- এই মুহূর্তে দে । শ
- সেপ্টেম্বর ২, ২০২৬
বাড়ছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা, ডুবে যাবে কলকাতা-মুম্বাই ! সতর্কবার্তা রাষ্ট্রপুঞ্জের
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি আর ভবিষ্যতের দূরবর্তী কোনো বিপদ নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে সে বিপদ ইতিমধ্যেই দরজায় কড়া নাড়ছে। আর তার সবচেয়ে ভয়াবহ ধাক্কা আসতে পারে বিশ্বের নিচু উপকূলীয় শহর ও ব-দ্বীপ অঞ্চলে। দক্ষিণ এশিয়ার কলকাতা, মুম্বই এবং ঢাকার মতো শহরে স্থায়ী ভাবে জলমগ্ন হয়ে পড়ার কারণে এক কোটি ৪০ লক্ষেরও বেশি মানুষের বাড়িঘর হারানোর ‘ঝুঁকি’ রয়েছে। রাষ্ট্রপুঞ্জের নতুন প্রতিবেদনে এমনই সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।
সোমবার প্রকাশিত রাষ্ট্রপুঞ্জের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সমুদ্রের জলস্তর যে হারে বাড়ছে, তা নথিবদ্ধ ইতিহাসের যে কোনো সময়ের তুলনায় দ্রুত। শুধু তা-ই নয়, বৃদ্ধির গতি ক্রমশ আরও বাড়ছে। ফলে উন্নত দেশ হোক বা উন্নয়নশীল— বিশ্বের উপকূলবর্তী জনবসতির কাছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি অন্যতম গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি হুমকি হয়ে উঠেছে। প্রতিবেদনের বক্তব্য, জলবায়ু পরিবর্তনের এই অভিঘাতের প্রভাব ইতিমধ্যেই দৃশ্যমান। শহরের পরিকাঠামো, জল সরবরাহ ব্যবস্থা, পরিবহণ নেটওয়ার্ক, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য শক্তি পরিকাঠামো, ভবন, ভূগর্ভস্থ জলসম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর প্রভাব শুধু সম্পত্তি বা পরিকাঠামোর ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের জীবনযাপন, মানবাধিকার, দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন এবং আর্থিক স্থিতিশীলতার উপরও তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়ছে।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির অভিঘাত অবশ্য সর্বত্র এক রকম নয়। রাষ্ট্রপুঞ্জের সতর্কতা উচ্চ-আয়ের শহরগুলিতে মূল আশঙ্কা আর্থিক ক্ষতি। আমেরিকার মায়ামি ও নিউ ইয়র্ক কিংবা চিনের গুয়াংঝৌয়ের মতো শহরে উপকূলীয় পরিকাঠামোর বিপুল সম্পদ ঝুঁকির মুখে। এ সম্পদের আনুমানিক মূল্য ২ ট্রিলিয়ন থেকে ৩.৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের মধ্যে। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার নিচু ব-দ্বীপ অঞ্চলের ছবি আলাদা। এখানে সবচেয়ে বড়ো বিপদ মানুষের বাস্তুচ্যুতি। কলকাতা, মুম্বই আর ঢাকার মতো শহরে স্থায়ী ভাবে জল ঢুকে পড়লে বিপুল সংখ্যক মানুষ তাঁদের বসতবাড়ি হারাতে পারেন। রাষ্ট্রপুঞ্জের হিসাব অনুযায়ী, এ অঞ্চলে এক কোটি ৪০ লক্ষেরও বেশি মানুষ ইতিমধ্যেই এমন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন।
এ পরিস্থিতি থেকেই রাষ্ট্রপুঞ্জ মনে করছে, উপকূলীয় বিপন্নতা মাপার প্রচলিত পদ্ধতিতে বদল আনা প্রয়োজন। শুধু কত টাকার সম্পদ ক্ষতির মুখে রয়েছে, তা দিয়ে ঝুঁকি বিচার করলে চলবে না। কত মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে পারেন, কত মানুষের জীবন ও জীবিকা বিপন্ন হতে পারে—সেই সামাজিক ঝুঁকিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ভূমির অবনমন। দুইয়ের সম্মিলিত প্রভাবে উপকূলীয় অঞ্চলে বন্যার আশঙ্কা আরও বাড়ছে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র। হারিয়ে যাচ্ছে জীবিকা, জলজ বাস্তুতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ পরিষেবা এবং বিভিন্ন প্রজাতির আবাসস্থল। সমুদ্রের জল যত স্থলভাগের দিকে এগিয়ে আসছে, ততই মিষ্টি জল ও নোনা জলের সীমানাও ভিতরের দিকে সরে যাচ্ছে। ফলে উপকূলীয় ভূগর্ভস্থ জলাধারে লবণাক্ততা বাড়ছে। মাটিতেও ঢুকছে নোনা জল। এর প্রভাব পড়ছে পানীয় জলের নিরাপত্তা, কৃষি উৎপাদন, সেচ ব্যবস্থা, ভূগর্ভস্থ জলের উপর নির্ভরশীল বাস্তুতন্ত্রে। ঝড় বা ঘূর্ণিঝড়ের সময়ে সমুদ্রের জল স্থলভাগে ঢুকে পড়লে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। ভূ-পৃষ্ঠের জল এবং ভূগর্ভস্থ জল দীর্ঘ সময়ের জন্য দূষিত হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে জলবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়ে, পাশাপাশি পানীয় জলের সঙ্কটও দেখা দিতে পারে।
রাষ্ট্রপুঞ্জের প্রতিবেদনে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে জনস্বাস্থ্যের সরাসরি সম্পর্কের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। উপকূলীয় স্বাস্থ্য পরিষেবা ও পয়ঃনিষ্কাশন পরিকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে রোগের প্রকোপ বাড়তে পারে। জলবাহিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বাড়বে। বিঘ্নিত হতে পারে পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা। বাড়তে পারে আঘাত ও মৃত্যুর ঝুঁকি। পাশাপাশি দীর্ঘস্থায়ী জলবায়ু-উদ্বেগ এবং বাস্তুচ্যুতির আশঙ্কা মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের উপরেও চাপ তৈরি করতে পারে। এর সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়তে পারে ইতিমধ্যেই ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর উপর। ছোটো মাপের মৎস্যজীবী, উপকূলনির্ভর স্থানীয় ব্যবসা, ক্ষুদ্র পর্যটন এবং বন্দরনির্ভর অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত মানুষজনের জীবিকা সরাসরি বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির পিছনে মূল কারণ হিসাবে মানবসৃষ্ট বিশ্ব উষ্ণায়নকেই দায়ী করেছে রাষ্ট্রপুঞ্জ। উষ্ণ সমুদ্রের তাপীয় প্রসারণ এবং হিমবাহ গলে যাওয়ার ফলে সমুদ্রের জলস্তর বাড়ছে।প্রতিবেদনের পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৪ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বিশ্বে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রতি বছর গড়ে ৪.৭ মিলিমিটার করে বেড়েছে। ২০২৪ সালে এক লাফে তা বেড়ে হয়েছে ৫.৯ মিলিমিটার—যা নতুন রেকর্ড। এর অন্যতম কারণ ছিল সমুদ্রের অস্বাভাবিক উষ্ণায়ন। কিছু অঞ্চলে এই উষ্ণায়নের হার গত ৪,০০০ বছরের যে কোনও সময়ের তুলনায় বেশি ছিল। ২০১২ থেকে ২০২৫ সালের হিসাবে সমুদ্রপৃষ্ঠ বৃদ্ধির বার্ষিক গড় হার ছিল ৪.৭৫ মিলিমিটার। ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী গড় সমুদ্রপৃষ্ঠ ২০২৪ সালের রেকর্ড উচ্চতার কাছাকাছি ছিল। ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে প্রায় ৫ মিলিমিটার দ্রুত বৃদ্ধির পিছনে এল নিনোর সঙ্গে সম্পর্কিত অস্বাভাবিক সমুদ্র উষ্ণায়নও বড়ো ভূমিকা নিয়েছিল। রাষ্ট্রপুঞ্জের আশঙ্কা, জলবায়ু ব্যবস্থায় ইতিমধ্যেই যে উষ্ণতা সঞ্চিত হয়ে রয়েছে, তার প্রভাবের কারণে ২০৫০ সাল পর্যন্ত সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির হার আরও বাড়তে পারে।
সমুদ্রপৃষ্ঠের এই পরিবর্তন বিশ্বের উপকূলবর্তী মানুষের জীবনযাত্রাকেও বদলে দিচ্ছে। রাষ্ট্রপুঞ্জের হিসাবে, প্রায় ৭৭ কোটি মানুষ— বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ—জোয়ারের সময় সমুদ্রের জল যে উচ্চতায় পৌঁছয়, তার পাঁচ মিটারের মধ্যে থাকা উপকূলীয় এলাকায় বসবাস করেন। ফলে তাঁরা তীব্র ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। উপকূলীয় বন্যা, মিষ্টি জলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, ভূমিক্ষয় এবং বাস্তুতন্ত্রের অবক্ষয় ইতিমধ্যেই বহু অঞ্চলে জলবায়ুজনিত বিপন্নতাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। তার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে কৃষি, বাণিজ্য, পর্যটন এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের উপর বাড়তে থাকা চাপ। বিপন্ন হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোও। রাষ্ট্রপুঞ্জের বক্তব্য, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এখন আর শুধুমাত্র পরিবেশগত সমস্যা নয়। এটি হয়ে উঠেছে টেকসই উন্নয়ন, অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, খাদ্য ও পানীয় জলের নিরাপত্তা এবং মানবাধিকারেরও বড়ো প্রশ্ন।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি একটি ‘ঝুঁকি বৃদ্ধিকারী’ উপাদান হিসাবেও কাজ করছে। এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হতে পারে। মানুষকে নিজের বসতভিটে ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে হতে পারে। চরম পরিস্থিতিতে স্থায়ী ভাবে হারিয়ে যেতে পারে জমি। এমনকি কোনও রাষ্ট্রের ভূখণ্ডের অংশও সমুদ্রের গ্রাসে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। রাষ্ট্রপুঞ্জের মতে, হিমবাহ গলে যাওয়া, সমুদ্রের উষ্ণায়নের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা নজিরবিহীন গতিতে বাড়ছে। এর ফলে বদলে যাচ্ছে উপকূলরেখার চরিত্র। নিচু দ্বীপ, উপকূলীয় শহর ও জনপদ, ক্রান্তীয় বদ্বীপ এবং আর্কটিক অঞ্চল— সবই এ পরিবর্তনের ব্যাপক ঝুঁকির মুখে।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির বড়ো বৈশিষ্ট্য হল— একবার এই পরিবর্তন শুরু হলে তা সহজে উল্টে দেওয়া যায় না। আবার এর অভিঘাত অনেক সময় ধীরে ধীরে সামনে আসে। ফলে বিপদ স্পষ্ট হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে আগেভাগেই প্রস্তুতি নেওয়ার উপর জোর দিয়েছে রাষ্ট্রপুঞ্জ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নদী অববাহিকা, মিষ্টি জলের ব্যবস্থা, উপকূল এবং সমুদ্রকে আলাদা করে দেখলে চলবে না। এই সমস্ত ব্যবস্থাকে একসঙ্গে বিবেচনায় রেখে নীতি ও ভূমি ব্যবহারের পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। কিন্তু বহু ক্ষেত্রেই সেই সমন্বিত পরিকল্পনার ঘাটতি এখনো রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে পর্যাপ্ত ও নির্ভরযোগ্য অর্থায়ন, উন্নত তথ্যভাণ্ডার, বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি কাঠামো প্রয়োজন বলে জানিয়েছে রাষ্ট্রপুঞ্জ। বিশেষত যে সব জনগোষ্ঠী ও অঞ্চল সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে, তাঁদের জন্য আগাম অভিযোজন পরিকল্পনা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, সমুদ্রের জল এখনও শহরের দরজায় পুরোপুরি পৌঁছে যায়নি বলেই বিপদ দূরে—এমন ভাবার সুযোগ নেই। রাষ্ট্রপুঞ্জের সতর্কবার্তা, কলকাতা ও মুম্বইয়ের মতো উপকূলীয় শহরের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতের বিপর্যয় ঠেকাতে প্রস্তুতির সময় আসলে এখনই।
❤ Support Us






