Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • আগস্ট ১০, ২০২৬

ছাত্র বিক্ষোভে পুলিশি পদক্ষেপ নিয়ে সংসদে জবাব দেবেন অমিত শাহ! রাম মন্দির বিতর্কে অনড় বিরোধীরা

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
ছাত্র বিক্ষোভে পুলিশি পদক্ষেপ নিয়ে সংসদে জবাব দেবেন অমিত শাহ! রাম মন্দির বিতর্কে অনড় বিরোধীরা

সংসদের অচলাবস্থা কাটানোর পথে সামান্য হলেও এগোল কেন্দ্র ও বিরোধী শিবির? ছাত্র বিক্ষোভ নিয়ে বিরোধীদের লাগাতার দাবির পর শেষ পর্যন্ত লোকসভায় এ বিষয়ে ‘পূর্ণাঙ্গ ও বিস্তারিত’ আলোচনায় সম্মতি দিল কেন্দ্র সরকার। শুধু বিবৃতি নয়, আলোচনায় বিরোধীদের তোলা প্রতিটি প্রশ্নের জবাব দেবেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ— সোমবার ‘বিজনেস অ্যাডভাইজরি কমিটি’-র বৈঠকের পর এমনটাই জানালেন সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু। তবে সে সঙ্গে কেন্দ্রের শর্তও স্পষ্ট— আলোচনা চলাকালীন কোনো রকম হইচই বা বিশৃঙ্খলা করা চলবে না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য মন দিয়ে শুনতে হবে বিরোধীদের।

কিন্তু তাতেও পুরোপুরি কাটল না জট। কারণ, ছাত্র বিক্ষোভ নিয়ে আলোচনায় সরকার রাজি হলেও অযোধ্যার রাম মন্দির ট্রাস্টের অনুদান নিয়ে কথিত দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনার দাবিতে এখনো অনড় বিরোধীরা। ফলে বাদল অধিবেশন শেষ হতে যখন হাতে গোনা কয়েক দিন বাকি, তখনো সংসদের স্বাভাবিক কাজকর্ম নিয়ে তৈরি হয়েছে ঘোর অনিশ্চয়তা।  ২০ জুলাই ‘নিট প্রশ্ন ফাঁস’-এর প্রতিবাদে সংসদ অভিযানে শামিল ছাত্রদের বিরুদ্ধে পুলিশের পদক্ষেপ নিয়ে বিরোধীরা ধারাবাহিকভাবে ক্ষোভ দেখিয়েছে। প্রাক্তন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতেও ওই আন্দোলন হয়েছিল। পরে অবশ্য পদত্যাগ করেছেন প্রধান। বিরোধীদের অভিযোগ, আন্দোলনরত ছাত্রদের উপর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করা হয়েছে। এমনকি পেলেট গান এবং কাঁদানে গ্যাস ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে।

এ অভিযোগকে কেন্দ্র করেই সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পূর্ণাঙ্গ বিবৃতির দাবি তুলেছিলেন বিরোধীরা। সোমবার সে দাবির জবাবে রিজিজু বলেন, ‘সরকার ছাত্র আন্দোলন নিয়ে পূর্ণাঙ্গ ও বিস্তারিত আলোচনায় প্রস্তুত।’ তাঁর দাবি, শুধু বিবৃতি দিয়ে দায় সারবেন না অমিত শাহ। বিরোধীরা যে সমস্ত বিষয় তুলবেন, তার প্রতিটির জবাব দেবেন তিনি। রিজিজুর বক্তব্য, ‘রাহুল গান্ধী দাবি করেছিলেন, ছাত্র বিক্ষোভ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সংসদে বিবৃতি দিন। আমরা স্পষ্ট করে দিয়েছি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শুধু বিবৃতিই দেবেন না, পুরো বিতর্ক ও আলোচনারও জবাব দেবেন।’ তবে সেই সঙ্গে বিরোধীদের উদ্দেশে সতর্কবার্তাও দিয়েছেন সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী। বলেছেন, আলোচনা চলাকালীন বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষণের সময় যেন কোনো ভাবে অধিবেশনে ব্যাঘাত ঘটানো না হয়। বিষয়টি নিয়ে খুঁটিনাটি আলোচনা হওয়া উচিত।

কেন্দ্রের এ ঘোষণার পরও অবশ্য বিরোধীদের ক্ষোভ প্রশমিত হয়নি। ‘বিজনেস অ্যাডভাইজরি কমিটি’-র বৈঠকে কংগ্রেসের লোকসভা উপনেতা গৌরব গগৈ স্পষ্ট করে দেন, শুধু ছাত্র বিক্ষোভ নিয়ে আলোচনা হলেই সমস্যা মিটবে না। তাঁদের দাবি, অযোধ্যার রাম মন্দির ট্রাস্টের অনুদান চুরির অভিযোগ নিয়েও সংসদে আলোচনা করতে হবে। গগৈয়ের বক্তব্য, ছাত্রদের বিরুদ্ধে পুলিশি পদক্ষেপ এবং কথিত পুলিশি অত্যাচার নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সরাসরি কথা বলবেন কি না, সে বিষয়ে সরকার এখনো নির্দিষ্ট করে কিছু জানায়নি। একই ভাবে অযোধ্যার রাম মন্দির ট্রাস্টের কথিত দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা নিয়েও সরকার আলোচনায় রাজি কি না, তারও স্পষ্ট উত্তর মেলেনি।

অচলাবস্থার আবহে আরও কয়েকটি দাবিও তুলেছে বিরোধীরা। ‘ন্যাশনাল কো-অপারেটিভ ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন (সংশোধনী) বিল, ২০২৬’ এবং ‘মিনস অ্যান্ড মিনারেলস (ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রেগুলেশন) সংশোধনী বিল, ২০২৬’ সরাসরি সংসদে পাশ না করিয়ে ‘স্ট্যান্ডিং কমিটি’-র কাছে পাঠানোর দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে ‘কেরালা (নাম পরিবর্তন) বিল, ২০২৬’ শীতকালীন অধিবেশন পর্যন্ত স্থগিত রাখার দাবিও উঠেছে। সূত্রের খবর, দাবিগুলির কোনোটিতেই এখনো আশ্বাস দেয়নি কেন্দ্র। এদিকে, সোমবারের ‘বিজনেস অ্যাডভাইজরি কমিটি’-র বৈঠকে ‘এফসিআরএ সংশোধনী বিল’ এবং প্রস্তাবিত ‘আসন পুনর্বিন্যাস বিল’ নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। অথচ বাদল অধিবেশনের বাকি দিনগুলিতে ওই বিতর্কিত বিলগুলি সংসদে আনা হতে পারে বলে জল্পনা চলছিল।

বাদল অধিবেশনের দিনগুলিতে সংসদে ছাত্র বিক্ষোভ নিয়ে সরব হয়েছেন রাহুল গান্ধী। তাঁর অভিযোগ, নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সরকারের কাছে প্রশ্ন করা ছাত্রদের পেলেট গান, কাঁদানে গ্যাস দিয়ে দমন করা হয়েছে। এ ঘটনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জবাব দেওয়া উচিত। তাঁর অভিযোগ, ২০ দিন কেটে গেলেও অমিত শাহ সংসদে এসে এ বিষয়ে বক্তব্য দেননি। বিরোধীদের আলোচনার দাবিও বারবার খারিজ করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। রাহুলের অভিযোগ, সরকারের এই নীরবতা কোনও ‘ভুল’ নয়, বরং হিংসায় অনুমোদন। ঘটনার সুপ্রিম কোর্টের নজরদারিতে তদন্তের দাবিও তুলেছেন তিনি। দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় না আনা পর্যন্ত আন্দোলন চলবে বলেও জানিয়েছেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা।

রাহুলের সুরেই সরব কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক কে সি বেণুগোপাল। সোমবার লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লাকে চিঠি দিয়ে অমিত শাহকে সংসদে বিবৃতি দেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার দাবি জানান তিনি। তাঁর বক্তব্য, দিল্লিতে আন্দোলনরত যুবক ও ছাত্রদের বিরুদ্ধে পুলিশি অত্যাচার এবং পেলেট গান ব্যবহারের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগকারী তরুণদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এ ধরনের ‘কঠোর পদক্ষেপ’ নিয়ে অবিলম্বে সংসদে আলোচনা প্রয়োজন। দিল্লি পুলিশ সরাসরি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অধীনে। সে কারণেই এই ঘটনায় ‘চূড়ান্ত দায়’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উপর বর্তায় বলে দাবি করেছেন বেণুগোপাল।

অন্যদিকে, কংগ্রেস দলের সাংসদদেরও সতর্ক করেছে। ১০, ১১ এবং ১২ আগস্ট লোকসভা ও রাজ্যসভায় সাংসদদের উপস্থিত থাকার নির্দেশ দিয়ে হুইপ জারি করেছে হাত শিবির। ওই তিন দিনে ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’ বিষয় নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে ‘ইন্ডিয়া’ জোটের শরিক দলগুলিকেও তাদের সাংসদদের সংসদে উপস্থিতি নিশ্চিত করার অনুরোধ জানিয়েছে কংগ্রেস। এ পরিস্থিতিতে বাদল অধিবেশনের হাতে আর মাত্র চার দিন। অথচ ‘মহিলা সংরক্ষণ’, ‘আসন পুনর্বিন্যাস’ এবং ‘এফসিআরএ’-র মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিলের ভবিষ্যৎ এখনো ঝুলে রয়েছে। ‘মহিলা সংরক্ষণ’ ও ‘আসন পুনর্বিন্যাস’ সংক্রান্ত সংবিধান সংশোধনী বিলে লোকসভা এবং রাজ্য বিধানসভায় মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ আসন সংরক্ষণের প্রস্তাব রয়েছে। গত এপ্রিল মাসে প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না মেলায় সে বিল পাশ করানো সম্ভব হয়নি। ‘এফসিআরএ সংশোধনী বিল’ গত ২৫ মার্চ লোকসভায় পেশ হয়েছিল। সেটিও এখনো আলোচনার অপেক্ষায়।

বাদল অধিবেশনের শুরু থেকেই বার বার বিরোধীদের বিক্ষোভে লোকসভা ও রাজ্যসভা মুলতবি হয়েছে। অমিত শাহের বিরুদ্ধে স্লোগান উঠেছে দু-কক্ষেই। সংসদের গেটের সামনেও নিয়মিত অবস্থান-বিক্ষোভ করছেন বিরোধী সাংসদরা। বাদল অধিবেশন শুরু হয়েছিল ২০ জুলাই। এত দিন পর ছাত্র বিক্ষোভ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের ব্যাপারে কেন্দ্রের সম্মতি কিছুটা আশার আলো দেখালেও, রাম মন্দির ট্রাস্ট নিয়ে বিরোধীদের দ্বিতীয় দাবি মেনে না নেওয়া পর্যন্ত যে সংসদের অচলাবস্থা কাটছে না, সোমবারের ঘটনাপ্রবাহে তা আরও এক বার স্পষ্ট হয়ে গেল।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!