাঠানো ছাত্রছাত্রীদের তালিকা এবারে বিবেচনা করা হবে না।

তবে আশার কথাইতিমধ্যে নির্বাচিত ছাত্রছাত্রীদের বৃত্তি বন্ধ হয়নি। বর্তমান স্কলাররা এখনো বৃত্তির অর্থ পাচ্ছেন। প্রকল্পের নিয়ম অনুযায়ীনির্দিষ্ট শিক্ষাগত মান বজায় রাখতে পারলে একজন নির্বাচিত পড়ুয়া সর্বোচ্চ  বছর পর্যন্ত এই সুবিধা পান। ‘আইআইএসইআর ভোপাল’-এর এক ছাত্র জানিয়েছেনতিনি গত  বছর ধরে নিয়মিত বৃত্তির অর্থ পেয়েছেন, এ বছরও পাওয়ার আশা করছেন। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে পরবর্তী ব্যাচের পড়ুয়াদের নিয়ে। যাঁরা ২০২৫ সালে দ্বাদশ শ্রেণি উত্তীর্ণ হয়ে বিজ্ঞান শিক্ষায় প্রবেশ করেছেনতাঁদের জন্য কি তবে এ দরজা চিরতরে বন্ধ হয়ে গেলবিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেনএর পিছনে থাকতে পারে কেন্দ্রের সাম্প্রতিক বৃত্তি ও বিজ্ঞান-অনুদান কাঠামো’-র পুনর্গঠন। ২০২৪ সালে ‘ডিএসটি’-র অধীনস্ত একাধিক প্রকল্পকে একত্রিত করে তৈরি করা হয়েছে নতুন ছাতার তলার প্রকল্প বিজ্ঞান ধারা । এর আওতায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগবেষণা ও উন্নয়ন এবং উদ্ভাবন-সংক্রান্ত একাধিক কর্মসূচি একীভূত হয়েছে। কেন্দ্রের দাবিএর ফলে অর্থের ব্যবহার আরও স্বচ্ছ হবেবিভিন্ন প্রকল্পের মধ্যে সমন্বয় বাড়বে।

কিন্তু বাস্তবে ইনস্পায়ার শি’ আর আলাদা বাজেট শিরোনাম হিসেবে দেখা যাচ্ছে না। বিজ্ঞান ধারা প্রকল্পের মধ্যে কোন কর্মসূচিতে কত টাকা ব্যয় হচ্ছেতারও স্পষ্ট তথ্য নেই। ফলে অনেকেরই আশঙ্কাপ্রশাসনিক পুনর্গঠনের আড়ালে হয়তো ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিজ্ঞান বৃত্তি প্রকল্প। এ আশঙ্কা উড়িয়ে দিতে পারছেন না শিক্ষাবিদরাও। ‘আইআইএসইআরকলকাতা’-র অধ্যাপক অনিন্দিতা ভদ্রের মতে, ‘এটি উচ্চশিক্ষার জন্য আর একটি বড়ো ধাক্কা। অনেক ছাত্রছাত্রী শুধুমাত্র এ বৃত্তির উপর নির্ভর করেই বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যায়। বৃত্তি বন্ধ হয়ে গেলে বিজ্ঞান শিক্ষা ক্রমশ সচ্ছল পরিবারের একচেটিয়া ক্ষেত্র হয়ে উঠবে।’ একই সুরে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ‘আইআইটি দিল্লির প্রাক্তন অধিকর্তা বর্তমানে ‘বিআইটিএস পিলানি’-র উপাচার্য অধ্যাপক ভি. রামগোপাল রাও। তাঁর মতে, ‘কিশোর বৈজ্ঞানিক প্রোৎসাহন যোজনা (কেভিপিওয়াই’ ও ‘ইনস্পায়ার শি’-এর মতো প্রকল্পগুলি ভারতের বিজ্ঞান- প্রতিভা চিহ্নিত ও গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ভবিষ্যতের বিজ্ঞানী তৈরির এ ধারাবাহিকতাকে দুর্বল করা হলে তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে দেশের সামগ্রিক গবেষণা ও উদ্ভাবনের উপর।

ভারত ইতিমধ্যেই নিজেকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিশ্বশক্তি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার স্বপ্ন দেখছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তামহাকাশ গবেষণাসেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তি থেকে কোয়ান্টাম কম্পিউটিং— সর্বত্র বিনিয়োগ বাড়ানোর কথা বলছে কেন্দ্র। কিন্তু একই সময়ে যদি বিজ্ঞান শিক্ষার তৃণমূলস্তরেই আর্থিক সহায়তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সেতুটি ভেঙে পড়েতবে সেই স্বপ্ন কতটা বাস্তবায়িত হবেতা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে। সবচেয়ে বড়ো কথাপ্রকল্পটি যদি সত্যিই বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়ে থাকেতবে তার কারণ জানার অধিকার ছাত্রছাত্রীদের রয়েছে। আর যদি তা না-ও হয়তা হলে দীর্ঘ নীরবতা ও অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়ে দ্রুত স্পষ্ট অবস্থান জানানোই সরকারের কর্তব্য। কারণকোনো শিক্ষা বৃত্তি কেবল অর্থসাহায্য নয়বহু মেধাবী তরুণ-তরুণীর কাছে সেটাই উচ্চশিক্ষার পথে এগিয়ে যাওয়ার শেষ ভরসা। আজ সে ভরসার আলোই যেন ক্রমশ ম্লান হয়ে আসছে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!