Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • জুলাই ২৪, ২০২৬

প্রশ্নফাঁসের পুনরাবৃত্তিতে কেন্দ্রকে কড়া বার্তা শীর্ষ আদালতের, পরীক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কারের রূপরেখা তৈরির নির্দেশ

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
প্রশ্নফাঁসের পুনরাবৃত্তিতে কেন্দ্রকে কড়া বার্তা শীর্ষ আদালতের, পরীক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কারের রূপরেখা তৈরির নির্দেশ

নিট-ইউজি’-সহ সর্বভারতীয় প্রবেশিকা পরীক্ষায় ধারাবাহিক প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং অনিয়মের ঘটনায় কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা নিয়ে এ বার কড়া অবস্থান নিল সুপ্রিম কোর্ট। শুধু উদ্বেগ প্রকাশেই থেমে থাকেনি দেশের শীর্ষ আদালত, স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে— পরীক্ষাব্যবস্থার এই ব্যর্থতা আর ‘স্বাভাবিক’ বলে মেনে নেওয়া যাবে না। কেন্দ্রকে দ্রুত স্থায়ী সংস্কারের রূপরেখা তৈরির নির্দেশ দিয়ে আদালত জানিয়ে দিয়েছে, ভবিষ্যতে এই মামলার অগ্রগতির উপর তারা নিয়মিত নজর রাখবে।

শুক্রবার, বিচারপতি পি এস নরসিমা এবং বিচারপতি অলোক আরাধের ডিভিশন বেঞ্চে প্রবেশিকা পরীক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার সংক্রান্ত একগুচ্ছ আবেদনের শুনানিতে উঠে আসে এই পর্যবেক্ষণ। আবেদনকারীদের মূল দাবি, ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (এনটিএ)-র কাঠামোগত সংস্কার কিংবা প্রয়োজনে তার পরিবর্তে নতুন ও আরও জবাবদিহিমূলক পরীক্ষা-পরিচালনা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হোক। তাঁদের বক্তব্য, নিট-সহ জাতীয় স্তরের পরীক্ষাগুলিতে বারবার অনিয়ম ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ দেশের লক্ষ লক্ষ পরীক্ষার্থীর ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।

শুনানির শুরু থেকেই বেঞ্চের পর্যবেক্ষণে স্পষ্ট ছিল অসন্তোষের সুর। বিচারপতিরা বলেন, প্রবেশিকা পরীক্ষা এমন একটি ব্যবস্থা, যার উপর নির্ভর করছে দেশের বিপুল সংখ্যক ছাত্রছাত্রীর ভবিষ্যৎ। সেখানে একের পর এক অনিয়ম এবং প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ উঠতে থাকলে তা গোটা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। আদালতের মন্তব্য, ‘এ ভাবে আর চলতে দেওয়া যায় না। কোনো অস্থায়ী ব্যবস্থা নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সমাধান।’ বেঞ্চ এও স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, কেন্দ্র যে সংস্কারের কথা বলছে, তা বাস্তবে কতটা এগোচ্ছে, আদালত নিয়মিত তার পর্যালোচনা করবে। প্রয়োজন হলে নির্দিষ্ট সময় অন্তর মামলার শুনানি করে সরকারের অগ্রগতি খতিয়ে দেখা হবে। বিচারপতিদের কথায়, শুধু আশ্বাসে নয়, কার্যকর পদক্ষেপেই সমস্যার সমাধান হতে হবে।

শুনানির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল কম্পিউটার-ভিত্তিক বা সম্পূর্ণ অনলাইন পরীক্ষার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা। আদালতের প্রশ্ন, যদি ভবিষ্যতে নিট-সহ জাতীয় স্তরের পরীক্ষাগুলি সম্পূর্ণ ডিজিটাল মাধ্যমে নেওয়া হয়, তবে পরীক্ষার্থীদের তথ্যের নিরাপত্তা কী ভাবে নিশ্চিত করা হবে? সাইবার হামলা, হ্যাকিং বা তথ্য চুরির মতো ঝুঁকি এড়াতে কী ধরনের অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে কেন্দ্রের? বিচারপতি নরসিমা বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর পরীক্ষাব্যবস্থার কথা ভাবা যেতে পারে, কিন্তু তার আগে প্রয়োজন শক্তিশালী এবং নির্ভরযোগ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা। গোটা প্রক্রিয়াকে একটি স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসাই হওয়া উচিত সরকারের লক্ষ্য। আদালত এ-ও জানতে চায়, শুধু রাধাকৃষ্ণন কমিটির সুপারিশের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে আরও বিস্তৃত সংস্কারের বিষয়ে কেন্দ্র আদৌ ভাবছে কি না। জয়েন্ট এন্ট্রান্স পরীক্ষার মতো তুলনামূলকভাবে সুরক্ষিত মডেলের কিছু দিক অনুসরণ করা যায় কি না, সে বিষয়েও বিবেচনার পরামর্শ দেয় বেঞ্চ।

কেন্দ্রের হয়ে সওয়াল করতে গিয়ে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা আদালতকে জানান, সরকার ইতিমধ্যেই পরীক্ষা ব্যবস্থার সার্বিক সংস্কারের কাজ শুরু করেছে। রাধাকৃষ্ণন কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নের পাশাপাশি প্রয়োজন হলে তার বাইরেও অতিরিক্ত পদক্ষেপ করতে কেন্দ্র প্রস্তুত। তাঁর দাবি, ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যৎ যাতে কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়ে সরকার ‘সাধ্যের চেয়েও বেশি’ উদ্যোগ নিচ্ছে। তবে সরকারের পরিকল্পনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র আদালতের সামনে তুলে ধরতে কিছুটা সময় প্রয়োজন বলেও তিনি জানান। তবে সে আবেদনে পুরোপুরি সন্তুষ্ট হয়নি সুপ্রিম কোর্ট। বেঞ্চের মন্তব্য, ‘বিষয়টিকে অনির্দিষ্টকাল ঝুলিয়ে রাখা সম্ভব নয়। পরীক্ষাব্যবস্থার এই ত্রুটি দ্রুত দূর করতেই হবে।’ আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, কেন্দ্রের সংস্কার পরিকল্পনা শুধু নীতিগত ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; বাস্তবায়নের সময়সীমা এবং কার্যকরী রূপরেখাও তুলে ধরতে হবে।

আবেদনকারীদের পক্ষে আইনজীবী তনভি দুবে জানান, পরীক্ষা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং নিরাপত্তা বাড়াতে তাঁদের পক্ষ থেকেও একাধিক প্রস্তাব রয়েছে। আদালত সেই প্রস্তাবগুলিও বিবেচনা করবে বলে জানিয়েছে। গত কয়েক বছরে নিট-সহ একাধিক জাতীয় স্তরের পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস, অনিয়ম, পরীক্ষা বাতিল এবং পুনঃপরীক্ষা নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তার প্রেক্ষাপটেই এ মামলার গুরুত্ব বেড়েছে। লক্ষ লক্ষ পরীক্ষার্থী এবং অভিভাবকের আস্থার সংকট কাটিয়ে ওঠাই এখন সরকারের সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছে আদালত। তাই কোনো তাৎক্ষণিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য একটি নিরাপদ, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক পরীক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার উপরেই জোর দিয়েছে শীর্ষ আদালত। মামলার পরবর্তী শুনানি ৩ আগস্ট। সেই দিন কেন্দ্রকে পরীক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার, অনলাইন বা কম্পিউটার-ভিত্তিক পরীক্ষার সম্ভাবনা, তথ্য ও সাইবার নিরাপত্তার কাঠামো, প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে গৃহীত পদক্ষেপ এবং ভবিষ্যৎ রোডম্যাপ সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিতে হবে। আদালতের স্পষ্ট বার্তা, দেশের কোটি কোটি পরীক্ষার্থীর ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত প্রশ্নে কোনো ঢিলেমির অবকাশ নেই।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!