- দে । শ
- আগস্ট ১২, ২০২৬
আইএসআই যোগ সন্দেহে হাবড়ায় পাকিস্তানি নাগরিক গ্রেফতার, তপসিয়া থেকে ধৃত আরও এক যুবক
স্বাধীনতা দিবসের আগে রাজ্যে ফের পাক-যোগের অভিযোগে গ্রেফতার। পাকিস্তানের গুপ্তচর সংস্থা ‘আইএসআই’-এর সঙ্গে যোগাযোগের সন্দেহে উত্তর ২৪ পরগনার হাবড়া থেকে এক পাকিস্তানি নাগরিককে গ্রেফতার করল রাজ্য পুলিশের স্পেশ্যাল টাস্ক ফোর্স (এসটিএফ)। ধৃতের নাম ওয়াহাব আলম ওরফে রানা রউফ। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করে কলকাতার তপসিয়া থেকে মহম্মদ ইজাজ নামে আরও এক যুবককে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে তদন্তকারীদের সূত্রে খবর।
তদন্তকারীদের প্রাথমিক অনুমান, রানা ‘আইএসআই’-এর ‘হ্যান্ডলার’ হিসাবে কাজ করতেন। শুধু তা-ই নয়, পাক সেনার সঙ্গেও তাঁর যোগাযোগ ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। গোয়েন্দাদের দাবি, ভারতের সেনাবাহিনী এবং রেল পরিকাঠামোর গতিবিধি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতেন অভিযুক্ত ব্যক্তি। সে তথ্য পাকিস্তানে পাঠানো হতো কি না, কী ধরনের তথ্য তাঁর হাতে পৌঁছেছিল— এখন তদন্তের মূল নজর সেখানেই।
‘এসটিএফ’ সূত্রে জানা গিয়েছে, ধৃত রানা পাকিস্তানের ফয়সালাবাদের বাসিন্দা। ২০১২ সালে নেপাল হয়ে বে–আইনি ভাবে ভারতে ঢুকেছিলেন তিনি। তার পর থেকে পরিচয় গোপন করে এ দেশে বসবাস করছিলেন বলে তদন্তকারীদের দাবি। নেপালের কাঠমান্ডুকে কেন্দ্র করে ‘আইএসআই’-এর হয়ে কাজ করতেন তিনি, প্রয়োজন অনুযায়ী ভারতে ঢুকে বিভিন্ন জায়গায় ঘোরাফেরা করতেন বলেও সন্দেহ গোয়েন্দাদের। সম্প্রতি কাঁকড়ভিটা সীমান্ত দিয়ে রানা ভারতে ঢুকেছিলেন বলে তদন্তকারীদের সূত্রে খবর। এর আগেও একাধিক বার তিনি ভারতে এসেছিলেন বলে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে। কলকাতার তপসিয়া এলাকায় থাকার সময় স্থানীয় ভাবে বিভিন্ন কাজকর্মও করতেন তিনি। সে সময় নিজের আসল পরিচয় আড়াল করতে ‘ওয়াহাব আলম’ নামে আধার কার্ড, ভোটার কার্ড-সহ একাধিক নথি তৈরি করেছিলেন বলে অভিযোগ।
আর সেই জাল পরিচয়পত্র তৈরির সূত্র ধরেই তদন্তকারীদের নজরে আসেন ইজাজ। রানাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তপসিয়ার ওই যুবকের সন্ধান মেলে। পরে সেখানে অভিযান চালিয়ে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। তদন্তকারীদের দাবি, রানা যাতে ভুয়ো পরিচয়ে এ দেশে থাকতে পারেন, সে কাজে ইজাজ তাঁকে সাহায্য করতেন। রানা এবং ইজাজের যোগাযোগ কত দিনের, তাঁদের মধ্যে ঠিক কী ধরনের লেনদেন হত এবং এই কাজে আরও কেউ যুক্ত ছিলেন কি না— তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। দু–জনের মোবাইল ফোন, ডিজিটাল যোগাযোগ এবং বিভিন্ন নথি পরীক্ষা করে তাঁদের যোগাযোগের পরিধি জানার চেষ্টা করছেন গোয়েন্দারা।
তবে, তদন্তে আরও একটি বিষয় বিশেষ ভাবে ভাবাচ্ছে ‘এসটিএফ’-কে। রানা কেন ভারতীয় সেনাবাহিনী ও রেল পরিকাঠামো সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করছিলেন? কোন কোন জায়গা তাঁর নজরে ছিল? সে তথ্য কি নিয়মিত ভাবে পাকিস্তানে পাঠানো হতো? না কি কোনো বড়ো নাশকতার প্রস্তুতির জন্যই তথ্য সংগ্রহ? একের পর এক প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তদন্তকারীরা।শুধু তথ্য সংগ্রহের অভিযোগেই তদন্ত থেমে থাকছে না। পশ্চিমবঙ্গ বা দেশের অন্য কোথাও নাশকতার কোনো পরিকল্পনা ছিল কি না, রানার সঙ্গে পাকিস্তানের আর কারও সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে কি না এবং রাজ্যে তাঁর কোনো নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছিল কি না— সব দিকই খতিয়ে দেখা হচ্ছে। স্বাধীনতা দিবসের মুখে সেনা ও রেলের মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোকে ঘিরে এমন অভিযোগ সামনে আসায় নিরাপত্তা মহলেও তৎপরতা বেড়েছে। ধৃতদের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া নথি, মোবাইল ফোন ও অন্যান্য ডিজিটাল সামগ্রী পরীক্ষা করে কোনো গোপন যোগাযোগের সূত্র পাওয়া যায় কি না, সে দিকেও নজর রয়েছে তদন্তকারীদের।
উল্লেখ্য, এর আগে গত ৩০ জুলাই বর্ধমান শহর লাগোয়া রেনেসাঁ টাউনশিপ থেকে হামিম মণ্ডল নামে এক যুবককে গ্রেফতার করেছিল ‘এসটিএফ’। তাঁর সঙ্গে ‘আইএসআই’ এবং পাকিস্তানি গ্যাংস্টার শাহজাদ ভাট্টির গোষ্ঠীর যোগাযোগ ছিল বলে অভিযোগ তদন্তকারীদের। একই মামলায় হামিমের বান্ধবী অর্পিতা সরকার এবং আদিত্য সিংহ ওরফে রাজকেও গ্রেফতার করা হয়। ওই মামলায়ও উঠে এসেছিল ‘হানিট্র্যাপ’-এর অভিযোগ। তদন্তকারীদের দাবি ছিল, সমাজমাধ্যমের মাধ্যমে পাক হ্যান্ডলারদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন অর্পিতা। নেতা, মন্ত্রী ও আমলাদের প্রেমের ফাঁদে ফেলে তাঁদের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করা হত বলেও অভিযোগ। হামিমের কাছ থেকে মুখ্যমন্ত্রীর গতিবিধি সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া গিয়েছিল বলে এসটিএফ সূত্রে দাবি করা হয়েছিল। একই সঙ্গে আদিত্য সিংহের বিরুদ্ধে রাজ্যের প্রতিমন্ত্রী উমেশ রাই ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের ছবি হামিম ও অর্পিতার কাছে পাঠানোর অভিযোগও সামনে আসে।
সে ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই ফের পাকিস্তানি নাগরিক গ্রেফতার হওয়ায় প্রশ্ন উঠছে, পশ্চিমবঙ্গকে কি ‘আইএসআই’-এর কোনো বড়ো নেটওয়ার্কের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছিল ? হাবড়া থেকে ধৃত রানা রউফের সঙ্গে বর্ধমান-কাণ্ডের কোনও যোগ রয়েছে কি না, সে সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে খবর। তবে তদন্তকারীদের সমস্ত অভিযোগই আপাতত প্রাথমিক পর্যায়ের। আদালতে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত ধৃতদের দোষী বলা যায় না। এখন ‘এসটিএফ’-এর সামনে সবচেয়ে বড়ো প্রশ্ন— রানার আসল পরিচয় কী, তাঁর সঙ্গে ‘আইএসআই’-এর যোগাযোগ কতটা গভীর, আর ভারতীয় সেনা ও রেল সম্পর্কে তিনি ঠিক কী তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন। রানাকে জেরা করেই সেসব প্রশ্নের জট খুলতে চাইছেন তদন্তকারীরা।
❤ Support Us







