Advertisement
  • এই মুহূর্তে বি। দে । শ
  • সেপ্টেম্বর ৩, ২০২৬

হিমবাহ ভাঙার ৩৮ মিনিট পর সতর্কবার্তা! কেন ব্যর্থ নেপালের ‘ডিজাস্টার ওয়ার্নিং’ ব্যবস্থা ?

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
হিমবাহ ভাঙার ৩৮ মিনিট পর সতর্কবার্তা! কেন ব্যর্থ নেপালের ‘ডিজাস্টার ওয়ার্নিং’ ব্যবস্থা ?

নেপালে ভয়াবহ হড়পা বান বা আকস্মিক বন্যার আগে সময়মতো সতর্কবার্তা পৌঁছে দিতে ব্যর্থ হয়েছে দেশের ‘ডিজ়াস্টার ওয়ার্নিং’ ব্যবস্থা। হিমবাহ ভেঙে বিপুল জলরাশি, বরফ ও পাথর নীচের দিকে ধেয়ে আসার প্রায় ৩৮ মিনিট পর সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছয় বিপদসংকেত। এ ঘটনায় নেপালের দুর্যোগের আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। গত ২৬ আগস্ট স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে নেপালের রাসুয়া জেলার লেন্দে উপত্যকায় হিমবাহের একটি অংশ ভেঙে পড়ে। এর পরেই প্রচণ্ড গতিতে বরফ, পাথর এবং হিমশীতল জল নীচের দিকে ধেয়ে আসে। তৈরি হয় ভয়াবহ হড়পা বান। কিন্তু সে বিপদের আগাম কোনো সতর্কবার্তা সময়মতো মানুষের কাছে পৌঁছয়নি।

জানা যাচ্ছে, হিমবাহ ভেঙে পড়ার সময় নেপালের খনি ও ভূতত্ত্ব বিভাগ ভূকম্পনজনিত একটি কম্পন রেকর্ড করেছিল। কম্পনের মাত্রা ছিল ৪.৪। কিন্তু সেটিকে ভূমিকম্প হিসেবে চিহ্নিত করা যায়নি। কারণ, কম্পনের ধরন ভূমিকম্পের স্বাভাবিক কম্পনের সঙ্গে মেলেনি। নেপালের ‘ন্যাশনাল আর্থকোয়েক মনিটরিং অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার’-ওর প্রধান লোকবিজয় অধিকারীর বক্তব্য অনুযায়ী, ‘৪.৪ মাত্রার কম্পন রেকর্ড করা হয়েছিল। কিন্তু কম্পনের ধরনের সঙ্গে ভূমিকম্পের ধরন মেলেনি। ফলে সাধারণত যে ভাবে মানুষকে সতর্কবার্তা পাঠানো হয়, সেটা পাঠানো হয়নি।’

অর্থাৎ, একটি সম্ভাব্য বিপর্যয়ের গুরুত্বপূর্ণ সংকেত যন্ত্রে ধরা পড়লেও সেটিকে বিপর্যয়ের পূর্বাভাস হিসেবে চিহ্নিত করা যায়নি। ফলে সে মুহূর্তে সাধারণ মানুষের কাছে প্রয়োজনীয় সতর্কবার্তা পৌঁছয়নি। এর পরেও বিপদ সম্পর্কে আগাম সতর্ক করার একটি সুযোগ তৈরি হয়েছিল। ভোটেকোশী নদীর জলস্তর আচমকা বাড়তে শুরু করে। নদীর জলস্তরের এই পরিবর্তন পর্যবেক্ষণের জন্য স্যাব্রুবেসীতে একটি জলস্তর মাপার যন্ত্র বসানো ছিল। কিন্তু সকাল ৮টা ৫০ মিনিট নাগাদ জলের প্রবল তোড়ে সেই যন্ত্রটিই ভেসে যায়।

ফলে নদীর জলস্তর অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে কি না, তা আর ওই যন্ত্রের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়নি। যন্ত্রটি বিপদের কোনও সংকেতও পাঠাতে পারেনি। এর ফলে হড়পা বান যে উজান থেকে নেমে আসছে এবং তার প্রভাবে নদীর জলস্তর দ্রুত বাড়ছে—এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও সময়মতো সতর্কবার্তা ব্যবস্থায় পৌঁছয়নি। বিপর্যয়ের দিন সকাল ৯টার দিকে রাসুয়া জেলা প্রশাসন জলসম্পদ বিভাগ এবং আবহাওয়া দফতরকে পরিস্থিতির কথা জানায়। কিন্তু তত ক্ষণে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে।

নেপালের বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর মুখপাত্র শান্তি মাহাতো জানান, সকাল ৯টার দিকে জল ও আবহাওয়া দফতরকে বিষয়টি জানানো হয়েছিল। কিন্তু রাসুয়ায় যোগাযোগ রক্ষাকারী একটি টাওয়ার জলের প্রবল তোড়ে ভেঙে পড়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থাও বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তা সত্ত্বেও স্থানীয় প্রশাসন বাসিন্দাদের সতর্ক করার চেষ্টা চালায়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাড়ি বাড়ি গিয়ে সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়। পাশাপাশি মোবাইল ফোনে বার্তা পাঠানো, মাইকিং এবং সংবাদমাধ্যমে প্রচারের মাধ্যমেও মানুষকে সতর্ক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

সরকারি ‘ডিজাস্টার ওয়ার্নিং’ ব্যবস্থা থেকে শেষ পর্যন্ত সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে রাসুয়া, নুয়াকোট, ধাদিং এবং চিতওয়ান জেলার বাসিন্দাদের কাছে সতর্কবার্তা পাঠানো হয়। অর্থাৎ, সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে হিমবাহ ভেঙে পড়ার প্রায় ৩৮ মিনিট পরে সাধারণ মানুষের কাছে সেই বার্তা পৌঁছয়। বার্তায় বলা হয়েছিল, ত্রিশূলী নদী দিয়ে বিপুল পরিমাণ জলরাশি নীচের দিকে ধেয়ে আসছে। তাই বাসিন্দাদের দ্রুত উঁচু জায়গায় সরে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তত ক্ষণে বিপর্যয় শুরু হয়ে গিয়েছিল। বিপুল জল, কাদা, বরফ ও পাথরের স্রোত একের পর এক গ্রাম ও বসতিতে আছড়ে পড়ছিল। ধ্বংসের মাত্রা দ্রুত বাড়তে থাকে। অনেক বাসিন্দা আবার সেই সতর্কবার্তা আরও পরে পেয়েছেন বলে জানা গিয়েছে।

এ ঘটনা নেপালের দুর্যোগ মোকাবিলা ও আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকে সামনে এনে দিয়েছে। নেপালের ন্যাশনাল ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অথরিটির প্রাক্তন প্রধান কার্যনির্বাহী আধিকারিক অনিল পোখরেল বলেন, নেপালে কার্যকর আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা বলতে তেমন কিছু নেই। তাঁর বক্তব্য, শুধু বিভিন্ন জায়গায় সেন্সর বসিয়ে রাখলেই সেটিকে সম্পূর্ণ আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা বলা যায় না। এ ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, দ্রুত এবং নির্ভুল করতে হবে।

পোখরেলের মতে, চিনের মতো উন্নত ব্যবস্থায় উজানের সেন্সর যদি কোনো বিপদের সংকেত শনাক্ত করে, তা হলে একই সঙ্গে স্বয়ংক্রিয় ভাবে একাধিক সাইরেন বেজে ওঠা উচিত। শুধু তাই নয়, মোবাইল ফোন সাইলেন্ট মোডে থাকলেও যাতে জোরালো শব্দের মাধ্যমে সতর্কবার্তা পৌঁছয়, সে ব্যবস্থাও থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে টেক্সট মেসেজের মাধ্যমে মানুষকে দ্রুত সতর্ক করার ব্যবস্থাও থাকা উচিত। রাসুয়া ও ত্রিশূলী নদী উপত্যকার এই বিপর্যয়ের ক্ষেত্রে সেই ধরনের সমন্বিত ও স্বয়ংক্রিয় সতর্কীকরণ ব্যবস্থা কার্যকর হয়নি বলেই অভিযোগ উঠেছে।

গত ২৬ আগস্ট ভোটেকোশী ও ত্রিশূলী নদীর উপত্যকা ধরে ভয়াবহ হড়পা বান নেমে আসে। বিপুল জলরাশি, কাদা, বরফ ও পাথরের স্রোতে বিস্তীর্ণ এলাকা বিধ্বস্ত হয়। বিপর্যয়ে এ পর্যন্ত ১,২২৫ জনের দেহ উদ্ধার হয়েছে। ৪,২১৬ জন এখনো নিখোঁজ। হিমবাহ ভাঙার সংকেত যন্ত্রে ধরা পড়া সত্ত্বেও কেন তাৎক্ষণিক সতর্কবার্তা দেওয়া গেল না, নদীর জলস্তর মাপার যন্ত্র কেন বিপদের আগেই ভেসে গেল এবং কেন স্বয়ংক্রিয় ভাবে সাইরেন বা মোবাইল সতর্কবার্তার ব্যবস্থা সক্রিয় হলো না—এই প্রশ্নগুলিই এখন নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নিয়ে অন্যতম উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!