- দে । শ
- আগস্ট ১২, ২০২৬
১৯তম দিনে ঝাড়খণ্ডের বিক্ষোভ: সরকারের আশ্বাসেও অনড় পড়ুয়ারা, আন্দোলন আরও তীব্র করার হুঁশিয়ারি
নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগকে কেন্দ্র করে ঝাড়খণ্ডে পড়ুয়া ও চাকরিপ্রার্থীদের আন্দোলন বুধবার ১৯তম দিনে পড়ল। রাজ্য সরকারের তরফে নিয়োগ পরীক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কারের আশ্বাস দেওয়া হলেও তাতে সন্তুষ্ট নন আন্দোলনকারীরা। তাঁরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, তাঁদের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন প্রত্যাহারের কোনো প্রশ্নই নেই। বরং আগামী দিনে আরও তীব্র কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলে জানিয়েছেন ছাত্র নেতারা।
আন্দোলনকারীদের মূল অভিযোগ ঝাড়খণ্ড পাবলিক সার্ভিস কমিশন এবং ঝাড়খণ্ড স্টাফ সিলেকশন কমিশন–এর নিয়োগ পরীক্ষা ঘিরে। তাঁদের বক্তব্য, পরীক্ষার আয়োজন থেকে ফল প্রকাশ— পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। একাধিক নিয়োগ পরীক্ষা বাতিল করার দাবিও রয়েছে তাঁদের। পাশাপাশি, পরীক্ষায় কথিত অনিয়মের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত চান তাঁরা। সে তদন্ত সিবিআইকে দিয়ে করানোর দাবি যেমন রয়েছে, তেমনই ঝাড়খণ্ডের বাইরের অবসরপ্রাপ্ত হাই কোর্টের বিচারপতিদের নিয়ে কমিটি গড়ে তদন্তের দাবিও জানানো হয়েছে।
হেমন্ত সোরেন সরকারের তরফে বার বার পরীক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কারের আশ্বাস দেওয়া হলেও কেন আন্দোলন প্রত্যাহার করা হবে না, তারও ব্যাখ্যা দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। তাঁদের বক্তব্য, শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, দাবিগুলি নিয়ে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত এবং কার্যকর পদক্ষেপ চান তাঁরা। সে কারণেই টানা ১৯ দিন ধরে রাঁচীতে অবস্থান-বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছেন বিক্ষোভকারীরা। এরই মধ্যে সোমবার পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। রাজ্য বিধানসভার দিকে মিছিল করে যাওয়ার চেষ্টা করেন আন্দোলনকারীরা। তাঁদের আটকাতে পুলিশ ব্যারিকেড তৈরি করে। পরে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে জলকামান ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করা হয়। লাঠিও চালানো হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হয়। আন্দোলনকারীদের দাবি, পুলিশের পদক্ষেপে বেশ কয়েক জন পড়ুয়া আহত হয়েছেন। যদিও রাঁচী পুলিশের বক্তব্য, সংঘর্ষে তাদের ১৪ জন কর্মী আহত হয়েছেন।
পুলিশের এ পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে আন্দোলন দ্রুত রাজনৈতিক রং নেয়। মঙ্গলবার পুলিশের লাঠিচার্জের প্রতিবাদে রাজ্য জুড়ে বন্ধ পালন করে বিজেপি। বন্ধের প্রভাব পড়ে একাধিক জেলায়। কোথাও রাস্তা অবরোধ করা হয়, কোথাও বন্ধ থাকে বাজার ও দোকানপাট। বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও বন্ধ ছিল। ফলে রাজ্যের বিভিন্ন অংশে স্বাভাবিক জনজীবন ব্যাহত হয়।বিজেপির অভিযোগ, চাকরিপ্রার্থীদের আন্দোলন দমন করার চেষ্টা করছে কংগ্রেস জোটের ‘জেএমএম’ নেতৃত্বাধীন হেমন্ত সোরেন সরকার। নিয়োগ পরীক্ষায় কথিত অনিয়মের অভিযোগের তদন্তে স্বাধীন তদন্তকারী সংস্থা নিয়োগের দাবি তোলে বিজেপি। তাদের বক্তব্য, পড়ুয়া ও চাকরিপ্রার্থীদের প্রশ্নের জবাব দেওয়ার পরিবর্তে সরকার তাঁদের আন্দোলন থামানোর চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে ধর্নাস্থলে গভীর রাতে সরকারি আধিকারিকদের উপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তোলে বিরোধী দল।
অন্যদিকে, মঙ্গলবার বিধানসভার দিকে মিছিল করে এবিভিপি। তাদের মিছিল ঘিরেও পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়। আটক করা হয় বহু বিক্ষোভকারীকে। একই দিনে জেপিএসসি-জেএসএসসি সংস্কার মঞ্চের ব্যানারে একটি নীরব মিছিল বার করা হয়। রাঁচীর জয়পাল সিংহ মুন্ডা স্টেডিয়াম থেকে মিছিলটি যায় আলবার্ট এক্কা চকের দিকে। হাতে পোস্টার বা স্লোগানের বদলে নীরব মিছিলের মাধ্যমে নিজেদের দাবির কথা তুলে ধরা হয়। আন্দোলনকারীদের নেতৃত্বের তরফে জানানো হয়েছে, সরকারের সঙ্গে একাধিক দফায় আলোচনা হলেও এখনও তাঁদের মূল দাবিগুলি নিয়ে গ্রহণযোগ্য সমাধান মেলেনি। তাই আন্দোলন চলবে। খুব শীঘ্রই নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করে বিক্ষোভ আরও তীব্র করা হবে বলেও জানানো হয়েছে।
আন্দোলন দীর্ঘায়িত হওয়ার প্রভাব পড়েছে বিক্ষোভকারীদের স্বাস্থ্যের উপরেও। ৬ জন পড়ুয়া অনির্দিষ্টকালের জন্য অনশন করছেন। তাঁদের মধ্যে ২ জনের শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় রাঁচী সদর হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে খাবার না খাওয়ায় তাঁদের শারীরিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আন্দোলনের অন্যতম মুখ ছাত্রনেতা দেবেন্দ্রনাথ মাহতো প্রায় ১০ দিন ধরে অনশন করছেন। বর্তমানে তিনি রাঁচী সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ভর্তি। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, তাঁর অবস্থা আপাতত স্থিতিশীল। তবে তিনি খাবার খেতে রাজি হচ্ছেন না। চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তরফে বার বার অনশন প্রত্যাহারের আবেদন জানানো হলেও তিনি নিজের অবস্থানে অনড় রয়েছেন। তাঁর রক্তচাপ ও রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়মিত পরীক্ষা করা হচ্ছে। অন্য আন্দোলনকারী রাহুল ক্রান্তির অবস্থাও এক সময় উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছিল। পালামুর বাসিন্দা রাহুল ৪ আগস্ট জয়পাল সিংহ মুন্ডা স্টেডিয়ামে অনশন শুরু করেন। ৭ আগস্ট শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, বর্তমানে তাঁর রক্তচাপ-সহ অন্যান্য শারীরিক মাপকাঠি স্বাভাবিক রয়েছে।
সরকার এবং আন্দোলনরত পড়ুয়াদের মধ্যে সমঝোতার চেষ্টা হিসেবে রবিবার ষষ্ঠ দফার বৈঠক হয়। কিন্তু সে বৈঠকেও কোনো সমাধানসূত্র বার করতে পারেনি। বৈঠকের পর দু–পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে আলোচনায় যথেষ্ট গুরুত্ব না দেওয়ার অভিযোগ তোলে। ফলে আলোচনার টেবিলেও অচলাবস্থা কাটেনি। মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন অবশ্য আন্দোলনকারীদের দাবির বিষয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। তাঁর বক্তব্য, পড়ুয়াদের সমস্যার প্রতি সরকার সংবেদনশীল এবং তাঁদের দাবিগুলি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হচ্ছে। নিয়োগ পরীক্ষা ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় সংস্কার আনার ব্যাপারেও সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে জানিয়েছেন তিনি। আন্দোলনকারীদের দেওয়া অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আশ্বাস হলো ‘১৪তম জেপিএসসি পরীক্ষা’ বাতিল করা হবে। সোরেনের আরও বক্তব্য, পড়ুয়াদের সমস্যার সমাধান সরকার আলোচনার মাধ্যমেই করতে চায়। কিন্তু বিজেপি এই আন্দোলনকে রাজনৈতিক মঞ্চে পরিণত করার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। তাঁর দাবি, চাকরিপ্রার্থীদের প্রকৃত সমস্যার সমাধানের পরিবর্তে বিরোধীরা রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে চাইছে।
এদিকে, পড়ুয়াদের আন্দোলনের অভিঘাত পৌঁছে গিয়েছে ঝাড়খণ্ড বিধানসভাতেও। মঙ্গলবার বিধানসভার অধিবেশন কার্যত অচল হয়ে যায়। পড়ুয়াদের উপর পুলিশের কথিত লাঠিচার্জের প্রতিবাদে বিরোধীরা সরব হন। অন্যদিকে, সরকার পক্ষও বিরোধীদের আক্রমণের জবাব দেয়। বার বার স্লোগান, বিক্ষোভ এবং ওয়েলে নেমে প্রতিবাদের জেরে স্বাভাবিক ভাবে বিধানসভার কাজ চালানো সম্ভব হয়নি। অধিবেশনের শুরুতেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। কংগ্রেস বিধায়ক প্রদীপ যাদব ছাত্র আন্দোলনের প্রসঙ্গ তোলেন। তার পরেই বিজেপির বিধায়কেরা পোস্টার হাতে বিধানসভার ওয়েলে নেমে স্লোগান দিতে শুরু করেন। যাদব অভিযোগ করেন, পড়ুয়ারা শান্তিপূর্ণ ভাবে আন্দোলন করছিলেন, বিরোধীরা অসামাজিক শক্তিকে আড়াল করার চেষ্টা করছে। তাঁর এই মন্তব্যের পর বিজেপি বিধায়কদের সঙ্গে শাসক জোটের সদস্যদের তীব্র বাদানুবাদ শুরু হয়। দুই পক্ষের বিধায়কেরাই ওয়েলে নেমে পড়েন। স্লোগান এবং হইচই চলতে থাকায় শেষ পর্যন্ত দুপুর পর্যন্ত অধিবেশন মুলতুবি করতে বাধ্য হন স্পিকার।
অধিবেশন ফের শুরু হওয়ার পরেও বিরোধীদের অবস্থানে কোনও পরিবর্তন হয়নি। পড়ুয়াদের উপর পুলিশের লাঠিচার্জের ঘটনায় সরকারের কাছে জবাবদিহি দাবি করতে থাকেন তাঁরা। বিরোধীদের আক্রমণের জবাবে মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন অভিযোগ করেন, ছাত্র আন্দোলনকে রাজনৈতিক প্রচারের হাতিয়ার করার চেষ্টা চলছে। ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী বিজেপিকে আক্রমণ করে বলেন, বিরোধীরা নিজেদের রাজনৈতিক শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। এখন পড়ুয়াদের আন্দোলনের আড়ালে নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব তুলে ধরার চেষ্টা করছে। তিনি বিরোধীদের ‘পরজীবী’ বলেও কটাক্ষ করেন। তাঁর বক্তব্য ঘিরে শাসক ও বিরোধী বেঞ্চের মধ্যে ফের উত্তেজনা ছড়ায়।
বিধানসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে সোরেন আরও বলেন, সরকার ইতিমধ্যেই কয়েকটি পরীক্ষা বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যেখানে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে, সেখানেও তদন্তের ব্যবস্থা করা হবে। তাঁর দাবি, চাকরিপ্রার্থীদের বৃহত্তর স্বার্থের কথা মাথায় রেখেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। শুধু পরীক্ষা বাতিল বা তদন্তেই নয়, ভবিষ্যতে যাতে নিয়োগ পরীক্ষা নিয়ে একই ধরনের বিতর্ক তৈরি না হয়, তার জন্য পরীক্ষা ব্যবস্থায় কাঠামোগত পরিবর্তনের কথাও বলেছেন মুখ্যমন্ত্রী। এ বিষয়ে আইআইটি, আইআইএম, এক্সএলআরআই –এর মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পরামর্শ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি। পরীক্ষা পরিচালনা থেকে মূল্যায়ন—পুরো ব্যবস্থায় কী ভাবে কাঠামোগত সংস্কার আনা যায়, তা নিয়ে ওই প্রতিষ্ঠানগুলির মতামত নেওয়া হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
তবে সরকারের এই আশ্বাসেও আন্দোলনের ঝাঁজ কমেনি। বিরোধীরাও পড়ুয়াদের উপর পুলিশের পদক্ষেপের দায় নিয়ে সরকারের কাছে জবাব চাইতে অনড়। ফলে এক দিকে রাঁচীর রাজপথে অনশন, অবস্থান ও মিছিল, অন্য দিকে বিধানসভার ভিতরে স্লোগান ও রাজনৈতিক চাপানউতোর—দু–দিকেই ক্রমশ তীব্র হচ্ছে সংঘাত। বুধবার ১৯তম দিনেও আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে। আগামী দিনে আন্দোলনের নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলেও জানিয়েছেন জেপিএসসি-জেএসএসসি সংস্কার মঞ্চ–এর নেতারা। ফলে ঝাড়খণ্ডে পরীক্ষা-সংক্রান্ত এই অচলাবস্থা শীঘ্রই কাটার কোনো লক্ষণ আপাতত দেখা যাচ্ছে না।
❤ Support Us






