- এই মুহূর্তে দে । শ
- জুলাই ২৪, ২০২৬
যন্তর মন্তরের আঁচে উত্তপ্ত ধর্মতলা! বাম ছাত্রদের সমাবেশে লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস পুলিশের
দিল্লির যন্তর মন্তরের পড়ুয়াদের আন্দোলন ছড়িয়েছে দেশের সব প্রান্তে। ব্যক্তিক্রম নয় ‘মিছিলের শহর’ও। আন্দোলনের ঢেউ এ বার স্পষ্টভাবে এসে আছড়ে পড়ল কলকাতার রাজপথে। ‘নিট’ প্রশ্নপত্র ফাঁস, শিক্ষা ব্যবস্থায় ক্রমবর্ধমান অনিয়ম এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে শুক্রবার শিয়ালদহ থেকে ধর্মতলা পর্যন্ত ডাকা বাম ছাত্র সংগঠনগুলির মিছিল শেষ পর্যন্ত পরিণত হয়েছে বৃহত্তর ছাত্র-যুব প্রতিবাদের মঞ্চে। পুলিশের অনুমতি না পেলেও পৃথক কর্মসূচির বদলে সেই মিছিলেই এসে মিশে গেল দিল্লির আন্দোলনের সমর্থক ‘ককরোচ জনতা পার্টি’-র সদস্য ও সমর্থকেরা। ফলে রাজধানীর আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে কলকাতার বুকে তৈরি হল এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক-ছাত্র সমাবেশ। আর সেখানেই পুলিশের বিরুদ্ধে লাটিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ছোড়ায় অভিযোগ তুলছেন বিক্ষোভকারীরা।
এদিন, দুপুর গড়াতেই শিয়ালদহ স্টেশন চত্বর ভরে ওঠে ছাত্রছাত্রী, গবেষক, তরুণ-তরুণী এবং বিভিন্ন গণসংগঠনের কর্মীদের ভিড়ে। লাল পতাকার পাশাপাশি চোখে পড়ে হাতে লেখা অসংখ্য প্ল্যাকার্ড, ব্যঙ্গাত্মক পোস্টার, মুখে ব্যাটম্যানের মুখোশ, কোথাও আবার সরকারের বিরুদ্ধে কটাক্ষে ভরা নানা সৃজনশীল প্রতিবাদ। শুরু থেকেই স্পষ্ট ছিল, এ দিনের কর্মসূচি শুধু একটি ছাত্র সংগঠনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং নিট-কাণ্ডকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া সর্বভারতীয় ক্ষোভেরই প্রতিফলন ঘটছে কলকাতার রাস্তায়। তিলোত্তমার আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, প্রশ্নপত্র ফাঁস কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশিকা পরীক্ষার বিশ্বাসযোগ্যতা যখন প্রশ্নের মুখে, তখন তা শুধু পরীক্ষার্থীদের নয়, গোটা শিক্ষা ব্যবস্থার ভবিষ্যতের সঙ্গেও জড়িত। দিল্লির যন্তর মন্তরে যে আন্দোলন চলছে, তার সঙ্গে সংহতি জানাতেই কলকাতার ছাত্রসমাজ এ দিন পথে নেমেছে বলে দাবি তাঁদের।
প্রসঙ্গত, পৃথকভাবে প্রতিবাদ মিছিল করার অনুমতি চেয়ে পুলিশের দ্বারস্থ হয়েছিল কয়েকটি ছাত্র ও আন্দোলনকারী সংগঠন। অভিযোগ, সেই অনুমতি মেলেনি। শেষ পর্যন্ত সংঘাত এড়িয়ে এবং বৃহত্তর ঐক্যের বার্তা দিতেই তারা বাম ছাত্র সংগঠনগুলির ডাকা কর্মসূচিতেই যোগ দেয়। এর ফলে শিয়ালদহ থেকে ধর্মতলার পথে মিছিল যত এগিয়েছে, ততই তার আকার বেড়েছে। ফুটপাথ ছাপিয়ে বহু সাধারণ মানুষও করতালি দিয়ে আন্দোলনকারীদের সমর্থন জানিয়েছেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি। এ দিনের কলকাতার কর্মসূচির নেপথ্যে ছিল দিল্লির সাম্প্রতিক ঘটনাবলি। নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ঘিরে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে রাজধানীর যন্তর মন্তরে আন্দোলন চালিয়ে আসছেন ছাত্রছাত্রী ও বিভিন্ন নাগরিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা। সে আন্দোলনের অন্যতম মুখ সোনম ওয়াংচুক ২৬ দিনের অনশন শেষে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে অনশন ভাঙেন। কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে তাঁর একাধিক দাবির বিষয়ে লিখিত আশ্বাস দেওয়ার পরই তিনি এই সিদ্ধান্ত নেন। আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলা প্রত্যাহার থেকে শুরু করে ক্ষতিগ্রস্ত পরীক্ষার্থীদের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ বিবেচনার মতো বিষয়ও সে আলোচনায় উঠে এসেছে বলে জানা গিয়েছে।
সে আবহেই শুক্রবার দেশজুড়ে প্রতিবাদের ডাক দেয় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’। সোমবার দিল্লিতে আন্দোলনকারীদের উপর পুলিশের বলপ্রয়োগের অভিযোগের প্রতিবাদে এবং আহতদের প্রতি সংহতি জানাতেই দেশের নানা শহরে কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। কলকাতার মিছিল শিয়ালদহ ছেড়ে মৌলালি মোড়ে পৌঁছতেই প্রথমবারের মতো পুলিশি বাধার মুখে পড়ে। কিছু সময়ের জন্য মিছিল আটকে দেওয়া হলেও পরে সে বাধা তুলে নেওয়া হয়। এরপর আবার ধর্মতলার উদ্দেশে এগোতে শুরু করেন আন্দোলনকারীরা। কিন্তু প্রকৃত উত্তেজনা শুরু হয় ধর্মতলায় পৌঁছনোর পর। প্রায় আধ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে আন্দোলনকারীরা ডোরিনা ক্রসিং সংলগ্ন এলাকায় অবস্থান বিক্ষোভ চালান। তাঁদের অভিযোগ, কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই পুলিশ অবস্থান তুলে দেওয়ার চেষ্টা করে এবং ব্যাপক লাঠিচার্জ শুরু করে। অন্যদিকে পুলিশের দাবি, আন্দোলনকারীদের একাংশ প্রথমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে লক্ষ্য করে জুতো, জলের বোতল-সহ বিভিন্ন বস্তু ছুড়ে মারেন। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে থাকলে লাঠিচার্জের পাশাপাশি কাঁদানে গ্যাসের শেলও ফাটানো হয়।
এই মুহূর্তে ধর্মতলা কার্যত রণক্ষেত্রের চেহারা নিয়েছে। পুলিশের ব্যারিকেড ঘিরে ধস্তাধস্তি, স্লোগান, ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা এবং পাল্টা প্রতিরোধ— কয়েক মিনিটের মধ্যেই গোটা এলাকা চরম উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেছে। বিক্ষোভকারীদের মুখে শোনা যাচ্ছে স্লোগান। বেশ কয়েক জন আন্দোলনকারী আহত হয়েছেন বলে দাবি করা হলেও, পুলিশ সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি। পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কায় দ্রুত বিপুল সংখ্যক পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। নামানো হয়েছে র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স–ও। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ধর্মতলা ও সংলগ্ন এলাকায় সাময়িকভাবে মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখারও সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রশাসন। এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত গোটা এলাকা কড়া নিরাপত্তার বলয়ে ঘেরা। বাম ছাত্র সংগঠনগুলির নেতৃত্বের দাবি, তাঁদের ঘোষিত শান্তিপূর্ণ মিছিলে অকারণ বাধা দিয়েই উত্তেজনার পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। অন্য দিকে পুলিশ সূত্রের বক্তব্য, নির্ধারিত সময়ের পরে অবস্থান তুলে দিতে বলা হলেও আন্দোলনকারীদের একাংশ তা মানতে অস্বীকার করেন এবং পরিস্থিতি ক্রমশ অশান্ত হয়ে ওঠে।
❤ Support Us







