- দে । শ
- আগস্ট ২৯, ২০২৬
সনিয়া গান্ধীর ‘স্মৃতিকথা’ প্রকাশে পেঙ্গুইনের ‘না’, কাটাছেঁড়ার অভিযোগ ঘিরে কংগ্রেস-বিজেপি তরজা
সোনিয়া গান্ধীর বহুচর্চিত স্মৃতিকথা ‘বিলংগিং : আ জার্নি অফ লাভ’ ঘিরে বিতর্ক ক্রমশ রাজনৈতিক রং নিচ্ছে। বইটি ভারতে প্রকাশ না করার নেপথ্যে সম্পাদকীয় কাটাছেঁড়া নিয়ে লেখিকার সঙ্গে মতবিরোধের অভিযোগ উঠেছিল পেঙ্গুইন র্যান্ডম হাউস ইন্ডিয়ার বিরুদ্ধে। শুক্রবার সে অভিযোগ কার্যত খারিজ করে প্রকাশনা সংস্থাটি জানাল, ভারতে ওই বইয়ের প্রকাশক তারা নয়। বরং সংশ্লিষ্ট আলোচনার পুরো পর্বে বইটি প্রকাশ করার ব্যাপারে তারা ‘আগ্রহী’ ছিল।
তবে পেঙ্গুইনের ব্যাখ্যার পরেও বিতর্ক থামেনি। বরং কংগ্রেসের একাধিক নেতা প্রকাশনা সংস্থাটির সিদ্ধান্তের পিছনে কেন্দ্রের ‘চাপ’ থাকার অভিযোগ তুলেছেন। পাল্টা বিজেপির দাবি, কংগ্রেসই ‘ভয়ের মিথ্যা আখ্যান’ তৈরি করে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার চেষ্টা করছে। বিতর্কের সূত্রপাত একাধিক প্রতিবেদনে প্রকাশিত খবর ঘিরে। সেখানে দাবি করা হয়েছিল, সনিয়া গান্ধীর স্মৃতিকথার একটি অংশে কিছু ‘সম্পাদকীয় পরিবর্তন’ এবং ‘বাদ দেওয়ার’ প্রস্তাব দিয়েছিল পেঙ্গুইন র্যান্ডম হাউস ইন্ডিয়া। সে পরিবর্তনে সনিয়া রাজি না হওয়াতেই ভারতে বইটি প্রকাশ না করার সিদ্ধান্ত নেয় সংস্থাটি।
কিন্তু শুক্রবার প্রকাশিত বিবৃতিতে পেঙ্গুইন র্যান্ডম হাউস ইন্ডিয়া বলেছে, ‘ভারতে বিলংগিং : আ জার্নি অফ লাভ বইটির প্রকাশক পেঙ্গুইন র্যান্ডম হাউস ইন্ডিয়া নয়। লেখক সম্পাদকীয় পরিবর্তন মেনে না নেওয়ার কারণে প্রকাশনা সংস্থাটি বইটি প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেয়নি, এ কথাও পুরোপুরি সত্য নয়।’ প্রকাশনা সংস্থার বক্তব্য, পাণ্ডুলিপির তথ্য যাচাই করা, লেখককে সম্পাদকীয় পরামর্শ দেওয়া প্রকাশনা-প্রক্রিয়ারই স্বাভাবিক অঙ্গ। তাদের দাবি, ‘প্রকাশক হিসেবে তথ্য যাচাই করা এবং বইটির স্বার্থে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া আমাদের অধিকার, দায়িত্ব—দুই-ই। এটি প্রকাশনা প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক অংশ।’ পেঙ্গুইনের আরও দাবি, সনিয়া গান্ধীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আলোচনার গোটা পর্বেই বইটি প্রকাশের ব্যাপারে তাদের আগ্রহ ছিল। একই সঙ্গে লেখিকার সঙ্গে হওয়া গোপনীয় আলোচনা নিয়ে আর কোনো মন্তব্য করতে তারা রাজি নয়।
সনিয়া গান্ধীর স্মৃতিকথাটি আগামী ১০ নভেম্বর আন্তর্জাতিক বাজারে প্রকাশিত হওয়ার কথা। পেঙ্গুইন র্যান্ডম হাউসেরই অংশ আলফ্রেড এ. নফ বইটি প্রকাশ করছে। প্রকাশকের তরফে প্রাথমিক ভাবে এক লক্ষ কপি ছাপার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। যুদ্ধ-পরবর্তী ইতালিতে সনিয়ার শৈশব, ভারত-আগমন, রাজীব গান্ধীর সঙ্গে বিবাহ থেকে শুরু করে নেহরু-গান্ধী পরিবারের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় উঠে আসবে বইটিতে। সঞ্জয় গান্ধী, ইন্দিরা গান্ধী এবং রাজীব গান্ধীর মৃত্যু, জনজীবনে সনিয়ার প্রবেশ এবং ভারতের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ পথচলার কথাও স্মৃতিকথায় থাকবে বলে প্রকাশকের তরফে জানানো হয়েছে। বইটি প্রকাশের ঘোষণা করে সনিয়া বলেছিলেন, তাঁর পরিবারকে নিয়ে বহু কিছু লেখা হলেও তাঁদের কাজ, সিদ্ধান্ত, প্রেরণা, মানবিক দুর্বলতার সত্যিকারের দিক খুব কমই উঠে এসেছে। তাঁর কথায়, এ বইয়ের মাধ্যমে গত ছয় দশকে প্রত্যক্ষ করা ভারতের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের ‘অনন্য দৃষ্টিভঙ্গি’ পাঠকদের সামনে তুলে ধরতে চান তিনি।
পেঙ্গুইনের সাম্প্রতিক বিবৃতি সামনে আসার পরেই সরব হয়েছে কংগ্রেস। লোকসভায় কংগ্রেসের উপনেতা গৌরব গগৈ প্রকাশনা সংস্থার বক্তব্যকে ‘দুর্বল’ বলে কটাক্ষ করেছেন। তাঁর বক্তব্য, পেঙ্গুইন ইন্ডিয়া নরেন্দ্র মোদির লেখা ‘এক্সাম ওয়ারিওর’ ও আরএসএস-কে নিয়ে একাধিক বই প্রকাশ করতে আগ্রহী। তাঁর প্রশ্ন, তবে কি বিজেপি সরকারের এমন কেউ কেউ রয়েছেন, যাঁরা সনিয়া গান্ধীর বইটি ভারতের মানুষ পড়ে ফেলবেন বলে ‘ভয়’ পাচ্ছেন? আরও এক ধাপ এগিয়ে কংগ্রেস নেতা তথা রাজস্থানের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অশোক গেহলট সরাসরি প্রকাশনা সংস্থার কাছে জানতে চেয়েছেন, পেঙ্গুইন র্যান্ডম হাউসের একটি আন্তর্জাতিক ইমপ্রিন্ট যখন বইটি প্রকাশ করছে, তখন ভারতে সেটি প্রকাশ করতে সমস্যা কোথায়?
গেহলটের দাবি, বিশ্বজুড়ে যে বইটি তার মূল রূপে প্রকাশিত হতে চলেছে, ভারতে প্রকাশের ক্ষেত্রে কেন সেখানে পরিবর্তন চাওয়া হচ্ছে, তার কারণ স্পষ্ট করা উচিত। তাঁর অভিযোগ, এর পিছনে সরকারি হস্তক্ষেপ বা চাপ থাকতে পারে। গেহলট জানিয়েছেন, ‘প্রকাশক যে মূল বিষয়গুলি সম্পাদনা করতে বা বাদ দিতে চেয়েছিল, তা চিন, বিজেপি, প্রধানমন্ত্রী মোদি এবং আরএসএস-কে নিয়ে লেখা। ঠিক এ কারণেই সরকারের হস্তক্ষেপ। সনিয়া গান্ধী তো কোনো গল্প, উপন্যাস লেখেন না। এ তাঁর জীবন আর অভিজ্ঞতার কথা। কী ভাবে আপনি তথ্য অস্বীকার করবেন বা তথ্যকে সেন্সর করবেন?’ তাঁর আরও অভিযোগ, সনিয়া গান্ধীর মতো এক জন প্রবীণ রাজনৈতিক নেত্রীর বই যদি চাপের কারণে প্রকাশিত না হয়, তা হলে তা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার উপর আঘাত। মধ্যপ্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী কমল নাথও এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর প্রশ্ন, ‘সনিয়া গান্ধীর মতো একজন প্রবীণ ব্যক্তিত্ব কী লিখবেন, কী লিখবেন না, তা কি প্রকাশক ঠিক করবেন?’ প্রকাশকের বক্তব্যের পিছনে কোনো চাপ রয়েছে কি না, সে প্রশ্নও তুলেছেন তিনি।
বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে স্মৃতিকথার কয়েকটি রাজনৈতিক অংশ। কংগ্রেস সূত্রের দাবি, পেঙ্গুইন ইন্ডিয়ার সঙ্গে আলোচনায় মূলত তিনটি বিষয় নিয়ে আপত্তি বা পরিবর্তনের প্রস্তাব এসেছিল। প্রথমত, চিনের সঙ্গে ভারতের সীমান্ত বিরোধ ও ভারতীয় ভূখণ্ডে চিনের অনুপ্রবেশ। দ্বিতীয়ত, বিজেপি তথা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্ব, কাজের ধরন, কেন্দ্রীয় সরকারের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি নিয়ে সনিয়া গান্ধীর মতামত। তৃতীয়ত, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ বা আরএসএস-এর প্রভাব নিয়ে তাঁর পর্যবেক্ষণ। কংগ্রেসের দাবি, এই অংশগুলির কয়েকটি পরিবর্তন বা বাদ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সনিয়া তাতে সম্মত হননি। তাঁর বক্তব্য ছিল, বইয়ের ওই অংশগুলি তাঁর নিজের অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে লেখা। ফলে সেগুলির পরিবর্তনে তিনি রাজি নন। তবে এসব অভিযোগগুলির সত্যতা স্বাধীন ভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। পেঙ্গুইন র্যান্ডম হাউস ইন্ডিয়া তাদের বিবৃতিতে নির্দিষ্ট কোনো অংশ বা অধ্যায়ের কথা উল্লেখ করেনি। বরং তথ্য যাচাই আর সম্পাদকীয় পরামর্শকে প্রকাশনা-প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক অংশ বলেই ব্যাখ্যা করেছে।
অন্যদিকে, কংগ্রেসের অভিযোগের জবাবে বিজেপি পাল্টা দাবি করেছে, বই প্রকাশ নিয়ে ‘ভয়ের মিথ্যা আখ্যান’ তৈরি করছে বিরোধী দল। বিজেপির জাতীয় মুখপাত্র সি আর কেশবনের বক্তব্য, কংগ্রেসের অভিযোগ ‘শুধু বিদ্রূপাত্মক নয়, স্পষ্টতই ভণ্ডামিপূর্ণ’। তাঁর প্রশ্ন, সনিয়া গান্ধীর স্মৃতিকথার ঠিক কোন অংশে তথ্য যাচাইয়ের প্রয়োজন হয়েছিল এবং কেন হয়েছিল—কংগ্রেস কি সেসব প্রশ্নের উত্তর দেবে? বিজেপি নেতা অজয় আলোকও কংগ্রেসকে আক্রমণ করেছেন। তাঁর বক্তব্য, একটি বইয়ের বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখতে তথ্য ও পরিসংখ্যান যাচাই করা জরুরি। সেই কারণেই প্রকাশকের তরফে তথ্য যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিতে পারে বলে তাঁর দাবি।প্রবল বিতর্কের মাঝে এখন প্রশ্ন, পেঙ্গুইন র্যান্ডম হাউস ইন্ডিয়া যদি ভারতে বইটির প্রকাশক না হয়, তা হলে এ দেশে ‘বিলংগিং : আ জার্নি অফ লাভ’ প্রকাশ করবে কে? জানা গিয়েছে, বেশ কয়েকটি ভারতীয় প্রকাশনা সংস্থা বইটি প্রকাশের বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে। তাদের মধ্যে হার্পারকলিন্স চুক্তি চূড়ান্ত করার দৌড়ে এগিয়ে রয়েছে বলে খবর। অর্থাৎ, আন্তর্জাতিক প্রকাশনা ঘিরে আপাতত কোনো অনিশ্চয়তা নেই। আগামী ১০ নভেম্বর আলফ্রেড এ. নফ-এর হাত ধরে বইটি বিশ্বের বাজারে আসার কথা।
❤ Support Us





