- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- আগস্ট ২৯, ২০২৬
বিপন্ন মধ্য-পূর্ব হিমালয়, নেপালের হড়পা বাংলার জন্যও সতর্কবার্তা ? ‘বিপজ্জনক’ হিমবাহ-হ্রদ নিয়ে উদ্বেগ ভূবিজ্ঞানীদের
হিমালয়ের বুকে ঘনাচ্ছে আশঙ্কা আর বিপদের পুঞ্জীভূত মেঘ। কোথাও দ্রুত গলছে হিমবাহ, কোথাও তার গলনজলে তৈরি হচ্ছে নতুন হ্রদ, আবার কোথাও সেসব হ্রদের চারপাশে জমে থাকা পাথর-নুড়ির প্রাকৃতিক বাঁধ ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে। তার সঙ্গে যোগ হচ্ছে অল্প সময়ে প্রবল বৃষ্টি, মেঘভাঙা বৃষ্টি, ভূমিধস আর পাহাড়ের ঢালের অস্থিতিশীলতা। ফলে হিমালয়ের কোনো একটি প্রান্তে তৈরি হওয়া বিপর্যয় নদীখাত ধরে নেমে এসে বহু দূরের জনপদকেও বিপন্ন করে তুলতে পারে।
নেপালের সাম্প্রতিক ভয়াবহ হড়পা বান সে আশঙ্কাকেই আরও প্রকট করেছে। ভূবিজ্ঞানীদের একাংশের বক্তব্য, নেপালের ঘটনাকে শুধু একটি বিচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক বিপর্যয় হিসাবে দেখলে ভুল হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের জেরে হিমালয়ের ভূপ্রকৃতিতে যে দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে, তার সঙ্গে এ ধরনের দুর্যোগের সম্পর্ক ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। আর ঠিক সে কারণেই নেপালের বিপর্যয় থেকে শিক্ষা নিয়ে সিকিম, উত্তরবঙ্গ, ভুটান এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের হিমালয় সংলগ্ন এলাকাতেও আগাম প্রস্তুতি ও নজরদারি বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন তাঁরা।
হিমবাহ সঙ্কুচিত হলে তার সামনে কিংবা উপরে গলিত জল জমে হ্রদ তৈরি হয়। অনেক ক্ষেত্রে সেসব হ্রদের প্রাকৃতিক বাঁধ তৈরি হয় হিমবাহ থেকে নেমে আসা নুড়ি, পাথর, বালি এবং অন্যান্য শিলাখণ্ডের স্তূপে। ভূবিজ্ঞানের পরিভাষায় সেই প্রাকৃতিক বাঁধকে বলা হয় ‘মোরেন’। বাইরে থেকে স্থায়ী মনে হলেও এ ধরনের প্রাকৃতিক বাঁধ সব সময় সমান শক্তিশালী নয়। হিমবাহের ধস, অতিবৃষ্টি, মেঘভাঙা বৃষ্টি, তুষার বা বরফধস কিংবা ভূমিকম্পের মতো ঘটনায় বাঁধ ভেঙে গেলে হ্রদের জল কয়েক মিনিটের মধ্যে নীচের দিকে ধেয়ে যেতে পারে। বিপুল জলরাশির সঙ্গে মিশে যায় কাদা, পাথর, বরফ আর পাহাড়ের ধ্বংসাবশেষ। তৈরি হয় ভয়াবহ হড়পা বান। এ ঘটনাকেই বলা হয় ‘গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড’ বা ‘জিএলওএফ’।
আন্তর্জাতিক পর্বত গবেষণা সংস্থা ‘ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট’ (ইসিমোড)-এর ২০২০ সালের একটি সমীক্ষায় মধ্য ও পূর্ব হিমালয়ে ৪৭টি সম্ভাব্য বিপজ্জনক হিমবাহ-হ্রদ চিহ্নিত করা হয়েছিল। তার মধ্যে ২১টি নেপালে, ২৫টি তিব্বত-নেপাল অঞ্চলে এবং একটি ভারতে ছিল বলে সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়। তবে শুধু হ্রদের সংখ্যা নয়, কোন হ্রদ কত দ্রুত বাড়ছে, তার চারপাশের প্রাকৃতিক বাঁধ কতটা স্থিতিশীল, হ্রদ ভেঙে গেলে কোন নদীখাত দিয়ে জল নামবে এবং সে পথে কতটা জনবসতি ও পরিকাঠামো রয়েছে— সব মিলিয়েই ঝুঁকি নির্ধারণ করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞেরা। নেপালের সাম্প্রতিক ঘটনার দিকে তাকিয়ে সিকিমের ২০২৩ সালের বিপর্যয়ের কথা ফের সামনে আনছেন ভূবিজ্ঞানীরা।
২০২৩ সালের ৪ অক্টোবর সিকিমের সাউথ লোনাক হ্রদ ভেঙে ভয়াবহ হড়পা বান নেমেছিল। তিস্তার জল আচমকা ফুলে ওঠে। চুংথাঙে নদীর উপর থাকা বাঁধ এবং একাধিক পরিকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নদীখাত ধরে সেই বিপুল জলরাশি নেমে আসে উত্তরবঙ্গের দিকে। তিস্তাবাজার, সেবক-সহ বিস্তীর্ণ এলাকায় তার প্রভাব পড়ে। হ্রদ ভাঙার পিছনে অতিবৃষ্টি এবং মেঘভাঙা বৃষ্টির ভূমিকা ছিল বলে মনে করা হয়েছিল। কিন্তু ভূবিজ্ঞানীদের মতে, এ ধরনের ঘটনাকে শুধু ‘মেঘভাঙা বৃষ্টির ফল’ বলে ব্যাখ্যা করা যথেষ্ট নয়। হিমবাহের গলন, হ্রদের আয়তন বৃদ্ধি, মোরেনের স্থিতিশীলতা এবং পাহাড়ের ভূপ্রকৃতি— সব কিছুর সঙ্গে জলবায়ুর পরিবর্তনের যোগসূত্র রয়েছে। দার্জিলিং ও সিকিমের মতো অঞ্চলে ভবিষ্যতেও এমন ঘটনা ঘটতে পারে বলে সতর্ক করছেন তাঁরা।
পূর্ব হিমালয় কেন বেশি উদ্বেগের ? এ অঞ্চলের হিমবাহের চরিত্র পশ্চিম হিমালয়ের তুলনায় কিছুটা আলাদা। পশ্চিমবঙ্গের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূবিজ্ঞান ও রিমোট সেন্সিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক অতনু ভট্টাচার্য জানাচ্ছেন, পূর্ব হিমালয়ের হিমবাহে পাথর ও নুড়ির উপস্থিতি বেশি। তাঁর মতে, পরিষ্কার বরফের হিমবাহ এবং নুড়ি-পাথরে ঢাকা হিমবাহের আচরণ এক নয়। পাথর ও নুড়ির স্তর কখনো তাপরোধক হিসাবে কাজ করে হিমবাহের গলন কমাতে পারে। আবার সে স্তরের বিন্যাস, ঘনত্ব এবং প্রকৃতি হিমবাহের স্থিতিশীলতার উপর অন্য রকম প্রভাবও ফেলতে পারে। ফলে হিমবাহের উপর জমে থাকা ধ্বংসাবশেষের প্রকৃতি ও ঘনত্ব নির্ভুল ভাবে বোঝা জরুরি। এ অঞ্চলে হিমবাহের সামনে পাথর ও নুড়ি জমে মোরেন তৈরি হওয়ায় তার পিছনে গলিত জল জমে হ্রদ তৈরির সম্ভাবনাও থাকে।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ঈশিতা দাসের বক্তব্য, মধ্য ও পূর্ব হিমালয়ে বর্ষাকালে প্রবল বৃষ্টিপাত হয়। তার সঙ্গে হিমবাহ গলার জল যোগ হলে দ্রুত জল জমতে পারে। তার উপর এসব অঞ্চলের বহু হিমবাহ নুড়ি-পাথরে ঢাকা, পাহাড়ের ঢালও যথেষ্ট খাড়া। ভূমিকম্পপ্রবণতার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল। তাঁর মতে, উষ্ণায়নের কারণে হিমবাহ গলে যে হ্রদগুলি তৈরি হচ্ছে, সেগুলির চারপাশের মোরেন অনেক সময় আলগা থাকে। জলস্তর বা চাপ আচমকা বেড়ে গেলে সেসব প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অল্প সময়ের মধ্যে প্রবল বৃষ্টিপাত কিংবা মেঘভাঙা বৃষ্টির মতো ঘটনা বাড়লে ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
হিমবাহ নিয়ে গবেষণাকারীদের আরও একটি উদ্বেগের জায়গা হল বরফ হারানোর গতি। গবেষকদের দাবি, ২০০০ সালের পর হিমালয়ের হিমবাহ গলার হার উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়েছে। ২০১০ সালের পর সেই প্রবণতা আরও তীব্র হয়েছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে হিমবাহের বরফ হারানোর পরিমাণ বাড়লেও সেই অনুপাতে নতুন তুষার জমছে না। ফলে হিমবাহের সামগ্রিক ভর কমছে। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব শুধু হিমবাহের অস্তিত্বেই নয়, তার সঙ্গে যুক্ত হ্রদ ও নদী ব্যবস্থার উপরও পড়তে পারে। অর্থাৎ হিমবাহ যত সঙ্কুচিত হবে, তত নতুন হ্রদ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা এবং পুরনো হ্রদের আয়তন বৃদ্ধির বিষয়টি নজরে রাখতে হবে।
হিমালয়ের দক্ষিণ ঢালের বিপদ বুঝতে হলে তিব্বত মালভূমির পরিস্থিতির উপরও নজর রাখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন গবেষকেরা। তিব্বত মালভূমি এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ জলভাণ্ডার। সেখানকার হিমবাহ থেকেই সিন্ধু, গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র-সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নদী ব্যবস্থার উৎপত্তি। অর্থাৎ ওই অঞ্চলে হিমবাহ ও জলভাণ্ডারের বড়সড় পরিবর্তন হলে তার প্রভাব সীমান্ত পেরিয়ে বহু দূরের নদী অববাহিকায় পৌঁছতে পারে। ‘ইসিমোড’-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে তিব্বত মালভূমি অঞ্চলে হিমবাহ-হ্রদের সংখ্যা ১৬,৩৮৫। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সে সংখ্যা ছিল ১৪,৪৮৭। অর্থাৎ কয়েক দশকে সংখ্যাটি প্রায় দু–হাজার বেড়েছে। এই পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে, হিমবাহ-হ্রদ এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ভূপ্রাকৃতিক ঘটনা নয়। বৃহত্তর হিমালয় অঞ্চলের জলবায়ু এবং ভূপ্রকৃতির পরিবর্তনের সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে।
তিব্বত মালভূমির দক্ষিণ প্রান্তে বিপদের উৎস আরও একাধিক। ভূমিধস, বরফধস, নদীর গতিপথ আচমকা আটকে যাওয়াও ভয়াবহ বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। ভূমিধসে নদী আটকে গেলে প্রথমে নদীর জলস্তর কমে যেতে পারে। কিন্তু পাহাড়ি ধ্বংসাবশেষের তৈরি অস্থায়ী বাঁধ ভেঙে গেলে আচমকাই বিপুল জল নেমে আসতে পারে। ফলে আকাশ পরিষ্কার থাকলেও নীচের দিকে হড়পা বান দেখা দিতে পারে। এই ‘কাসকেডিং এফেক্ট’-ই এখন বিজ্ঞানীদের বিশেষ ভাবে ভাবাচ্ছে। অর্থাৎ একটি প্রাকৃতিক ঘটনা পরবর্তী আর একটি বিপর্যয়ের কারণ হয়ে উঠছে। হিমবাহ গলন থেকে হ্রদ, হ্রদ থেকে বাঁধ ভাঙা, বাঁধ ভাঙা থেকে হড়পা বান— তার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ভূমিধস ও নদীর গতিপথের পরিবর্তন।
বাংলার জন্য কী সতর্কবার্তা ? ভূবিজ্ঞানী সুজীব করের মতে, নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয় থেকে সিকিম, উত্তরবঙ্গ এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের হিমালয় সংলগ্ন অঞ্চলগুলির শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন। তাঁর বক্তব্য, সিকিম, ভুটান এবং অরুণাচল হিমালয়ে বহু হিমবাহ-হ্রদ রয়েছে। ফলে কোনো একটি অঞ্চলে বড়ো ধরনের হিমবাহ-হ্রদ বিপর্যয় ঘটলে সংশ্লিষ্ট অন্য হ্রদগুলির স্থিতিশীলতা এবং সামগ্রিক ঝুঁকিও নতুন করে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। বিশেষত তিস্তা, রায়ডাক, সংকোশ এবং জলঢাকার মতো নদীগুলির ক্ষেত্রে নদীখাতকে আলাদা ভাবে বিবেচনা করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। বর্ষাকালে পাহাড়ে অপ্রয়োজনীয় কম্পন সৃষ্টি করে এমন নির্মাণকাজ নিয়ন্ত্রণ, রাস্তা ও সেতুর নিয়মিত নজরদারি এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহপথ অক্ষুণ্ণ রাখার উপর জোর দিয়েছেন তিনি। তাঁর বক্তব্যের সারকথা, পাহাড়ে উন্নয়ন মানেই কেবল রাস্তা, সেতু বা পরিকাঠামো নির্মাণ নয়। পাহাড়ের ভূপ্রকৃতি, নদীর স্বাভাবিক গতিপথ আর স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রকে মাথায় রেখে পরিকাঠামো তৈরি করাই হওয়া উচিত পরিকল্পনার মূল ভিত্তি।
হিমালয়ের বিপদের সঙ্গে মানুষের তৈরি পরিকাঠামোর সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহপথের উপর বাঁধ, সেতু, রাস্তা, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, বসতি গড়ে উঠলে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের অভিঘাত অনেক সময় আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে হিমবাহ দুর্বল হচ্ছে, পাহাড়ের ঢাল অস্থিতিশীল হচ্ছে, অতিবৃষ্টির চরিত্র বদলাচ্ছে। এহেন পরিস্থিতিতে মানুষের পরিকাঠামোগত চাপ যদি একই সঙ্গে বাড়তে থাকে, তা হলে বিপদের মাত্রাও বাড়বে। তাই প্রশ্ন শুধু ‘হড়পা বান আসবে কি না’— তা নয়। প্রশ্ন হলো, এলে তার অভিঘাত কতটা কমানো সম্ভব হবে। হিমবাহ-হ্রদের নিয়মিত উপগ্রহ-নজরদারি, ঝুঁকিপূর্ণ হ্রদ চিহ্নিতকরণ, নদীখাতের বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন, আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা এবং পাহাড়ে নির্মাণের ক্ষেত্রে কঠোর পরিবেশগত মূল্যায়ন— এই সবকিছুকে একসঙ্গে নিয়ে কাজ করার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞেরা।
❤ Support Us





