Advertisement
  • প্রচ্ছদ রচনা বি। দে । শ
  • সেপ্টেম্বর ২, ২০২৬

নেপালে বন্যায় মৃত ১১২৭, নিখোঁজ প্রায় ৫ হাজার! বিপদসীমার উপরে তিন নদী, সতর্ক ইউপি-বিহার

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
নেপালে বন্যায় মৃত ১১২৭, নিখোঁজ প্রায় ৫ হাজার! বিপদসীমার উপরে তিন নদী, সতর্ক ইউপি-বিহার

হিমালয়ের কোলে ভয়াবহ বিপর্যয়ের আট দিন পরেও নেপালে স্বাভাবিক হয়নি পরিস্থিতি। বরং যত সময় গড়াচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে ধ্বংসের ব্যাপকতা। হড়পা বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১১২৭। এখনো নিখোঁজ ৪৮৫৮ জন। তাঁদের মধ্যে কত জন জীবিত রয়েছেন, আর কত জনের পরিণতি হয়েছে বন্যার স্রোত, কাদা ও ধ্বংসস্তূপের নীচে— তার উত্তর অজানা। বুধবারও যুদ্ধকালীন তৎপরতায় তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকারীরা।

নেপাল পুলিশের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, চিতওয়ান থেকে সবচেয়ে বেশি ৩৪৮টি দেহ উদ্ধার হয়েছে। নওয়ালপরাসি ইস্টে উদ্ধার হয়েছে ২১৭টি, নওয়ালপরাসি ওয়েস্টে ১৯০টি এবং নুয়াকোটে ১৫৫টি দেহ। এ ছাড়াও গোরখা থেকে ৬৬টি, ধাদিং থেকে ৫৯টি, রাসুওয়া থেকে ৪৫টি এবং তানাহুন থেকে ৩৮টি দেহ উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া দেহগুলির মধ্যে ১১১৩টির ময়নাতদন্ত এবং ডিএনএ ভিত্তিক পরিচয় শনাক্ত করার প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই শেষ হয়েছে। ৯৫টি দেহ পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখনো ৯১১টি দেহ শনাক্ত করা যায়নি। নিখোঁজ পরিজনদের খোঁজে থাকা পরিবারগুলিকে সাহায্য করতে ওই দেহগুলির বিস্তারিত তথ্য নেপাল পুলিশের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।

বিপর্যয়ের পর থেকেই উদ্ধার ও ত্রাণকাজে নেমেছে নেপালের নিরাপত্তাবাহিনী। দুর্গত এলাকাগুলিতে ৭৯১২ জন কর্মীকে মোতায়েন করা হয়েছে। উদ্ধারকাজের পাশাপাশি ত্রাণ বিলি আর উদ্ধার হওয়া মৃতদেহের ব্যবস্থাপনাতেও তাঁরা কাজ করছেন। উচ্চঝুঁকির এলাকা থেকে পরিবারগুলিকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। বন্যা ও ধসের জেরে ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়া রাস্তাগুলি পরিষ্কার করার কাজও চলছে। স্থানীয় প্রশাসন ও বাসিন্দাদের সঙ্গে সমন্বয় রেখে তল্লাশি, উদ্ধার ও ত্রাণের কাজ চালাচ্ছেন পুলিশকর্মীরা। তবে নিখোঁজদের সংখ্যা এখনো প্রধান উদ্বেগের কারণ। ৪৮৫৮ জনের সন্ধানে একাধিক এলাকায় চলছে তল্লাশি। কোথাও ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে, কোথাও নদীর গতিপথ ধরে, আবার কোথাও দুর্গম এলাকায় পৌঁছে খোঁজ চালানো হচ্ছে।

গত ২৬ আগস্ট নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছে বরফ ও পাথরের স্তূপ ধসে অথবা তুষারধসের জেরে আকস্মিক বন্যার সূত্রপাত বলে মনে করা হচ্ছে। সে জলের স্রোতে উত্তর ও মধ্য নেপালের একাধিক শহর ও গ্রাম কার্যত তছনছ হয়ে যায়। ভেসে যায় ঘরবাড়ি, রাস্তা। বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে যোগাযোগ ব্যবস্থাও।  ঠিক কী কারণে বরফ ও পাথরের স্তূপ ধসে পড়েছিল, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে ভয়াবহ এ বিপর্যয়ের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের যোগসূত্র নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহও ঘটনাটিকে ‘সাধারণ’ বন্যা বলে মানতে নারাজ। সোমবার গভীর রাতে সামাজিক মাধ্যমে তিনি বলেছেন, রাসুওয়ার ভোতে কোশি নদীর বন্যা কোনো সাধারণ বন্যা নয়। হিমালয় অঞ্চলে তুষার ও বরফের ধসের কারণে তৈরি এ বিপর্যয় ওই অঞ্চলের অন্যতম বড়ো দুর্যোগ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।শাহের বক্তব্য, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে হিমালয় অঞ্চলে বিপদের ঝুঁকিও বাড়ছে। বিশ্ব জুড়ে হিমবাহ দ্রুত গলছে। তার প্রভাব পড়ছে বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতমালা হিমালয়েও। এ পরিস্থিতিতে গোটা অঞ্চলকে আরও সতর্ক থাকতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক পদক্ষেপেরও আহ্বান জানিয়েছেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী।

নেপালের ভয়াবহ বন্যায় শুধু স্থানীয় বাসিন্দারাই নয়, বহু বিদেশি নাগরিকও নিখোঁজ হয়েছেন। নেপালে নিখোঁজ বিদেশিদের মধ্যে রয়েছেন ৩০টিরও বেশি দেশের ৫৮৩ জন নাগরিক। অন্য দিকে, চিনে ২৩টি দেশের ২৬১ জন বিদেশি নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন। নেপালে নিখোঁজ বিদেশিদের মধ্যে ভারতীয়দের সংখ্যা বহু। দিল্লির তথ্য অনুযায়ী, ২৭৫ জন ভারতীয় নাগরিক এবং ভারতীয় বংশোদ্ভূত আরও ১২৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। আমেরিকার ৮৫ জন নাগরিকও নিখোঁজ বলে জানিয়েছে মার্কিন বিদেশ দফতর। বিভিন্ন রিপোর্টে নেপালের পর্যটন কর্তৃপক্ষ এবং বিভিন্ন দেশের দূতাবাসের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, নিখোঁজদের মধ্যে ৬২ জন ইউক্রেনীয়, ৫১ জন মালয়েশীয়, ৪২ জন অস্ট্রেলীয় এবং ৩৩ জন ব্রিটিশ নাগরিক রয়েছেন।

একদিকে যেমন যুদ্ধকালীন তৎপরতায় উদ্ধারকাজ চলছে, অন্যদিকে নতুন করে বন্যার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে নেপালে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টির জেরে তিনটি প্রধান নদীর জলস্তর সতর্কতামাত্রা ছাড়িয়েছে। বুধবার মধ্য, পশ্চিম এবং পূর্ব নেপালের বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছে প্রশাসন। আবহাওয়া দফতরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২ সেপ্টেম্বর সকাল ৬টা পর্যন্ত সিন্ধুলি জেলার সুন কোশি, গোরখার বুধি গণ্ডকী ও দাদেলধুরার মহাকালী নদীর জলস্তর বিপদসীমার উপর দিয়ে বইছে। এর আগে মঙ্গলবার রাতে লামজুং জেলার ভুকুন্দেবেসি জলস্তর পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে মার্সিয়াংদি নদীর জল বিপদসীমা ছাড়িয়ে যায়। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সে নদীর জলস্তর এখনো বাড়ছে। ফলে নদীর নিম্ন অববাহিকায় বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। জলের প্রবাহ আরও বাড়লে পরিস্থিতি দ্রুত খারাপ হতে পারে বলে আশঙ্কা। তাই নদীর নিম্নাঞ্চলে বসবাসকারী মানুষকে বিশেষ সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ‘ন্যাশনাল ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অথরিটি’-ও বাসিন্দাদের সতর্ক করেছে। নেপালে এখনও সক্রিয় মৌসুমি বায়ু। দেশের বিভিন্ন অংশে লাগাতার বৃষ্টি হচ্ছে। রাজধানী কাঠমান্ডুতেও বৃষ্টির প্রভাব রয়েছে। ফলে সদ্য ভয়াবহ বন্যার ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই নতুন করে জলবৃদ্ধির আশঙ্কা প্রশাসনের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

প্রতিবেশী দেশের ভয়াবহ হড়পা বানের অভিঘাত পড়েছে ভারতেও। উত্তরপ্রদেশে নেপাল থেকে বয়ে আসা নদীগুলি থেকে এ পর্যন্ত ১৭টি মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছে। এগুলিকে নেপালের বন্যায় মৃতদের দেহ বলে মনে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দেহগুলির পরিচয় শনাক্ত করার চেষ্টা করছে। তবে ওই ১৭টি দেহ নেপালের সরকারি মৃতের সংখ্যার মধ্যে ধরা হয়নি। নেপালের দুর্গত এলাকায় এখনো বহু পরিবারের কাছে প্রিয়জনের কোনো খবর নেই। এক সপ্তাহ ধরে তাঁদের অপেক্ষা। কেউ এখনো আশায় রয়েছেন, কেউ আবার সমস্ত আশা ছেড়ে দিয়ে নিখোঁজ স্বজনের আত্মার শান্তি কামনায় প্রতীকী শেষকৃত্য শুরু করেছেন। বন্যার স্রোতে ভেসে যাওয়া গ্রাম ও ঘরবাড়ির স্মৃতি ঘিরে সেখানে শোকের আবহ আরও ঘন হয়েছে।

উত্তরপ্রদেশেও নদীর জলস্তর নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বারাণসীতে বুধবার গঙ্গার জল সতর্কতামাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার পরে সমস্ত নৌকা চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে জেলা প্রশাসন। বন্যাকবলিত এলাকাগুলিতে বাড়ানো হয়েছে নজরদারি।  কেন্দ্রীয় জল কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, বারাণসীতে গঙ্গার জলস্তর ৭০.২৯ মিটারে পৌঁছেছে। সেখানে সতর্কতামাত্রা ৭০.২৬ মিটার। বিপদসীমা ৭১.২৬ মিটার। সর্বোচ্চ বন্যার জলস্তর ৭৩.৯০ মিটার। পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে গঙ্গায় নৌকা চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। পুণ্যার্থী ও সাধারণ মানুষকে ঘাটে না যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে প্রশাসন। তীব্র স্রোত রয়েছে এমন এলাকায়ও না যাওয়ার জন্য সতর্ক করা হয়েছে। গঙ্গার পাশাপাশি বরুণা নদীর জলস্তরের উপরও নজর রাখছেন প্রশাসনের আধিকারিকেরা। জল বাড়ায় জেলার প্রায় ১১টি এলাকা ও ওয়ার্ড আংশিক ভাবে প্লাবিত হয়েছে। বরুণা নদীর বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ৩২৮টি পরিবার। মোট আক্রান্তের সংখ্যা ১৩৮৮।

প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, পরিস্থিতির প্রয়োজন অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। পাশাপাশি ত্রাণ ও উদ্ধারকাজের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। ইতিমধ্যে জেলায় ১৩টি ত্রাণশিবির খোলা হয়েছে। সেখানে ২১৯টি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের ৯৩৫ জন আশ্রয় নিয়েছেন। জেলা শাসক সত্যেন্দ্র কুমার আধিকারিকদের সতর্ক থাকতে এবং বন্যাকবলিত এলাকাগুলিতে নিয়মিত নজরদারি চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন। পরিস্থিতির অবনতি হলে দ্রুত বাসিন্দাদের নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশও দিয়েছেন তিনি। পুলিশ কমিশনার মোহিত আগরওয়াল পুলিশ এবং জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী-কে বন্যাকবলিত এলাকায় লাগাতার নজরদারি চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন। কোনো জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হলে দ্রুত পদক্ষেপ করার কথাও বলা হয়েছে।

নেপাল থেকে বন্যার জল ঢুকছে বিহারের বিভিন্ন এলাকাতেও। সে জলের সঙ্গে অচেনা প্রজাতির মাছ ভেসে আসার খবর মিলেছে। ওই মাছ খেয়ে কয়েক জন অসুস্থ হয়েছেন বলেও জানা যাচ্ছে। এর পরেই অচেনা মাছ না খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্দেশে সতর্কবার্তা জারি করেছে বিহার সরকার। মঙ্গলবার ‘ডিপার্টমেন্ট অব ডেয়ারি, অ্যানিম্যাল অ্যান্ড ফিশারিজ রিসোর্সেস’-এর তরফে ওই নির্দেশিকা জারি করা হয়। নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, বন্যার সময় পুকুর, নদী, হ্রদ, জলাধার থেকে মাছ ভেসে গিয়ে বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে পারে। সেসব মাছ দীর্ঘ সময় ধরে খোলা নর্দমা, মৃত প্রাণী, পচনশীল বর্জ্যের সংস্পর্শে থাকতে পারে। ফলে ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস আর ছত্রাকের মাধ্যমে দূষিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

দফতরের বক্তব্য, এ ধরনের মাছ খাওয়া স্বাস্থ্যের পক্ষে বিপজ্জনক। পরিবেশ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এবং প্রাকৃতিক দূষণকারী পদার্থ ও রোগজীবাণুর ঝুঁকি কমে না যাওয়া পর্যন্ত বন্যার জল থেকে ধরা মাছ না খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। মাছ খাওয়ার পরে কারও বমি, ডায়রিয়া, পেটে ব্যথা, মাথা ঘোরা, শ্বাসকষ্ট কিংবা অন্য কোনও অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত নিকটবর্তী স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে প্রশাসন। অচেনা মাছ দেখা গেলে সংশ্লিষ্ট জেলার মৎস্য আধিকারিক অথবা স্থানীয় প্রশাসনকে খবর দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।


  • Tags:
❤ Support Us
Advertisement
error: Content is protected !!