- এই মুহূর্তে দে । শ
- আগস্ট ২৭, ২০২৬
স্বাস্থ্য নিয়ে আপস নয় : প্যাকেটজাত খাবারের গুণগত মান স্পষ্ট করতে কেন্দ্রকে ডেডলাইন সুপ্রিম কোর্টের
প্যাকেট খুলে খাবার মুখে তোলার আগে চোখে পড়ছে সতর্কবার্তা? চিনি, নুন এবং স্যাচুরেটেড ফ্যাটের মাত্রা বেশি হলে প্যাকেটের সামনেই তা স্পষ্ট করে জানানোর ব্যবস্থা চালু হবে কি না, সে সিদ্ধান্ত নিতে কেন্দ্রকে ২ সপ্তাহ সময় দিল সুপ্রিম কোর্ট। সে সঙ্গে আদালতের কড়া বার্তা, জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে কোনো ভাবেই আপস করা যায় না। কেন্দ্র নিজে থেকে পদক্ষেপ না করলে পরবর্তী নির্দেশ দিতে পিছপা হবে না শীর্ষ আদালত।
বৃহস্পতিবারের শুনানিতে সুপ্রিম বিচারপতি জে বি পারদিওয়ালা এবং বিচারপতি কে বিনোদ চন্দ্রনের বেঞ্চ প্যাকেটজাত খাবারের ‘ফ্রন্ট-অফ-প্যাক’ লেবেল নিয়ে কেন্দ্রের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলে। উন্নত দেশগুলিতে যে ধরনের খাদ্য-লেবেলিং ব্যবস্থা চালু রয়েছে, ভারত তা অনুসরণ করতে পারবে না— কেন্দ্রের এ যুক্তি নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করে আদালত। বিচারপতি পারদিওয়ালার প্রশ্ন, ‘ভারত কি অনুন্নত দেশ হয়েই থাকবে?’ আদালতের বক্তব্য, বিষয়টি কোনো নির্দিষ্ট খাদ্যপণ্য বা কোনো একটি সংস্থার বিরুদ্ধে নয়। সাধারণ মানুষ, বিশেষত শিশুরা, কী খাচ্ছে তা যেন সহজেই বুঝতে পারে— মূল লক্ষ্য সেটাই। আদালত আগেই জানিয়েছিল, অস্বাস্থ্যকর খাবারের প্রভাব সম্পর্কে ক্রেতাকে সচেতন করতে প্যাকেটের সামনের দিকে স্পষ্ট সতর্কবার্তা প্রয়োজন।
কেরলার একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের দায়ের করা জনস্বার্থ মামলাকে কেন্দ্র করেই নতুন এই বিতর্ক। প্যাকেটজাত খাবারে চিনি, নুন এবং স্যাচুরেটেড ফ্যাটের পরিমাণ বেশি হলে তা যেন ক্রেতা এক নজরেই বুঝতে পারেন, সে জন্য বাধ্যতামূলক ‘ফ্রন্ট-অফ-প্যাক ওয়ার্নিং লেবেল’ চালুর দাবি জানানো হয়েছে। সংগঠনটির হয়ে আদালতে সওয়াল করছেন আইনজীবী রাজীব শঙ্কর দ্বিবেদী। এ মামলায় চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতেই কেন্দ্রকে ফ্রন্ট-অফ-প্যাক লেবেল চালুর বিষয়টি বিবেচনা করতে বলেছিল সুপ্রিম কোর্ট। পরে খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রক ‘এফএসএসএআই’ -কে এ বিষয়ে অগ্রগতির কথা জানাতে বলা হয়। কিন্তু নিয়ন্ত্রক সংস্থার পরবর্তী পদক্ষেপে আদালত সন্তুষ্ট হয়নি। সম্প্রতি ‘এফএসএসএআই’-র একটি বৈঠকের কার্যবিবরণী আদালতে তুলে ধরে মামলাকারীদের আইনজীবী অভিযোগ করেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা আদৌ স্পষ্ট সতর্কতামূলক লেবেলের পক্ষে এগোচ্ছে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। তার পরেই কেন্দ্রকে কার্যত ‘শেষ সুযোগ’-এর সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে শীর্ষ আদালত।
শীর্ষ আদালতের অবস্থান এক্ষেত্রে বেশ সরল। কোনো প্যাকেট হাতে তুলে নিয়ে ক্রেতাকে যেন পুষ্টির দীর্ঘ তালিকা পড়ে, অঙ্ক কষে বুঝতে না হয় খাবারটি কতটা স্বাস্থ্যকর। প্যাকেটের সামনেই যদি স্পষ্ট করে লেখা থাকে— ‘চিনি বেশি’, ‘নুন বেশি’ বা ‘স্যাচুরেটেড ফ্যাট বেশি’, তা হলে এক নজরেই সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব। এ ধরনের লেবেলের রং, প্রতীক, শব্দ, সংখ্যা বা অন্য কোনও চিহ্ন কী হবে, তা বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করে ঠিক করার সুযোগও কেন্দ্রকে দিয়েছে আদালত। অর্থাৎ, লেবেলের চূড়ান্ত নকশা আদালত নিজে বেঁধে দিতে চাইছে না; কিন্তু সিদ্ধান্তটি আর অনির্দিষ্ট কাল ফেলে রাখতেও রাজি নয়।
দেশজুড়ে প্যাকেটজাত এবং অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে ভারতে স্বাস্থ্যজনিত উদ্বেগও বাড়ছে। ২০২৫-২৬ সালের অর্থনৈতিক সমীক্ষা ‘স্থূলতা’কে দেশের অন্যতম জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ‘এনএফএইচএস’-এর সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, দেশে ২৪ শতাংশ মহিলা এবং ২৩ শতাংশ পুরুষ অতিরিক্ত ওজন বা ‘স্থূলতা’র সমস্যায় আক্রান্ত। একই সময়ে ২০০৯ থেকে ২০২৩-এর মধ্যে ভারতের অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের বাজার ১৫০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার ক্রমশ প্রচলিত খাদ্যাভ্যাসকে সরিয়ে দিচ্ছে বলেও অর্থনৈতিক সমীক্ষায় সতর্ক করা হয়েছে। স্থূলতা ছাড়াও ডায়াবিটিস এবং হৃদ্রোগের মতো একাধিক স্বাস্থ্য সমস্যার সঙ্গে এই ধরনের খাবারের অতিরিক্ত ব্যবহারের যোগ রয়েছে বলে সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে।শিশুদের নিয়েও বিশেষ উদ্বিগ্ন আদালত। শুনানিতে বিচারপতিরা মন্তব্য করেন, অস্বাস্থ্যকর খাবারের প্রতি শিশুদের আকর্ষণ বাড়ছে। ফলে ব্যবসায়িক স্বার্থ বা শিল্পমহলের আপত্তির চেয়ে শিশুর স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
প্যাকেটজাত এবং অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের ক্ষেত্রে ‘ফ্রন্ট-অফ-প্যাক লেবেল’ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই টানাপড়েন চলছে। ২০২২ সালের খসড়া ব্যবস্থায় ‘এফএসএসএআই’ ‘হেলথ স্টার রেটিং’-এর প্রস্তাব দিয়েছিল। অর্থাৎ, কোনো খাবার কতটা স্বাস্থ্যকর, তার ভিত্তিতে এক থেকে পাঁচটি স্টার দেওয়া হবে। কিন্তু স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একাংশের আপত্তি ছিল সে পদ্ধতিতে। তাঁদের বক্তব্য, স্টার দেখে কোনো খাবারে ঠিক কতটা চিনি, নুন বা ফ্যাট রয়েছে, তা পরিষ্কার করে বোঝা যায় না। বরং প্যাকেটের সামনে সরাসরি সতর্কবার্তা থাকলে ক্রেতা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। সম্প্রতি ‘এফএসএসএআই’-র তরফে দৈনিক প্রস্তাবিত মাত্রার সঙ্গে তুলনা করে যোগ করা চিনি, স্যাচুরেটেড ফ্যাট এবং নুনের পরিমাণ দেখানোর একটি টেবিলের কথাও বলা হয়েছে। কিন্তু মামলাকারীদের আপত্তি, এতে ক্রেতাকেই ফের হিসাব করতে হবে। অর্থাৎ, যে তথ্য এক ঝলকে বোঝানোর কথা, তা বুঝতে ফের অঙ্ক কষতে হবে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্যাকেটের সামনের দিকে পুষ্টি সংক্রান্ত তথ্য জানানোর নানা পদ্ধতি রয়েছে। কোথাও ‘হেলথ স্টার রেটিং’, কোথাও ‘ট্র্যাফিক লাইট’ পদ্ধতি —লাল, হলুদ ও সবুজ রঙে খাবারের বিভিন্ন উপাদানের মাত্রা বোঝানো হয়। আবার কোথাও সরাসরি সতর্কবার্তা ব্যবহার করা হয়। বিশ্বের অন্তত ৪৪টি দেশে কোনও না কোনো ধরনের ফ্রন্ট-অফ-প্যাক লেবেলিং ব্যবস্থা চালু রয়েছে। অন্তত ১৬টি দেশে তা বাধ্যতামূলক। চিলির মতো দেশে অস্বাস্থ্যকর খাবারের প্যাকেটে কালো সতর্কতামূলক প্রতীক ব্যবহারের ব্যবস্থা রয়েছে। ব্রিটেনে লাল-হলুদ-সবুজ রঙে চিনি, নুন এবং ফ্যাটের মাত্রা বোঝানো হয়। অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে রয়েছে হেলথ স্টার রেটিং। বিশ্বজুড়ে এই ধরনের লেবেলিং ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও গবেষণা হয়েছে। স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিভিন্ন সংগঠনের একটি অবস্থানপত্রে দাবি করা হয়েছে, লাতিন আমেরিকার কয়েকটি দেশে সতর্কতামূলক লেবেল চালুর পর খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন এসেছে। চিলিতে চিনিযুক্ত পানীয়ের ব্যবহার ২৪ শতাংশ কমার কথাও সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে। নেদারল্যান্ডস, চেক প্রজাতন্ত্র এবং সিঙ্গাপুরেও স্বাস্থ্যকর খাবার চিহ্নিত করার জন্য বিভিন্ন প্রতীক ব্যবহার করা হয়। ভারতে এ ধরনের কোনো নির্দিষ্ট ব্যবস্থা এ পর্যন্ত নেই।
ফলে, সুপ্রিম আদালতের দেওয়া দু-সপ্তাহের সময়সীমার দিকেই এখন তাকিয়ে আছে গোটা দেশ। এর মধ্যেই কেন্দ্রকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আদালতে জানাতে হবে। সরকার নিজে থেকে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নিলে আদালত তাতে সন্তুষ্ট থাকবে বলেই ইঙ্গিত দিয়েছে। কিন্তু ফের যদি সিদ্ধান্ত ঝুলে থাকে, তা হলে আদালত নিজেই পরবর্তী নির্দেশ জারি করতে পারে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পরে এখন মূলত দু-টি পথ খোলা রয়েছে কেন্দ্রের সামনে। এক, ২০২২ সালের খসড়া বিজ্ঞপ্তি পুরোপুরি বাতিল করে নতুন করে নীতি তৈরি করা। সে ক্ষেত্রে শিল্পমহল, স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, ভোক্তা সংগঠন এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে ফের আলোচনা করতে হবে। নতুন খসড়া প্রকাশ, মতামত সংগ্রহ, চূড়ান্ত বিজ্ঞপ্তি জারি করতে সময় লাগতে পারে। দুই, পুরনো খসড়াতেই প্রয়োজনীয় পরিবর্তন এনে দ্রুত ব্যবস্থা কার্যকর করা। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, দ্বিতীয় পথেই দ্রুত ফল পাওয়া সম্ভব। বিষয়টি ফের ১০ সেপ্টেম্বর শীর্ষ আদালতে উঠবে। অর্থাৎ, দীর্ঘদিনের জট কাটিয়ে এ বার সত্যিই কি প্যাকেটের গায়ে বড়ো করে লেখা হবে— ‘চিনি বেশি’, ‘নুন বেশি’, ‘ফ্যাট বেশি’? আপাতত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় ক্রেতা, স্বাস্থ্যকর্মী এবং খাদ্যশিল্প— সব পক্ষই।
❤ Support Us






