Advertisement
  • দে । শ
  • আগস্ট ১২, ২০২৬

ধর্মান্তরণ রুখতে কড়া আইন, জমি কেনাবেচাতেও বিধিনিষেধ ! বাঁকুড়া থেকে ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রীর

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
ধর্মান্তরণ রুখতে কড়া আইন, জমি কেনাবেচাতেও বিধিনিষেধ ! বাঁকুড়া থেকে ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রীর

অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বা ইউসিসি-র পর এ বার ধর্মান্তর, জমি কেনাবেচা নিয়েও কড়া আইন আনার পথে রাজ্য সরকার ? মঙ্গলবার বাঁকুড়ায় পশ্চিমাঞ্চল উন্নয়ন পর্ষদের পর্যালোচনা বৈঠকের পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানান, তাঁর সরকারের সামনে এখন মূলত দুটি কাজ— জোর করে ধর্মান্তর রোখার জন্য নতুন আইন এবং জমি কেনাবেচায় আইনি বিধিনিষেধ জারি করা। তবে জমি লেনদেনের ক্ষেত্রে ঠিক কী ধরনের নিয়ন্ত্রণ আনা হবে, কী ধরনের বিধিনিষেধ থাকবেসে বিষয়ে এ দিন স্পষ্ট করে কিছু বলেননি মুখ্যমন্ত্রী।

বাঁকুড়ার প্রশাসনিক বৈঠকে পশ্চিমাঞ্চলের উন্নয়ন নিয়ে একাধিক ঘোষণা করার পাশাপাশি ধর্মান্তর  জমি নিয়ে সরকারের পরিকল্পনার কথা জানান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর বক্তব্য, ‘খুব শীঘ্রই আমরা অভিন্ন দেওয়ানি বিধি নিয়ে আসছি। এক দেশএক আইন। এর পরে আমাদের আরও দুটি কাজ বাকি থাকবে। ধর্মান্তরণ রুখতে আইন  জমি কেনাবেচার ক্ষেত্রে আইন বলবৎ করা।’ ফলে, ধর্মান্তর প্রসঙ্গে রাজ্য সরকারের অবস্থান যে আরও কড়া হতে চলেছেতা তাঁর এ দিনের বক্তব্যে স্পষ্ট। শুভেন্দুর অভিযোগবাঁকুড়া এবং জঙ্গলমহলের বিস্তীর্ণ এলাকায় দরিদ্র মানুষের আর্থিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে বিদেশি অর্থের সাহায্যে ধর্মান্তরের চেষ্টা চলছে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নামে বিদেশ থেকে অর্থ আসছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর দাবিএ অর্থের সাহায্যে শুধু ধর্মান্তর নয়মৌলবাদী  উগ্রপন্থী কার্যকলাপও চালানো হচ্ছে। এটা বন্ধ করতে হবে।

বিদেশি অনুদান নিয়ন্ত্রণ আইন বা এফসিআরএ-র সংশোধনী বিল নিয়ে প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে পূর্ব বর্ধমান থেকে গ্রেফতার হওয়া সন্দেহভাজন জইশ-ই-মহম্মদ সদস্য হামীম মণ্ডলের প্রসঙ্গও তোলেন শুভেন্দু। তাঁর অভিযোগধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নামে একাধিক অবৈধ প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে এবং মৌলবাদী ও উগ্রপন্থী গোষ্ঠী বিদেশি অর্থ দেশে নিয়ে আসছে। এ প্রবণতা রুখতেই কেন্দ্রের নতুন আইনের প্রয়োজন বলে দাবি তাঁর। রাজ্য সরকারের বেশ কিছু পদক্ষেপের কথাও এ দিন তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবিসীমান্ত এলাকায় বিএসএফকে জমি দেওয়া হয়েছে, ‘অবৈধ’ ওবিসি তালিকা বাতিল করা হয়েছেইমাম ও মুয়াজ্জিনদের ভাতা বন্ধ করা হয়েছে। মহরমে অস্ত্র বা তলোয়ার নিয়ে মিছিলেও নিষেধাজ্ঞার কথা বলেন তিনি। গরুর সম্মান’ রক্ষার কথাও উল্লেখ করেন মুখ্যমন্ত্রী। সে তালিকাতেই ইউসিসি-কে পরবর্তী বড়ো পদক্ষেপ হিসাবে তুলে ধরেন তিনি।

ধর্মান্তর-বিরোধী আইন আনার দাবি অবশ্য নতুন নয়। বিজেপি দীর্ঘদিন ধরেই জোর করে বা প্রলোভন দেখিয়ে ধর্মান্তরের বিরুদ্ধে কড়া আইনের দাবি করে এসেছে। পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর সে দাবি আরও জোরালো হয়েছে।

শুভেন্দু অধিকারীও একাধিক বার জানিয়েছেনজোর করে ধর্মান্তকরণ, ‘লাভ জিহাদ’ কিংবা বিজেপির রাজনৈতিক প্রচারে ব্যবহৃত ল্যান্ড জিহাদ বরদাস্ত করা হবে না। দেশের একাধিক বিজেপি-শাসিত রাজ্যে ধর্মান্তর নিয়ে পৃথক আইন রয়েছে। উত্তরপ্রদেশগুজরাট, উত্তরাখণ্ড এবং মহারাষ্ট্রে ধর্মান্তর সংক্রান্ত আইনে বিভিন্ন ধরনের বিধিনিষেধ ও শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিশেষ করে ভিন্ন ধর্মে বিয়ে এবং ধর্ম পরিবর্তনের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। উত্তরপ্রদেশ ও উত্তরাখণ্ডের ধর্মান্তর-বিরোধী আইনের বিভিন্ন বিধান আদালতে চ্যালেঞ্জও হয়েছে। অসমেও অভিন্ন দেওয়ানি বিধির কাঠামোর মধ্যে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের বিয়ে নিয়ে বিধিনিষেধের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ বার সেই পথেই পশ্চিমবঙ্গ সরকার এগোবে কি নাতা নিয়ে জল্পনা শুরু হয়েছে।

জমি কেনাবেচার প্রসঙ্গটিও বিজেপির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বক্তব্যের সঙ্গে যুক্ত। ল্যান্ড জিহাদ’ শব্দটি ব্যবহার করে বিজেপি এর আগে অভিযোগ করেছেসীমান্তবর্তী এলাকায় পরিকল্পিত ভাবে  নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের মানুষ জমি কিনে জনবিন্যাস বদলানোর চেষ্টা করছেন। নির্বাচনী প্রচারেও এ অভিযোগ বার বার সামনে এসেছে। গুজরাট, অসম-সহ বিজেপি-শাসিত কয়েকটি রাজ্যে নির্দিষ্ট এলাকা বা সম্প্রদায়ের জমি কেনাবেচা নিয়ে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গেও সে ধরনের কোনো ব্যবস্থা আনার কথা কি ভাবছে সরকারমঙ্গলবার শুভেন্দুর বক্তব্যের পর সে প্রশ্নই নতুন করে উঠেছে। যদিও প্রস্তাবিত আইনের খসড়া বা তার পরিধি সম্পর্কে মুখ্যমন্ত্রী এখনো বিস্তারিত তথ্য দেননি।

প্রসঙ্গত, রাজ্যে ইউসিসি চালুর প্রস্তুতি ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি রঞ্জনা প্রকাশ দেশাইয়ের নেতৃত্বে ৯ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে রাজ্য সরকার। ইউসিসি-র খসড়া পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় সুপারিশ দেওয়ার দায়িত্ব ওই কমিটির। প্রস্তাবিত আইনে বিবাহবিবাহবিচ্ছেদউত্তরাধিকারউত্তরসূরিত্বদত্তক গ্রহণ এবং লিভ-ইন সম্পর্কের মতো বিষয়ে অভিন্ন দেওয়ানি কাঠামো তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। ধর্মভিত্তিক ব্যক্তিগত আইনের পরিবর্তে অভিন্ন আইনি ব্যবস্থা চালুর কথা বলা হয়েছে। তবে মূলনিবাসী, জনজাতি সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড় বা সুরক্ষা রাখা হবে। গত ২৯ জুন বিধানসভায় ইউসিসি আনার কথা ঘোষণা করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিজেপির ইস্তাহারেও ক্ষমতায় আসার ৬ মাসের মধ্যে ইউসিসি কার্যকর করার প্রতিশ্রুতি ছিল। ফলে সরকারের এ পদক্ষেপকে রাজনৈতিক ভাবেও তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল।

এদিন বাংলাদেশ থেকে আসা হিন্দু শরণার্থীদের বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন মুখ্যমন্ত্রী। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বা সিএএ-র অধীনে যাঁরা নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করবেনতাঁদের আবেদন নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত রেশনঅন্নপূর্ণা যোজনা কিংবা বার্ধক্যভাতার মতো সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা উচিত নয় বলে জানান তিনি। অন্যদিকেসম্প্রতি মসজিদ এবং মন্দির থেকে লাউডস্পিকার সরানোর অভিযান শুরু করেছে রাজ্য পুলিশ। ওই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে কলকাতা হাই কোর্টে মামলাও হয়েছে। তার মধ্যেই ধর্মান্তর এবং জমি কেনাবেচা নিয়ে নতুন আইনের ঘোষণা রাজনৈতিক মহলে ধর্মীয় ভেদাভেদ, অসহিষ্ণুতা ঘিরে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। 


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!